নগদবিহীন অর্থনীতি এবং বাস্তবতা
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক দেশে নগদবিহীন অর্থনীতি গড়ে তোলার ব্যাপারে অগ্রসর হতে শুরু করেছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর উল্লেখ করেছেন যে দেশে নগদবিহীন অর্থনীতি চালু করার উদ্দেশ্যে এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
এসব পদক্ষেপের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে—(১) গভর্নরের নেতৃত্বে স্টিয়ারিং কমিটি গঠন ও কার্যক্রম শুরু করা; (২) এখন থেকে গভর্নর নিজে বিষয়টি সরাসরি তদারকি করবেন; (৩) একটি ইউনিক কিউআর কোডের মাধ্যমে সব ব্যাংক এমএফএস (মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিস) লেনদেনের সুযোগ সৃষ্টি করা। এই প্রসঙ্গে গভর্নর আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন যে দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে এবং নগদের ওপর নির্ভরতা কমাতে বাংলা কিউআর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
দেশ থেকে ঘুষ, দুর্নীতি এবং কর ফাঁকি ঠেকাতে নগদ টাকার ব্যবহার কমিয়ে আনা হচ্ছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এই লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ক্যাশলেস লেনদেন বাড়াতে ব্যাংক এবং অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিস কম্পানিগুলোকে এক প্ল্যাটফর্মে আনার উদ্যোগ নিয়েছে।
নগদবিহীন অর্থনীতি চালু করলে ঘুষ, দুর্নীতি বা কর ফাঁকির মতো অপরাধ কতটা কমবে, তা বলা কঠিন। এসব অপরাধ যে কারণে সংঘটিত হয়, সেসব কারণ দূর করতে না পারলে শুধু নগদবিহীন অর্থনীতি চালুর মাধ্যমে এই অপরাধ বন্ধ করা সম্ভব নয়। তখন দেখা যাবে যে নগদবিহীন অর্থনীতিতে এসব অপরাধের ধরন পাল্টেছে, কিন্তু অপরাধ ঠিকই অব্যাহত আছে। গভর্নরের এমন ঘোষণার পরপরই বাংলা কিউআর বেশ ঘটা করে উদ্বোধনও হয়েছে, যেখানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক ডেপুটি গভর্নর, কয়েকটি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী এবং কয়েকটি অংশগ্রহণকারী বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
উদ্বোধনী বক্তব্যে একজন ডেপুটি গভর্নর উল্লেখ করেছেন যে বাংলা কিউআর ব্যবহার করে নগদবিহীন অর্থনীতি চালু হলে দেশের জিডিপি বৃদ্ধি পাবে। নগদবিহীন লেনদেনের কারণে দেশের জিডিপি কিভাবে বৃদ্ধি পাবে, তা আমি বুঝে উঠতে পারলাম না। নগদবিহীন লেনদেন তো কোনো পণ্য বা সেবা উৎপাদন করবে না। আগে যে লেনদেন নগদে সম্পন্ন হতো, এখন সেই লেনদেনই নগদের পরিবর্তে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন হবে। এর সঙ্গে জিডিপি বৃদ্ধি পাওয়ার কী সম্পর্ক আছে, তা আমার জানা নেই।
যা হোক, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর যেহেতু বলেছেন, তাই আশা করছি তাঁদের কাছে অর্থনীতির সেই সূত্র নিশ্চয়ই আছে।
দেশের জিডিপি বৃদ্ধি পাক আর না পাক, অথবা ঘুষ, দুর্নীতি এবং কর ফাঁকির মতো অপরাধ বন্ধ হোক বা না হোক, নগদবিহীন অর্থনীতি এখন সময়ের দাবি। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংক খুবই ভালো একটি উদ্যোগ নিয়েছে এবং এগিয়ে যাওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, নগদবিহীন অর্থনীতি স্লোগান হিসেবে যতটা জনপ্রিয়, বাস্তবে কার্যকর করা ততটাই কঠিন। এ জন্য সবার আগে প্রয়োজন নগদবিহীন অর্থনীতির সংজ্ঞা এবং বৈশিষ্ট্য বা প্যারামিটার নির্ধারণ করা। কেননা অর্থনীতিকে শতভাগ নগদবিহীন করে তোলা কখনোই সম্ভব নয়। সমাজে এবং অর্থনীতিতে কিছু অংশ থাকে, যেখানে নগদেই লেনদেন নিষ্পত্তি করতে হয়। আমেরিকা, কানাডাসহ উন্নত বিশ্ব নগদবিহীন অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। এখানে এখন আর সেভাবে নগদে লেনদেন হয় না। কিন্তু তার পরও অর্থনীতির শতভাগ এখনো নগদবিহীন করা সম্ভব হয়নি। এ ব্যাপারে সঠিক তথ্য না থাকলেও মার্কেটে নগদ লেনদেনের দৃশ্য থেকে খুব সহজেই অনুমান করা যায় যে এখনো ১৫ থেকে ২০ শতাংশ লেনদেন নগদে সম্পন্ন হয়। সেখানে বাংলাদেশের মতো দেশে নগদবিহীন অর্থনীতি গড়ে তোলার কাজটা মোটেই সহজ নয়। আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত যে নগদবিহীন লেনদেন হয়, তার বেশির ভাগই সম্পন্ন হয়ে থাকে বিকাশ ও নগদ এমএফএস কম্পানির মাধ্যমে। সেখানে এখনো নির্দিষ্ট কিছু মানুষ এই আর্থিক সেবা নিয়ে থাকে। কিন্তু প্রকৃত নগদবিহীন অর্থনীতি বলতে যা বোঝায়, সে রকম নগদবিহীন অর্থনীতি তৈরি করতে হলে দেশের অতি সাধারণ মানুষকে নগদবিহীন লেনদেনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। একজন দিনমজুর, রিকশাচালক, শ্রমিক, কৃষক, রাস্তার পাশের চায়ের দোকানদার, কাঁচাবাজারের তরকারি বিক্রেতা, কামার, কুমার, এমনকি কাজের বুয়ার মতো সাধারণ মানুষ যখন নগদের পরিবর্তে ডিজিটাল পেমেন্ট নিতে অভ্যস্ত হবে, তখনই নগদবিহীন অর্থনীতি বা সমাজ গড়ে উঠবে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- অর্থ ব্যবস্থাপনা