বাজেটে এবারও বেসরকারি চাকরিজীবীদের ঘুমের মধ্যে বেতন কমে যাচ্ছে?
আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে আপনি দেখলেন বেতন এসেছে। কিন্তু হাতের কাছের হিসাব মেলালে বুঝবেন, আগের চেয়ে কম। এটা কোনো ভুল নয়, এটা ব্যবস্থা।
প্রতিবছর বাজেট আসে এবং মোটামুটি সবার আশায় গুড়ে বালি পড়ে। বিগত ফ্যাসিস্ট রেজিম চলে যাওয়ার পর সবাই আশা করেছিল মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য একটা যুগোপযোগী বাজেট হবে। কিন্তু ২০২৬-২৭ বাজেটেও সেই গণ্ডি থেকে বের হতে পারল না সরকার। ফলাফল প্রতিবছরের ন্যায় এবারও আমাদের বেতন কমছে।
এই কমা হচ্ছে দুই ভাবে: ট্যাক্সের চাপ এবং মুদ্রাস্ফীতি। আর এটা করতে হচ্ছে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় এবং নিজেদের অক্ষমতার জন্য কর আদায় কম হওয়ার ঘাটতি মেটাতেই। এখন দেখি কীভাবে কমছে।
আয়কর স্ল্যাব পরিবর্তন
আমাদের সরকারের সবচেয়ে সহজ আদায়যোগ্য কর হচ্ছে ব্যক্তিগত আয়কর। কারণ, সবার বেতন ব্যাংকে যায়, অফিস থেকেই ট্যাক্স কেটে রাখা হয়, এমনকি কারও বেতন ১৫ হাজার টাকা হলেও টিন খোলার বাধ্যবাধকতা আছে। ফলে এনবিআর মোটামুটি বিনা পরিশ্রমেই ট্যাক্স পেয়ে যায়। বেতনভোগী কর্মজীবীরা হলেন এনবিআরের সহজতম টার্গেট, কারণ তাঁদের টাকা পাওয়ার আগেই কেটে নেওয়া যায়।
এবারের বাজেটে করকাঠামোয় কী হলো, সেটা বুঝতে আগের কাঠামোর সঙ্গে তুলনা দরকার।
২০২৪-২৫ সালের কাঠামোয় প্রথম ৩,৫০,০০০ পর্যন্ত শূন্য শতাংশ, পরবর্তী ১,০০,০০০ পর্যন্ত ৫ শতাংশ, পরবর্তী ৪,০০,০০০ পর্যন্ত ১০ শতাংশ এবং এর পরে ধাপে ধাপে ১৫, ২০, ২৫ ও ৩০ শতাংশ।
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ কাঠামোয় প্রথম ৩,৭৫,০০০ পর্যন্ত শূন্য শতাংশ, পরবর্তী ৩,০০,০০০ পর্যন্ত সরাসরি ১০ শতাংশ এবং এর পরে ১৫, ২০, ২৫ ও ৩০ শতাংশ।
পার্থক্যটা লক্ষ করুন। ৫ শতাংশের ধাপটাই তুলে দেওয়া হয়েছে। মানে করমুক্ত সীমার পরপরই ১০ শতাংশে লাফ। স্ল্যাবের সংখ্যা সাত থেকে কমিয়ে ছয় করা হয়েছে। যার বার্ষিক করযোগ্য আয় ৬ লাখ টাকা, তাঁর কর বাড়বে প্রায় ১২.৫ শতাংশ। মানে বেতন কমে গেল।
‘ব্র্যাকেট ক্রিপ’: যে নীরব কৌশলের কথা কেউ বলে না
করমুক্ত সীমা ৩ দশমিক ৭৫ লাখ টাকায় রেখে সরকার আইন না বদলিয়েই প্রতিবছর চুপচাপ করের বোঝা বাড়াচ্ছে। এর নাম অর্থনীতিতে ‘ব্র্যাকেট ক্রিপ’।
২০২০ সালে করমুক্ত সীমা ছিল ৩ লাখ টাকা। সেই বছরের মূল্যে ওই টাকায় যতটা চাল কেনা যেত, আজ ৩ দশমিক ৭৫ লাখ টাকায় তার চেয়ে কম কেনা যায়। অর্থাৎ করমুক্ত সীমা সংখ্যায় বেড়েছে, কিন্তু বাস্তব মূল্যে কমেছে। এই সময়ে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। সে হিসাবে করমুক্ত সীমা এখন ন্যূনতম ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা হওয়া উচিত ছিল।
বেতন যদি মূল্যস্ফীতির কারণে সামান্য বাড়ে, মানুষ উচ্চতর কর স্ল্যাবে চলে যায় এবং প্রকৃত আয় না বাড়লেও বেশি কর দেয়। এটাই ব্র্যাকেট ক্রিপ। সরকার নিজে কিছু না করেও প্রতিবছর আরও বেশি কর আদায় করতে পারে। এই ফাঁদের কথা কেউ বলে না, কিন্তু এটাই সবচেয়ে বড় নীরব অবিচার।
বিনিয়োগ রিবেটে কাটছাঁট
আরও এক জায়গায় বিনিয়োগ করে কর রেয়াত পাওয়ার সুবিধা কমিয়েছে সরকার। বর্তমানে সঞ্চয়পত্র, ডিপিএস, জীবন বিমার প্রিমিয়ামসহ ৯টি খাতে বিনিয়োগের বিপরীতে করদাতারা রেয়াত পেতেন। অনুমোদিত বিনিয়োগের ১৫ শতাংশ বা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকার মধ্যে যেটি কম, সেটি রেয়াত হিসেবে বিবেচিত হতো।
নতুন প্রস্তাবে অনুমোদিত বিনিয়োগের সীমা ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে এবং সর্বোচ্চ বিনিয়োগসীমা ১০ লাখ থেকে কমিয়ে সাড়ে সাত লাখ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
উদাহরণে বলা যায়, ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করলে আগে রিবেট ছিল ১৫ শতাংশ হিসাবে দেড় লাখ টাকা। নতুন হারে সেটা ১০ শতাংশে এক লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতি ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগে ৫০ হাজার টাকা বেশি কর দিতে হবে। সরকার একই সঙ্গে বিনিয়োগ চাইবে এবং বিনিয়োগে রিবেটও কমিয়ে দেবে। এই পরস্পরবিরোধী অবস্থান কেন? এই বুদ্ধি কার কাছ থেকে আসে?
- ট্যাগ:
- মতামত
- জাতীয় বাজেট
- বেসরকারি চাকরি খাত