মা-ই ছিলেন আমার বাবা
শৈশবে বাবাকে হারিয়েছি। তাঁর কোনো স্মৃতি আমার কাছে নেই। নেই কোনো পুরোনো সাদাকালো ফটোগ্রাফও, যা দেখে অন্তত কল্পনা করতে পারতাম—মানুষটি দেখতে কেমন ছিলেন। তাঁর মুখের রেখা, চোখের দৃষ্টি, হাঁটার ভঙ্গি কিংবা কণ্ঠস্বর—কিছুই আমার জানা নেই। পৃথিবীতে এমন মানুষও আছে, যারা নিজের বাবার মুখ মনে করতে পারে না—এই সত্যটি ছোটবেলায় যতটা না বুঝতাম, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ততটাই গভীরভাবে অনুভব করেছি।
মানুষের জীবনে কিছু শূন্যতা থাকে, যা কখনো পূরণ হয় না। বাবাহীন শৈশব আমার কাছে তেমনই এক দীর্ঘ নীরবতা। গ্রামের বাড়িতে বেড়ে ওঠা সেই ছোট্ট ছেলেটি প্রায়ই দূর থেকে দেখত—ঈদের সকালে বাবার হাত ধরে ছেলেরা হাটে যাচ্ছে, মেলায় ঘুরছে, নতুন জামার আবদার করছে। আর আমি নিঃশব্দে ভাবতাম, আমারও যদি এমন একজন মানুষ থাকতেন, যাকে ‘বাবা’ বলে ডাকতে পারতাম!
বিশ্ব বাবা দিবস এলে তাই অন্যদের মতো কেবল উদ্যাপনের অনুভূতি নয়, আমার ভেতরে জেগে ওঠে গভীর বেদনা, এক অদৃশ্য হাহাকার। বাবার অনুপস্থিতি মানুষকে শুধু একজন অভিভাবক থেকে বঞ্চিত করে না; এটি তার শৈশবের ভাষা, নিরাপত্তা ও আত্মবিশ্বাসের ভেতরেও দীর্ঘ ছায়া ফেলে।
ছোটবেলায় উৎসবের দিনগুলোতে বাবার অভাব সবচেয়ে বেশি অনুভব করতাম। নতুন জামা কিনে দেওয়ার আবদার কার কাছে করব? মেলায় নিয়ে যাওয়ার জন্য কাকে জেদ করব? ঘুড়ি ওড়ানোর জন্য লাটাই-সুতা কিংবা স্কুলের নতুন বই-খাতা চাওয়ার মানুষটিই তো ছিল না। সবচেয়ে কষ্ট হতো ‘বাবা’ ডাকটি উচ্চারণ করতে না পেরে। মানুষের জীবনে কিছু শব্দ আছে, যেগুলো শুধু শব্দ নয়—একটি আশ্রয়। ‘বাবা’ তেমনই একটি শব্দ।
তবে জীবনের এই কঠিন বাস্তবতায় মা-ই হয়ে উঠেছিলেন আমার বাবা। তিনি একই সঙ্গে স্নেহ, দায়িত্ব, কঠোরতা ও মমতার ভূমিকা পালন করেছেন। বাবার মৃত্যুর পর দীর্ঘ ২৫ বছর বৈধব্যের জীবন কাটিয়েও তিনি কখনো নিজের কষ্টকে সামনে আনেননি। তাঁর সব যুদ্ধ ছিল সন্তানদের মানুষ করে তোলা। এখন বয়স ও অভিজ্ঞতার আলোয় দাঁড়িয়ে বুঝতে পারি—একজন স্বামীহারা নারীর জীবন কতটা নিঃসঙ্গ হতে পারে। কিন্তু মা কখনো আমাদের সেই নিঃসঙ্গতা বুঝতে দেননি।
আমাদের পরিবার ছিল গ্রামীণ মধ্যবিত্ত পরিবার। সংসারের প্রধান অবলম্বন ছিল কৃষি। বড় ভাই মো. আ. হালিম মিয়া শিক্ষকতা করতেন। ১৯৭২ সালে স্নাতক পাস করেও তিনি নিজের স্বপ্নকে বড় করে দেখেননি; পিতৃহারা ভাইবোনদের মানুষ করার দায়িত্বই হয়ে উঠেছিল তাঁর জীবনের প্রধান লক্ষ্য। এক অর্থে তাকেও বাবার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়েছিল।
বাংলাদেশের অসংখ্য মধ্যবিত্ত পরিবারের গল্প আসলে প্রায় একই রকম। সেখানে স্বপ্ন থাকে সীমিত, সংগ্রাম থাকে অসীম। অনেক পরিবারে বড় ভাই কিংবা মা-ই বাবার অনুপস্থিতি পূরণ করেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, একজন বাবার জায়গা কখনো পুরোপুরি পূরণ হয় না।
- ট্যাগ:
- মতামত
- বিশ্ব বাবা দিবস