পুকুর, গোয়ালঘর আর ধানের মাঠের গল্প
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘পোস্টমাস্টার’ গল্পে উলাপুর গ্রামটি বর্ণনা করেছেন এভাবে—‘অন্ধকার আটচালা, পানা-পুকুর এবং তাহার চারিপাড়ে জঙ্গল; সন্ধ্যার সময় গ্রামের গোয়ালঘরে কুণ্ডলায়িত ধোঁয়া, ঝোপে ঝোপে ঝিল্লির ডাক এবং দূরে গ্রামের নেশাখোর বাউলের খোল-করতাল বাজানো উচ্চস্বরে গান; অন্ধকার দাওয়া ও গাছের কম্পন....। ...যদি আরব্য উপন্যাসের কোনো দৈত্য আসিয়া এক রাত্রের মধ্যে এই শাখাপল্লব-সমেত গাছগুলো কাটিয়া পাকা রাস্তা বানাইয়া দেয়, এবং সারি সারি অট্টালিকা আকাশের মেঘকে দৃষ্টিপথ হইতে রুদ্ধ করিয়া রাখে, তা হইলে এই আধমরা ভদ্র সন্তানটি পুনশ্চ নবজীবন লাভ করিতে পারে।’
আমার গ্রামখানি অবশ্য অতটা অনুন্নত ছিল না। উন্নত রাস্তাঘাট ছিল না বটে, তবে নৌপথে ঢাকা আসতে লাগত দুই ঘণ্টা। এ জন্য মতলবমুখী না হয়ে সুগন্ধির মানুষ নারায়ণগঞ্জমুখী হয়ে সুখী থাকত বেশি।
তারপরও সুগন্ধি ছিল নিরেট কৃষিনির্ভর একটি গ্রাম; কৃষি ব্যবস্থাপনা ছিল সনাতনী এবং প্রকৃতিনির্ভর। লাঙল-জোয়াল কাঁধে হালের বলদ, সেকেলে বীজ, ঢেঁকির ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ, কুলায় করে দক্ষিণা হাওয়ায় ধান ঝাড়া ইত্যাদি ছিল নিত্যদিনের চিত্র। জমিতে পানি বলতে আল্লাহর আশীর্বাদপুষ্ট বৃষ্টির পানি—‘তুমি খাওয়াইলে আমি খাই আল্লাহ।’
প্রধান খাদ্যশস্য হিসেবে শুষ্ক মৌসুমে মাঠে থাকত আউশ আর কাউন এবং বর্ষাকালে পানির সঙ্গে বেড়ে ওঠা গভীর জলের আমন। এক হাতে বাঁশের ঝুড়ি (ওড়া) কোমরে রেখে অন্য হাতে ছিটানো সনাতনী বীজে বিঘাপ্রতি ধান আসত বড়জোর ৬ মণ। অথচ খানা প্রতি খানেওয়ালা ৮-১০ জন, খিলানেওয়ালা মাত্র একজন।
এতদঞ্চলের সনাতনী ধানের বাহারি নাম শুনলে মনে হবে কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন! আউশ তথা খরা মৌসুমে মাঠে ছিল লক্ষ্মীলতা, চালাকি, সাইটা, ফুলবাদাম, চিনাটিঙরি। অন্যদিকে আমন তথা বর্ষা মৌসুমে মাঠ ভরে থাকত লক্ষ্মীবিলাস, দুধজাল, কার্তিকশাইল, মধুসাইল, খামা, আছমতি, বন্দিসাইল, লাইচ্চা, খোদমতি প্রভৃতি।
বোরো ধান বলতে নদীর তীরে কিংবা খাল-বিলের কিনারে পলিপড়া মাটিতে জন্মানো দেশি বোরো। মাঠে আরও থাকত মিষ্টি আলু, সরিষা, তিল, আখ ইত্যাদি। ও, বলতে ভুলে গেছি—অর্থকরী ফসল হিসেবে সোনালি আঁশ বলে খ্যাত পাট হতো প্রচুর। এখন সেই রামও নেই, অযোধ্যাও নেই। পাটের সূর্য গেছে পাটে; সোনালি আঁশ নাকি গলার ফাঁস।