মানুষের কষ্ট কমানোর কার্যকর যন্ত্রগুলো এখনো দুর্বল: ড. সেলিম রায়হান
সামগ্রিকভাবে এবারের বাজেট কতটুকু জনবান্ধব হলো?
সামগ্রিকভাবে বাজেটটি আংশিকভাবে জনবান্ধব, কিন্তু পুরোপুরি নয়। মূল্যস্ফীতি, সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ভাষা আছে। ফ্যামিলি কার্ড, নিত্যপণ্যে কিছু করছাড়, করমুক্ত আয়সীমা, এসএমই ও নারী উদ্যোক্তা সহায়তা এবং স্বাস্থ্য-শিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি সাধারণ মানুষের চাপ স্বীকার করে। কিন্তু জনবান্ধব বাজেটের আসল পরীক্ষা হলো ঘোষণার সুফল বাজারে, হাসপাতালে, স্কুলে ও কর্মসংস্থানে পৌঁছায় কি না। বাজেটে সেই ডেলিভারি মেকানিজম যথেষ্ট স্পষ্ট নয়। রাজস্ব লক্ষ্য অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী, কর-ভ্যাটের আওতা বাড়ছে, ঘাটতি অর্থায়নে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা থাকছে। ফলে সাধারণ মানুষের স্বস্তি ও সামষ্টিক চাপের মধ্যে একটি বড় দ্বন্দ্ব রয়ে গেছে। জনবান্ধবতার দাবি আছে, কিন্তু বাস্তব জনস্বস্তির নিশ্চয়তা এখনো দুর্বল। আরেকটি বিষয় হলো, বাজেটে জনবান্ধবতার ভাষা থাকলেও দরিদ্র, নিম্নমধ্যবিত্ত ও অনানুষ্ঠানিক শ্রমজীবীদের আলাদা আয়-ঝুঁকি বিশ্লেষণ খুব স্পষ্ট নয়। একই নীতি সবার জন্য সমানভাবে কাজ করবে—এমন ধরে নেওয়া বিপজ্জনক।
বাজেটে মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো এবং মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় রাখাকে অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে পরোক্ষ কর বা ভ্যাটের আওতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই পরোক্ষ কর বৃদ্ধি কি মধ্য ও নিম্নবিত্তের ওপর নতুন বোঝা তৈরি করে আয়ের বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে দেবে না?
মূল্যস্ফীতি কমানোকে অগ্রাধিকার বলা হয়েছে, কিন্তু পরোক্ষ কর বা ভ্যাটের বিস্তার সেই লক্ষ্যকে দুর্বল করতে পারে। ভ্যাট স্বভাবতই প্রত্যক্ষ করের তুলনায় বেশি প্রতিগামী; কারণ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার তাদের আয়ের বড় অংশ ভোগে ব্যয় করে। ফলে ভ্যাট বাড়লে তাদের প্রকৃত আয় বেশি ক্ষয়ে যায়। নিত্যপণ্যে কিছু করছাড় থাকলেও সরবরাহ শৃঙ্খল দুর্বল, বাজারে প্রতিযোগিতা সীমিত এবং পরিবহন ব্যয় বেশি হলে ভোক্তা পুরো সুবিধা পাবে না। বরং পাইকারি বা খুচরা পর্যায়ে করের চাপ শেষ পর্যন্ত দামের ভেতর ঢুকে যেতে পারে। তাই রাজস্ব বাড়ানোর প্রয়োজন স্বীকার করেও বলা যায়, ভ্যাট বিস্তারের ক্ষেত্রে সরকারকে অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে। বড় সম্পদ, উচ্চ আয়ের পেশা, কর ফাঁকি, কর ব্যয় ও অপ্রদর্শিত সম্পদের ওপর কঠোর নজর না দিলে কর ন্যায্যতা আসবে না। অন্যথায় বৈষম্য বাড়বে। করের আওতা বাড়ানো দরকার, কিন্তু সেটি যদি সহজে ধরা যায়—এমন ছোট ব্যবসা ও মধ্যবিত্তের ওপর বেশি পড়ে, আর বড় কর ফাঁকি অক্ষত থাকে, তবে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হবে।
এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর যে ঘোষণা এসেছে, তা মাঠপর্যায়ে স্বচ্ছতার সঙ্গে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মূল চ্যালেঞ্জগুলো কী? কীভাবে এই বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে সাধারণ মানুষের মৌলিক জীবনযাত্রার ব্যয় লাঘব করা সম্ভব?
স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধি ইতিবাচক, কিন্তু মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নই মূল সমস্যা। শিক্ষা খাতে শুধু ভবন, যন্ত্রপাতি বা নতুন কর্মসূচি দিয়ে মান ফেরানো যাবে না। দরকার প্রশিক্ষিত শিক্ষক, শেখার ঘাটতি পূরণ, বিদ্যালয়ভিত্তিক মূল্যায়ন, কারিগরি শিক্ষার মান, ডিজিটাল দক্ষতা এবং গবেষণায় জবাবদিহি। স্বাস্থ্য খাতে একইভাবে হাসপাতাল নির্মাণ যথেষ্ট নয়; দরকার ডাক্তার-নার্সের উপস্থিতি, ওষুধ সরবরাহ, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, রেফারেল ব্যবস্থা এবং রোগীর নিজস্ব ব্যয় কমানো। দুর্বল ক্রয়প্রক্রিয়া, স্থানীয় প্রভাব, তথ্যের অভাব ও মনিটরিংয়ের সংকট বরাদ্দ অপচয়ের ঝুঁকি বাড়ায়। সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে জেলাভিত্তিক ফলাফল সূচক, সামাজিক নিরীক্ষা, ডিজিটাল ব্যয় ট্র্যাকিং, প্রকাশ্য ক্রয় তথ্য এবং অভিযোগ নিষ্পত্তি দরকার। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যয় যদি পরিবারগুলোর কোচিং, ওষুধ, পরীক্ষা ও বেসরকারি চিকিৎসার খরচ কমাতে না পারে, তবে বরাদ্দ বৃদ্ধির সামাজিক প্রভাব সীমিত থাকবে। তাই বরাদ্দের সঙ্গে আউটকাম বাজেটিং জরুরি। কত শিশু শিখল, কত রোগী নিজ এলাকায় চিকিৎসা পেল, কত পরিবার চিকিৎসা ব্যয়ে নিঃস্ব হলো না—এসব সূচক প্রকাশ করতে হবে।