জীবনানন্দের পারমাণবিক যুদ্ধভীতি ও বিশ্বরাষ্ট্র ভাবনা

বিডি নিউজ ২৪ আলমগীর খান প্রকাশিত: ১৪ জুন ২০২৬, ২৩:৩৬

বর্তমান পৃথিবী তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রধান ভূমিকা পালন করবে পারমাণবিক অস্ত্রসমূহ; যার অর্থ হলো, এর ধ্বংসযজ্ঞ অতীতের সব যুদ্ধকে ছাড়িয়ে যাবে, এমনকি তা মানবসভ্যতাকে ধ্বংসের প্রান্তে নিয়ে যেতে পারে। জিতবে না কেউ।


পারমাণবিক অস্ত্রের সংকট আবার উভয়মুখী। এটি দু-চার জনের কাছে থাকার চেয়ে কারও কাছেই না থাকা ভালো। আর যদি এটি একজন বা গুটিকয়েকের কাছে থাকে, তবে বাকিদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে। ফলে অস্তিত্ব রক্ষার জন্য বেশি বেশি দেশ পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণের প্রতিযোগিতায় নামে। অস্তিত্ব রক্ষার জন্য যেন এর বিকল্প নেই; যত বেশি দেশের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র, যেন তত বেশি শান্তি! আরও এক আশ্চর্যের বিষয় হলো, কোনো অপারমাণবিক দেশ বা শক্তি এ অস্ত্রে সজ্জিত হতে চাইলে, পারমাণবিক অস্ত্রওয়ালারা তার কাছ থেকে বেশি হুমকি অনুভব করে। এ ব্যাপারে হ্যাভস আর হ্যাভনটসের সম্পর্কটা হলো, হ্যাভনটসকে হ্যাভস হওয়া ঠেকাতে হ্যাভসগোষ্ঠী প্রাণপণ চেষ্টা করে, এমনকি যুদ্ধ পর্যন্ত বাধাতে পারে। ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাই এখন বিশ্বযুদ্ধে রূপান্তরিত হওয়ার আশঙ্কায় পরিণত হয়েছে।


এই সংকটের শুরু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে, যুক্তরাষ্ট্র জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহর দুটিকে পারমাণবিক বোমা মেরে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার পর থেকে; যা এখন পর্যন্ত বিরামহীনভাবে বেড়ে চলেছে। সেসময়ে আমেরিকার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সোভিয়েত ইউনিয়ন স্বভাবতই নিজের জন্য পারমাণবিক বোমা তৈরির দৌড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বলা হয়, দুই দেশেরই পারমাণবিক অস্ত্র থাকার ফলে তারা উভয়ই বৃহৎ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া থেকে বিরত থাকে এবং ঠান্ডা যুদ্ধের নতুন যুগ শুরু হয়। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন আবার একক ক্ষমতার উদ্ভব ঘটায়; ঠান্ডা যুদ্ধের পর এখন গরম যুদ্ধের হাওয়া বইছে, যা বর্তমানে বিশ্বকে এক ভয়ানক অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে ফেলেছে ও ভবিষ্যতে আরও অস্থির অবস্থা তৈরি করতে পারে।


এর সঙ্গে ‘রূপসী বাংলা’র কবি জীবনানন্দ দাশের কী সম্পর্ক, তা ভাবাই স্বাভাবিক। সত্য হলো, এই বৈশ্বিক সংকট শুরুর সময় থেকে জীবনানন্দ এসব বিষয়ে সচেতন ছিলেন, গভীরভাবে চিন্তা করেছেন এবং লিখেছেন। তিনি যে বিরাটসংখ্যক প্রবন্ধ লিখেছেন, তা তার মৃত্যুর আগে অনেকে আঁচ করতে পারেননি। তখনও অনেকে বোঝেননি যে, জীবনানন্দ দুই বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাতে জন্ম নেওয়া এক মর্মন্তুদ স্বরধ্বনি। পারমাণবিক শক্তিপূর্ব অস্ত্রের ঝনঝনানির মতো নজরুলকণ্ঠ ঠান্ডা যুদ্ধের আমলে জীবনানন্দে এসে চিন্তাশীল, চাপা, কুহেলিকাময় ও অনিশ্চয়াত্মক হয়ে উঠল। যেন পদার্থবিজ্ঞানের অবিশ্বাস্যরকম নতুন আবিষ্কার ও বৈশ্বিক রাজনীতির চাপা দ্বন্দ্বময় নবরূপের প্রভাবে পরিবর্তন হলো বাংলা কবিতাও, জীবনানন্দের এবং তার সতীর্থদের হাত ধরে। কিন্তু পারমাণবিক যুদ্ধ ঠেকাতে বিশ্বরাষ্ট্রের সঙ্গে এসবের কী সম্পর্ক—ধান ভানতে শিবের গীত নয় কি? না, তা নয়।


কবি জীবনানন্দ দাশ এসব গভীরভাবে অনুভব, পর্যবেক্ষণ ও পাঠ করেছিলেন, যার একটা চমৎকার প্রতিফলন তার লেখা ‘Atomic Energy and Nations’ শীর্ষক ইংরেজি প্রবন্ধে পাওয়া যায়। প্রবন্ধটি হচ্ছে ১৯৪৮ সালে লন্ডনে প্রকাশিত ‘Fear, War and the Bomb: Military and Political Consequences of Atomic Energy’ শীর্ষক একটি বই নিয়ে আলোচনা। বইটি লিখেছেন নোবেল পুরস্কারবিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী পি. এম. এস. ব্ল্যাকেট। বইয়ের শিরোনাম থেকে বিষয়টি স্পষ্ট। প্রকাশের পরপরই এ বই আলোচনা-সমালোচনার বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে। কারণ, এ বইতে তিনি পশ্চিমা শক্তির সমালোচনা করেছেন এবং দুই পরাশক্তির মাঝে অস্ত্র প্রতিযোগিতা কমিয়ে আনার ওপর জোর দিয়েছেন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক জাপানে বোমা ফেলার কোনো সামরিক প্রয়োজন ছিল না; সোভিয়েত ইউনিয়নকে রাজনৈতিকভাবে দাবানোর জন্য এটি করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে অনেক বছর ধরে একটি ঠান্ডা যুদ্ধ চলমান থাকার কথা বলেছিলেন তিনি। দূরদ্রষ্টার মতো করে দেখেছেন যে, কেবল পারমাণবিক শক্তি অর্জন একটি দেশকে যুদ্ধজয়ের নিশ্চয়তা দেয় না। অন্যান্য অস্ত্রের ব্যবহারসহ পদাতিক বাহিনীর অংশগ্রহণ ছাড়া পারমাণবিক বোমা মেরে কোনো দেশ দখল করা সম্ভব নয়। তিনি আমেরিকান রাজনীতিকদের মতো মনে করেননি যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন যুক্তরাষ্ট্রকে হামলা করতে উঠেপড়ে লেগেছে। আর যুক্তরাষ্ট্রও পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করে বিরাট রুশ বাহিনীকে পরাজিত করতে পারবে না।


বর্তমান বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রমাণ করছে ব্ল্যাকেটের ধারণা। ইরান সভ্যতা এক রাতে ধ্বংস করার হুমকি ট্রাম্প দিয়েছিলেন কীসের জোরে, তা সবাই বুঝতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পকে পিছু হটতে হয়। লাগাতার বোমা ফেলেও ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু ইরানি নেতৃত্বকে দুর্বল করতে পারেননি। যে হরমুজ প্রণালি ইরান বন্ধ করে দিয়েছে, তা ট্রাম্পের কোনো হুমকিতেই আর খুলছে না। আর ইরানে আমেরিকান সৈন্য পাঠানোর ট্রাম্পীয় ইচ্ছেকে তো ইরান কেবল স্বাগতমই জানাচ্ছে না, পরিকল্পিতভাবে উসকেও দিচ্ছে। আকাশ থেকে বোমা মেরে গণহত্যা চালানো যাবে, তবু জয় মিলবে না; তার জন্য ইরানের মাটিতে গিয়ে শক্তি দেখাতে হবে! যা নেতানিয়াহুর নিজের নেই বলে ট্রাম্পকে ঠেলে যুদ্ধে জড়িয়েছেন। আর ট্রাম্পও জানেন ইরানের মাটিতে স্থলসৈন্য পাঠানোর ফল কী হতে পারে। তার একমাত্র ভরসা তাই ‘মহাকাব্যিক ক্রোধ’ (এপিক ফিউরি) নামের এই একশোভাগ ক্রোধোন্মত্ত সামরিক অভিযান, যাতে কাব্যের ছিটেফোঁটাও নেই।


ব্ল্যাকেটের কথার সূত্র ধরে জীবনানন্দ বলেছেন, আমেরিকা যদি ‘প্রিভেন্টিভ ওয়ার’ অর্থাৎ শত্রুকে ঠেকানোর জন্য অগ্রিম যুদ্ধ বাধায়, তাতে সে বৈশ্বিক সহানুভূতি হারাবে ও বিজয়কে অসম্ভব করে তুলবে। ওই প্রিভেন্টিভ ওয়ারই এখন চলছে আমেরিকান ‘প্রিএম্পটিভ ওয়ার’ নামে, যেখানে কৌশল হচ্ছে আগেই শত্রুকে আক্রমণ করে তার ভবিষ্যৎ আক্রমণের সম্ভাবনা নির্মূল করা। তারা সেটি চালাচ্ছে আফগানিস্তান থেকে শুরু করে ইরান পর্যন্ত। পারমাণবিক শক্তিসম্পন্ন ইসরায়েল অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগতভাবে দুর্বল ইরানের ভয়ে নাকি কাঁপছে! তাই ইরানের ভবিষ্যৎ আক্রমণ ঠেকাতে এখনই দেশটিকে ধ্বংস করে দিতে তারা এই যৌথ হামলা শুরু করেছে। এর ফলে ইসরায়েলের জনপ্রিয়তা এখন এতটা কমেছে যে, কদিন আগে স্বয়ং ট্রাম্প তার পেয়ারের বন্ধু নেতানিয়াহুকে ফোনে ধমকে বলেছেন, সবাই এখন তাকে ঘৃণা করে। অবশ্য তাতে বয়েই গেছে জায়নবাদী নেতানিয়াহুর!


ব্ল্যাকেট প্রত্যাশা করেছিলেন, এরকম অচলাবস্থা থেকে মুক্তির একটা পথ হচ্ছে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও তাদের শুভবুদ্ধিময় সহাবস্থান। বিশ্বসরকার প্রতিষ্ঠার মতো যেসব ইঙ্গিত তখন পাওয়া যাচ্ছিল, তাকে কোনো দিকনির্দেশনা হিসেবে তিনি দেখেননি। তার আশু সম্ভাবনা আছে বলেও তিনি মনে করেননি। যদিও একধরনের বিশ্বসরকার একসময় প্রতিষ্ঠা হবে বলে তিনি ধারণা করেছেন। তবে চলতি সময়ে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার হাতে থাকলেও তা নিরাপদ হবে না, কেননা তা হবে যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে।


জীবনানন্দ ব্ল্যাকেটের মতামত উল্লেখ করেছেন; এ বিষয়ে নিজস্ব মত দেননি। তবে পৃথিবীর অনেক খ্যাতিমান সাহিত্যিক, দার্শনিক ও রাষ্ট্রনীতিবিদ বিশ্বরাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখেছেন। কিন্তু মানবজাতির কাছে এখনও তা অধরা হয়ে আছে। বরং যা মূর্ত হয়ে উঠছে, তা একটিমাত্র রাষ্ট্রের অধীনে একাধিপত্যময় এক বিশ্ব—যা অতি ভয়ঙ্কর, যেখানে দুর্বল রাষ্ট্রসমূহ প্রতিনিয়ত তাদের স্বাধীনতা হারানোর পথে রয়েছে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও