বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কোন্নয়ন : সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক হিসেবে বিবেচিত হয়। ভৌগোলিক নৈকট্য, ঐতিহাসিক সংযোগ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার কারণে দুই দেশের সম্পর্ক বহুস্তরীয় ও কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে।
স্বাধীনতা লাভের পর থেকে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বিভিন্ন সময়ে নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে গেছে। অতীতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই দুই দেশের সম্পর্কের গভীরতাও কমবেশি হয়েছে। দেখা গেছে, বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গির চেয়ে ভারতের একচোখা নীতিই সম্পর্কের পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। ভারতের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি গভীর সম্পর্ক ছিল ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর থেকে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত।
এ সময়ে বাংলাদেশের জনগণ কিংবা অপরাপর রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ভারতের যত না সম্পর্ক ছিল, তার চেয়ে বেশি গভীর সম্পর্ক তারা গড়ে তুলেছিল ক্ষমতাসীন শেখ হাসিনা ও তাঁর দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে। এতে অবশ্য ভারত বাংলাদেশ থেকে তার শতভাগ স্বার্থ আদায় করে নিতে পেরেছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর এই সম্পর্ক স্থবির হয়ে পড়েছিল। তবে এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ভারত নিজ থেকেই বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার আভাস দিয়ে আসছে।
সর্বশেষ এ মাসের গোড়ার দিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রণে বাংলাদেশের ২৬ সদস্যের গণমাধ্যমের একটি প্রতিনিধিদলের সফরকালে সে দেশের সরকারসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বক্তব্যে তারই প্রতিফলন ঘটেছে। কিন্তু সম্প্রতি ভোটের মাধ্যমে বিজেপির কট্টর বাংলাদেশবিরোধী নেতা শুভেন্দু অধিকারী পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক একটি নতুন সমীকরণের মুখোমুখি হয়েছে। অনেকে বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতার পালাবদল দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নে প্রভাব ফেলতে পারে। ইদানীং এর কিছু নমুনা লক্ষ করা যাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার গঠনের পর বাংলাদেশ সম্পর্কিত তাঁর কিছু পদক্ষেপ ও বক্তব্য বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে, যেগুলো দুই দেশের সম্পর্ককে শীতল বা উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলতে পারে।
এগুলো অনেকটাই এখনো রাজনৈতিক ঘোষণা বা প্রশাসনিক নির্দেশনার পর্যায়ে আছে, তবে এর বাস্তব প্রয়োগ ও কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থান দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে হয়। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা দিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গে ‘অনুপ্রবেশকারী’ শনাক্ত, ভোটার তালিকা থেকে বাদ এবং তাদের ভারতছাড়া করা হবে তাঁর প্রাথমিক কাজ এবং সে মোতাবেক তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় নির্দেশও দিয়েছেন। যারা অনুপ্রবেশকারী হিসেবে শনাক্ত হবে, তাদের আদালতে না পাঠিয়ে সরাসরি বিএসএফের হাতে হস্তান্তর করতে নির্দেশও দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের
(CAA) আওতায় শুধু হিন্দু শরণার্থীরা সুরক্ষা পাবে, কিন্তু এর বাইরে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীকে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে বিবেচনা করা হবে। গ্রাম-গঞ্জ-শহরে তল্লাশি চালিয়ে এসব অভিবাসীকে খুঁজে বের করতেও বলেছেন তিনি। এমনকি রেলওয়ে স্টেশনগুলোতে সন্দেহভাজন অনুপ্রবেশকারী শনাক্ত করতে রেলওয়ে প্রটেকশন ফোর্সকে (RPF) নির্দেশ দিয়েছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ সীমান্তে নতুন করে কাঁটাতারের বেড়া ও নিরাপত্তা অবকাঠামো জোরদারের জন্য বিএসএফের সঙ্গে বৈঠক করে জমি হস্তান্তর প্রক্রিয়াও শুরু করেছেন।
এ ধরনের পদক্ষেপকে সংবেদনশীল হিসেবে দেখা বাংলাদেশের পক্ষে অস্বাভাবিক নয়। কারণ পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে আগে ভোটার সংশোধন তালিকা করতে গিয়ে যে ৩১ লাখ বাঙালি মুসলিমকে ভোটদান থেকে বিরত রাখা হয়েছিল, তাঁদের বিষয়ে সে দেশের সরকার কী সিদ্ধান্ত নেয়, তা বাংলাদেশের জন্য এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এত বিপুলসংখ্যক নাগরিককে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ তকমা দিয়ে যদি পুশ ব্যাকের চেষ্টা করা হয়, তাহলে দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নের ব্যাপক ক্ষতি হবে। এটি মানবাধিকার ও কূটনৈতিক দিক থেকে বিতর্ক তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে যদি বাংলাদেশ এসব ব্যক্তিকে নিজেদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার না করে।
সীমান্ত নিরাপত্তা বাড়ানো ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় হলেও এটি সীমান্তবর্তী মানুষের চলাচল, বাণিজ্য ও স্থানীয় সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশ মনে করে, সে দেশের নাগরিকদের ধর্মের ভিত্তিতে আলাদা করে বাংলাদেশি তকমা লাগিয়ে কথায় কথায় সীমান্তে ঠেলে দেওয়ার হুমকি দেওয়া দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য অস্বস্তিকর। এতে সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠী ও বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হতে পারে। শুভেন্দু বিধানসভা নির্বাচনের আগে থেকেই ‘বাংলাদেশ ইস্যু’কে রাজনৈতিক প্রচারে ব্যবহার করে আসছেন। অতীতে বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন, অবৈধ অভিবাসন ও সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে কঠোর মন্তব্যও করেছেন।
এ ধরনের বক্তব্য জনমতকে যেমন প্রভাবিত করে, পাশাপাশি কূটনৈতিক পরিবেশকেও উত্তপ্ত করতে পারে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক কেবল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ওপর নির্ভর করে না। পররাষ্ট্রনীতি মূলত ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার নির্ধারণ করে। তাই পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কঠোর অবস্থান রাজনৈতিক চাপ তৈরি করলেও দিল্লি ও ঢাকার কূটনৈতিক সম্পর্ক পুরোপুরি শীতল হবে কি না, তা নির্ভর করবে কেন্দ্রীয় সরকারের পদক্ষেপ, সীমান্ত পরিস্থিতি এবং দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ওপর।
- ট্যাগ:
- মতামত
- বাংলাদেশ-ভারত
- সম্পর্ক উন্নয়ন