যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমন চুক্তি করার মতো দেশ খুঁজে পাওয়া কঠিন
সম্প্রতি ঢাকায় আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স (অ্যামচেম) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাক্ষরিত তথাকথিত বাণিজ্যচুক্তির পক্ষে যে বক্তব্য দেন, তার অনুবাদ প্রথম আলো ২০ মে প্রকাশ করেছে। এ বক্তব্যে বেশ কিছু ভুল ও অস্বচ্ছ যুক্তি আছে। সংক্ষেপে তার কয়েকটি এখানে উল্লেখ করছি।
রাষ্ট্রদূত দাবি করেছেন, এই চুক্তি বাংলাদেশের জন্য খুবই ভালো ঘটনা। কেননা ‘এটি বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বাজারে ১৯ শতাংশ প্রতিযোগিতামূলক শুল্কহারে প্রবেশাধিকার বজায় রাখতে সাহায্য করবে। চুক্তি না থাকলে এই হার ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারত।’
এখানে দুটি গুরুতর ভুল আছে। প্রথমত, ১৯ শতাংশ কোনো প্রতিযোগিতামূলকভাবে নির্ধারিত শুল্কহার নয়, এটি বাজার অর্থনীতির সাধারণ নিয়ম এবং বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার নিয়মনীতি ভঙ্গ করে বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের জোর করে চাপানো শুল্কহার।
দ্বিতীয়ত, এই চুক্তি না করলে ‘এই হার ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারত’, তা–ও ঠিক নয়। কেননা রাষ্ট্রদূত এই তথ্য গোপন করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক, ফেডারেল ও সুপ্রিম আদালত বিভিন্ন দেশের ওপর ট্রাম্পের এই উচ্চহারে শুল্ক বসানো অবৈধ বলে ঘোষণা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, ট্রাম্প এখন ১০ থেকে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করতে পারবেন।
অর্থনীতিতে আমদানি–রপ্তানির কিছু প্রাথমিক শর্ত আছে। কাণ্ডজ্ঞান থেকেও তা বোঝা যায়। রাষ্ট্রদূত এসব অগ্রাহ্য করে বলেছেন, যদি কোনো দেশ যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র থেকে খুব কম আমদানি করে এবং অন্য দেশ থেকে বেশি আমদানি করে, তাহলে টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সম্ভব হয় না।
এ কথাও ভুল। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ যা রপ্তানি করে, তা তাদের দয়াদাক্ষিণ্যের ব্যাপার নয়। এই রপ্তানি হয়, কারণ সেই দেশে এর চাহিদা আছে এবং সেই দেশেরই বিভিন্ন ব্র্যান্ড এ থেকে বিপুল পরিমাণ মুনাফা করে বলেই আগ্রহ নিয়ে বাংলাদেশ থেকে তারা আমদানি করে।
বাংলাদেশের গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানির ওপর উচ্চ শুল্ক আগে থেকেই আছে। এখন সেখান থেকে তুলা আমদানির বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে এই চুক্তিতে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমাদের আমদানি কম হওয়ার কারণ, তাদের সে রকম পণ্য নেই, যার চাহিদা আমাদের অর্থনীতিতে আছে। থাকলে তাদের জোরজবরদস্তি করতে হতো না, বাজারের নিয়মেই আরও পণ্য সেই দেশ থেকে বাংলাদেশে আসত।
যুক্তরাষ্ট্র যদি ‘টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সম্ভব’ করতে চায়, তাহলে তাকে যুদ্ধমুখী তৎপরতা থেকে সরে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে, পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ করতে হবে। তার কোনো লক্ষণ আমরা দেখছি না।
এই চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে বাংলাদেশের ওপর উচ্চশুল্ক আরোপ করছে, অন্যদিকে তাদেরই রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের উদ্দেশে বলেছেন, ‘আপনাদের উচিত নয় এত বেশি শুল্ক আরোপ করা!’ উচ্চ শুল্ক আরোপ করা যেন যুক্তরাষ্ট্রের একক এখতিয়ার! আরও বলেছেন, সেখান থেকে আমদানি করা পণ্যে কোনো মান নিয়ন্ত্রণ পরীক্ষা করা যাবে না। কারণ, তারাই মান নির্ধারণে যথেষ্ট।
২.
এই চুক্তিতে রাষ্ট্রদূতের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে আছে গম, সয়াবিন, তুলা ও ভুট্টা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এগুলো যদি প্রতিযোগিতামূলক দামে হয় কিংবা মানসম্পন্ন হয়, তাহলে তো এমনিতেই আমাদের আমদানিকারকেরা আগ্রহ নিয়ে সেগুলো আমদানি করার কথা। তাহলে কেন ট্রাম্প প্রশাসন জোরজবরদস্তিমূলক চুক্তি করছে? এগুলো ঠিক নয় বলে?
রাষ্ট্রদূত জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ‘বাংলাদেশ আগামী ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি পণ্য কিনবে’। এটা মার্কিন বৃহৎ কোম্পানির জন্য ভালো খবর, বাংলাদেশের জন্য নয়। বাংলাদেশের দরকার আমদানিনির্ভরতা থেকে বের হওয়া। সেই চেষ্টার পথ বন্ধ করে এই চুক্তি দীর্ঘমেয়াদি আমদানিনির্ভরতায় ঢুকতে বাংলাদেশকে বাধ্য করবে।
রাষ্ট্রদূত দাবি করেছেন, ‘আমেরিকান কোম্পানিগুলো কঠোর কমপ্লায়েন্স বা নিয়ম মেনে চলে’, ‘আমেরিকান কোম্পানিগুলো আইনের শাসনের অধীন কাজ করে’, ‘আমরা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে আসি’ এবং ‘আমরা সক্ষমতা গঠনে গুরুত্ব দিই।’
- ট্যাগ:
- মতামত
- বাণিজ্য চুক্তি