‘পরিচ্ছন্ন’ রাজনীতির খোঁজে
‘পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ’ বললে যে কয়জন মানুষের মুখ ভেসে ওঠে বা জনপরিসরে যে রাজনীতিবিদদের নিয়ে বিতর্ক অথবা সমালোচনা কম, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাদের একজন।
গত ৮ মে নওগাঁয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘দেশের রাজনীতিতে এখনো কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পরও রাজনৈতিক সংস্কৃতি সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন হয়ে উঠতে পারেনি। মানুষ বারবার পরিবর্তনের জন্য লড়াই করেছে, প্রাণ দিয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই পরিবর্তন পুরোপুরি আসেনি।’
প্রশ্ন হলো, মির্জা ফখরুলের কেন এই আক্ষেপ; পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর রাজনীতি বলতে কী বুঝায়; বাংলাদেশের রাজনীতিতে কেন তার অনুপস্থিতি; রাজনীতিতে সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন করতে হলে কী প্রয়োজন?
Politics বা রাষ্ট্রনীতিই বাংলায় রাজনীতি বলে পরিচিত। প্রচলিত অর্থে রাজনীতি হলো রাষ্ট্র ও তার নাগরিকদের পারস্পরিক সম্পর্ক, দায়িত্ব ও অধিকার-সম্পর্কিত বিষয়াদি। বস্তুত রাজনীতি একটা দেশের অবস্থিত আর্থ-সামাজিক কাঠামোরই উপরিকাঠামো। আর্থসামাজিক কাঠামোর ওপরই নির্ভর করে রাজনীতির রূপ ও কাঠামো। যেমন, পুঁজিবাদী-আর্থসামাজিক কাঠামোর রাজনৈতিক রূপ ও কাঠামোও এমনভাবে বিন্যস্ত যে, এতে শুধুমাত্র পুঁজিবাদের ধারক-বাহকেরাই রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে পারে। সামন্তবাদী আর্থসামাজিক ব্যবস্থার উপরিকাঠামো ছিল রাজতন্ত্র। আবার সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনীতি হয় সর্বহারা শ্রেণীর একনায়কত্বভিত্তিক রাজনীতি। আর্থসামাজিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠলেও এরা পরস্পর পরস্পরের সম্পূরক। (হারুনুর রশীদ, রাজনীতিকোষ, মাওলা ব্রাদার্স/১৯৯৯, পৃ. ৩৪১)।
গণতন্ত্র ও আধুনিক একনায়কতন্ত্রে দলীয় সংগঠন ও ভূমিকার পার্থক্য থাকলেও উভয় প্রকার শাসনব্যবস্থায় রাজনৈতিক দল তথা রাজনীতিবিদদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বলা হয়, যখন কোনো জনসমষ্টি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাবলি সম্পর্কে একই প্রকার মত পোষণ করে, তখন তারা একটি রাজনৈতিক দল গঠন করে। অর্থাৎ রাজনৈতিক দল বলতে রাষ্ট্রের একদল নাগরিককে বুঝায়, যারা কম-বেশি সংঘবদ্ধ, যারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে এবং যারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় গিয়ে নিজেদের সাধারণ নীতি ও কর্মসূচি বাস্তবায় করে বা করতে চায়। তার মানে রাজনীতি মূলত একটি আদর্শ ও কর্মসূচিনির্ভর তৎপরতা—যার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদেরকেই রাজনীতিবিদ বা রাজনৈতিক কর্মী বলা হয়। অতএব, কোন দলের কর্মীর আচরণ ও ব্যক্তিত্ব কেমন হবে, সেটি অনেকাংশে ওই দলের নীতি-আদর্শের ওপর নির্ভর করে। আবার কিছু ব্যতিক্রমও আছে। এটা ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে। যে কারণে দেখা যায় একই দলের দশজন শীর্ষ নেতার ব্যক্তিত্ব ও আচরণ আলাদা। কিন্তু সামগ্রিভাবে ওই দলের নীতি-আদর্শ নেতা ও কর্মীদের মধ্যে প্রতিফলিত হয়।
তার মানে যে দলের ভেতরে গণতন্ত্রের চর্চা আছে, নীতি-নৈতিকতা মেনে চলা তথা দুর্নীতিকে নিরুৎসাহিত করা হয়—সেই দলের নেতাদের পক্ষে খুব বেশি প্রতিহিংসাপরায়ণ ও দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়ার সুযোগ কম। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরেই যে গণতন্ত্রের চর্চা নেই এবং মূলধারার দলগুলো যে প্রধানত পরিবারকেন্দ্রিক তথা একটি নির্দিষ্ট ক্ষমতাবলয়ের ভেতরে খাবি খায়—সেটি প্রতিষ্ঠিত সত্য। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর একটা অভিন্ন চরিত্র হলো প্রতিহিংসা তথা প্রতিপক্ষ নির্মূল করা। অর্থাৎ যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে তারা চেষ্টা করে তাদের প্রধান প্রতিপক্ষকে নির্মূল করে দিতে। দলীয় আদর্শ কিংবা জনগণের ভালোবাসা দিয়ে নয়, বরং তারা জিততে চায় ক্ষমতা দিয়ে। রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও প্রশাসনিক ক্ষমতার জোরে। প্রতিপক্ষের লোকজনেক খুন, গুম এবং মামলা দিয়ে কারাগারে ভেতরে রেখে তাদের দুর্বল তথা নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া বাংলাদেশের রাজনীতির একটি বড় বৈশিষ্ট্য। সুতরাং, যে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্ব নির্বাচন এবং নেতৃত্ব গড়ে তোলার পদ্ধতিতেই গণতন্ত্র অনুপস্থিত এবং কয়েকটি পরিবার ও কিছু ব্যবসায়ী ও সামরিক-বেসমারিক সিন্ডিটের কাছে দলগুলো জিম্মি—সেই দেশের রাজনীতি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হবে কী করে, সেটি বিরাট প্রশ্ন।
সুতরাং, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মতো রাজনীতিবিদদেরই এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে যে, তার দলের ভেতরে গণতন্ত্রের চর্চা আছে কি না। প্রতিপক্ষ নির্মূলে তারা অন্য দলগুলোর মতো একই তরিকা অবলম্বন করেন কি না; চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পর থেকে তার দল বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে যে চাঁদাবাজি ও দখলবাজির অভিযোগ আসছে; তাদের নানা অপকর্মের খবর যে প্রতিনিয়ত সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হচ্ছে—সেসব প্রতিরোধে তারা কী ব্যবস্থা নিয়েছেন বা নিচ্ছেন?
দলের নেতাকর্মীরা আওয়ামী লীগের ১৫ বছরে নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হয়ে এখন ১৫ বছরের ‘ক্ষতি পোষানোর’ নামে নানাবিধ অন্যায়-অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছেন, তাদের জন্য সম্মানজনক আয়ের পথ সৃষ্টিতে দল কি কোনো ভূমিকা রেখেছে? অর্থাৎ যারা দলের জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় নামেন; পুলিশি নির্যাতন শিকার হন; ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন বিসর্জন দেন—তাদের সম্মানজনক জীবিকা নিয়ে দল কি কখনো ভেবেছে? নাকি দল ক্ষমতায় যাবে আর যে যার মতো চাঁদাবাজি-দখলবাজি করে চলবে—এটাই অলিখিত নিয়মে পরিণত হবে?
প্রত্যেক দলের মূল লক্ষ্য হওয়ার কথা রাষ্ট্র ও সমাজের কল্যাণ সাধন। কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর বিশেষ স্বার্থে কাজ করলে কোনো দলকে প্রকৃত রাজনৈতিক দল বলা যায় না। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে রাষ্ট্র ও সমাজের কল্যাণের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থই প্রাধান্য পায়।