মার্কিন চুক্তি: আমরা ট্রাম্পের আদেশপত্র মানতে বাধ্য নই
আমার সামনে ৩২ পৃষ্ঠার যে দলিল আছে, তার শিরোনাম—‘অ্যাগ্রিমেন্ট বিটুইন দ্য ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা অ্যান্ড দ্য পিপলস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ অন রেসিপ্রোক্যাল ট্রেড’, অর্থাৎ এটি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্যচুক্তির একটি দলিল।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্যচুক্তি হতেই পারে। তবে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যের যৌক্তিক বিস্তারের জন্য অর্থনীতির কিছু সাধারণ নিয়ম আছে, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মধ্যে নানা দেনদরবারে স্বীকৃত কিছু বিষয় আছে, পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থারই নিয়ম এসব। বাজার অর্থনীতিরই সাধারণ বিধি।
কিন্তু এই দলিল পড়ে মনে হয় না যে দুনিয়ায় কোনো বিধিবিধান কাজ করে, অর্থনীতির নিয়মের কোনো গুরুত্ব আছে, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা বলে একটা প্রতিষ্ঠান আছে, যুক্তির কোনো স্থান আছে। ‘জোর যার মুল্লুক তার’—এ দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েই এই দলিল তৈরি।
প্রথম পাতার আর্টিকেল ১ থেকে শুরু করে পাতায় পাতায় বাংলাদেশ শুল্ক, আমদানি, অন্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্য, নিজ দেশের বিনিয়োগ–বাণিজ্য নিয়ে নীতি সিদ্ধান্ত কী কী নিতে বাধ্য থাকবে, বাধ্যতামূলকভাবে কী কী করতে হবে, তার বিস্তারিত বিবরণ।
আর যুক্তরাষ্ট্রের করণীয় যে কয়টি লাইন আছে, তা হলো তারা বাংলাদেশকে কীভাবে শায়েস্তা করবে, তার কিছু হুমকি। সুতরাং এ রকম দলিলকে কোনো সুস্থ কাণ্ডজ্ঞানের মানুষ দুই পক্ষের চুক্তিপত্র বলবে না, এটা বস্তুত বাংলাদেশের জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের আদেশপত্র। বোঝাই যায়, এটা তাদেরই প্রণীত, নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে ইউনূস সরকারের লোকজন তাতে অধীনতার সম্মতি দিয়ে স্বাক্ষর করেছেন মাত্র।
গত বছরে বিভিন্ন দেশের ওপর ট্রাম্পের শুল্ক হুমকি এবং উন্মাদ তৎপরতায় সারা বিশ্বে অস্থিরতা তৈরি হলেও পৃথিবীর মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি দেশ ছাড়া কোনো দেশই এখন পর্যন্ত এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি। যে কয়টি দেশ করেছে, তারাও এ রকম দাসখত দেওয়া অঙ্গীকারনামায় মাথা জমা দেয়নি।
ইউনূস সরকারের লোকজনের একটাই যুক্তি যে এই চুক্তি না করা হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ঢুকতে বাংলাদেশকে উচ্চ শুল্ক দিতে হতো, সেটা কমিয়ে ১৯ শতাংশ করা হয়েছে। অথচ হম্বিতম্বির কয়েক মাসের মধ্যে কোনো চুক্তি ছাড়াই ট্রাম্প বিভিন্ন দেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া উচ্চ শুল্কহার উল্লেখযোগ্য হারে কমাতে বাধ্য হয়েছেন। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই ট্রাম্পের এই শুল্কনীতি বৈধতা অর্জন করতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে প্রথমে নিউইয়র্কের আদালত, পরে ফেডারেল আদালত এবং শেষে সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের শুল্কনীতিকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আমরা অংশগ্রহণ করি কেন? অংশগ্রহণ করি এই কারণে যে সব দেশেই অনেক কিছু আমদানি করতে হয় আবার অনেক কিছু রপ্তানি করা সম্ভব হয়। যেটা আমাদের বাড়তি উৎপাদন হয়, সেটা আমরা রপ্তানি করি। আবার যেগুলো আমাদের প্রয়োজন, আমাদের ঘাটতি আছে, সেগুলো আমদানি করি। কোত্থেকে আমদানি করি? যেখানে আমরা কম দামে পাই, মান ভালো পাই, সেখান থেকে আমদানি করি। এটা হলো অর্থনীতির প্রাথমিক নিয়ম।
যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের যত রপ্তানি হয়, তার তুলনায় আমদানি কম। তাতে বাণিজ্যঘাটতি থাকে যুক্তরাষ্ট্রের। ট্রাম্পের যুক্তিতে এটা আমাদের অপরাধ, সে জন্য শাস্তি হিসেবে তাদের থেকে বাধ্যতামূলকভাবে আরও বেশি আমদানি করতে হবে। দরকার কিংবা দাম—কোনো কিছুই বিবেচনা করা যাবে না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমরা যে তুলনায় কম আমদানি করি, তার কারণ, সেখান থেকে আর কিছু আমদানি আমাদের জন্য যুক্তিযুক্ত নয়, এটা তাদের সমস্যা, আমাদের নয়।
যেমন উল্টো ভারত ও চীনে আমরা যত রপ্তানি করি, তার প্রায় ১০ গুণ বেশি আমদানি করি, তাতে আমাদের বড় বাণিজ্যঘাটতি থাকে। ট্রাম্পের যুক্তি দিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি চললে বলতে হবে, আমাদের বাণিজ্যঘাটতির জন্য ওই দুই দেশই অপরাধী, ভারত ও চীনকে বাধ্যতামূলকভাবে আমাদের থেকে আরও আমদানি বৃদ্ধির দাবি জানাতে হবে। এটা তো কোনো যুক্তি হতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্র যদি তার পণ্য রপ্তানি বাড়াতে চায়, আমরাও যদি ভারত-চীনে রপ্তানি বাড়াতে চাই, উচিত নিজের অর্থনীতিকে সেভাবে সাজানো, প্রতিযোগিতার সক্ষমতা অর্জন করা, পণ্য বহুমুখীকরণ। দুই পক্ষেরই অস্বচ্ছতা, অনিয়ম দূর করা।
- ট্যাগ:
- মতামত
- বাণিজ্য চুক্তি
- শুল্ক আরোপ