বিএনপি কেন জুলাইয়ের সোল এজেন্সি জামায়াত-এনসিপির হাতে তুলে দিচ্ছে
সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার ভয় আমাদের পেয়ে বসেছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের যে শুরুটা হওয়ার কথা ছিল, তার সূচনাতেই আমরা হোঁচট খেয়েছি। একাত্তরের পর গণতন্ত্র থেকে সরে একদলীয় শাসনের পথ ধরে আমরা পড়েছি দীর্ঘ সামরিক শাসন ও স্বৈরাচারের খপ্পরে।
নব্বই আবার আমাদের গণতন্ত্রে ফেরার সুযোগ দিয়েছিল। তিনটি রাজনৈতিক জোটের পক্ষ থেকে সামনের রাষ্ট্র পরিচালনার একটি রূপরেখায় সবাই একমত হয়েছিল। কিন্তু এরপর বিজয়ী দল ও জোটগুলো ক্ষমতায় গিয়ে একে একে সেই প্রতিশ্রুতি ভেঙেছে। সবারই লক্ষ্য ছিল নিজেদের ক্ষমতা সংহত করা ও ক্ষমতা যাতে না ছাড়তে হয়, সে জন্য নানা ফন্দিফিকির করা।
এসব করতে গিয়ে রাষ্ট্রের যে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধারাবাহিকভাবে জোরদার ও সংহত করার দরকার ছিল, সেগুলো উল্টো দুর্বল এবং এক পর্যায়ে অকার্যকর করে ফেলা হয়েছে। পরিণতিতে এক দীর্ঘ ও নির্মম স্বৈরশাসনের মধ্যে পড়তে হয়েছিল বাংলাদেশর জনগণকে।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান এই দানবীয় শাসনের উৎখাত ঘটিয়ে আবার নতুন সুযোগ ও সম্ভাবনা তৈরি করেছে। মানুষ আশা করতে থাকে, এবার যেভাবেই হোক পরিবর্তন আনতে হবে। এমন সংস্কার করতে হবে, যাতে কোনো সরকার আর ভবিষ্যতে স্বৈরাচার হয়ে উঠতে না পারে, গুম–খুনের মতো ভয়ংকর কাজ করতে না পারে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেন জবাবদিহির মধ্যে থাকে, সরকার যেন বাহিনীগুলোকে তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী ব্যবহার করতে না পারে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের যেন বিচার হয় বা মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যাতে নিশ্চিত হয়।
গণ-অভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনকাল খুব সুখকর ছিল না। দেশ এ সময় নানা অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়েও গেছে। তবে সংস্কারের বেশ কিছু উদ্যোগ তারা নেয় এবং ভবিষ্যতের সরকার পরিচালনার নানা দিক নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি সমঝোতার চেষ্টা হয়। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মধ্যস্থতায় জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি সেই চেষ্টারই ফল। অন্তর্ভুক্তিমূলক না হলেও অন্তর্বর্তী সরকার শেষ পর্যন্ত একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করতে পেরেছে এবং এর মধ্য দিয়ে আবার নতুন করে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছে।
কিন্তু ঘরপোড়া গরুর মতো ভয় ও সংশয় আমাদের মন থেকে দূর হয় না। এবারও যে সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাবে না—এটা আমরা নিশ্চিত হতে পারছি না। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সংস্কার ইস্যু ও আইনের ক্ষেত্রে বিএনপির অবস্থান এই সন্দেহকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
আমরা জানি, জুলাই জাতীয় সনদের বেশ কিছু বিষয়ে নির্বাচনে বিজয়ী দল বিএনপি আগেই তাদের আপত্তি বা নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে রেখেছে। কারও পছন্দ হোক বা না হোক, সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী দল বিএনপি যে তাদের আপত্তিগুলো বাস্তবায়ন করবে না, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বিএনপি জুলাই সনদে সম্মতি দেওয়া বিষয়গুলো থেকেও সরে আসতে বা নিজেদের মতো করে কিছু করতে চাইছে বলে মনে হচ্ছে।
অনেক উদাহরণের কয়েকটি উল্লেখ করছি। জুলাই সনদের আইন ও অধ্যাদেশ, বিধি ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সংস্কারের বিষয়গুলোর উল্লেখ আছে। সেখানে বিচার বিভাগের ক্ষেত্রে মাত্র দুটি বিষয়ে বিএনপির আপত্তি আছে। একটি স্বতন্ত্র ফৌজদারি তদন্ত সার্ভিস গঠনের ব্যাপারে, অন্যটি আইনজীবী সমিতি ও বার কাউন্সিলের নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের কোনো সংগঠনকে স্বীকৃতি না দেওয়ার বিষয়ে। এর বাইরে বিচারকদের জন্য পালনীয় আচরণবিধিসহ সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার মতো সব বিষয় বিএনপি মেনে নিয়েছে। কিন্তু আমরা দেখলাম, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ২০২৫ সরকার বাতিল করে দিল।
নেওয়ার পরপরই গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদে সই করল। সেই গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার-সংক্রান্ত দুটি অধ্যাদেশও সরকার বাতিল করল।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ২০টি অধ্যাদেশ বাতিল বা কার্যকারিতা হারিয়েছে। মানে, বিএনপি সরকার এগুলো পাস করতে চায়নি। বাতিল বা কার্যকারিতা হারানো অধ্যাদেশগুলোর অধিকাংশ বিবেচনায় (সুপ্রিম কোর্ট বিচারপতি নিয়োগ অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়-সংক্রান্ত দুটি অধ্যাদেশ, পৃথক জাতীয় সংসদ সচিবালয়, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত তিনটি অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার-সংক্রান্ত দুটি অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশন সংশোধন অধ্যাদেশ এবং বাংলাদেশ পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ) নিলে দেখা যাবে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, জবাবদিহি, সুশাসন, মানবাধিকার ও দুর্নীতিবিরোধী উদ্যোগগুলোর ওপরই খড়্গ নেমে এসেছে।