ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সামাজিক উৎসব: পাহাড়ি সংস্কৃতির অনন্য রূপ

www.ajkerpatrika.com ড. মো. আনোয়ার হোসেন প্রকাশিত: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১৩:২১

প্রকৃতির আবর্তনে ঋতুরাজ বসন্ত বিদায় নিয়ে যখন রুদ্র বৈশাখের পদধ্বনি শোনা যায়, তখন বাংলার জল-হাওয়া আর পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে জেগে ওঠে এক অপার্থিব উৎসবের দোলা। বাঙালির ‘পয়লা বৈশাখ’ আর পাহাড়ের ‘বৈসাবি’ যেন একই সূত্রে গাঁথা দুই ভিন্ন সুরের এক অনবদ্য রাগিণী। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, ‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা/অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’ এই শুচিতার আবাহন কেবল সমতলের বাঙালির নয়, বরং পাহাড়ের কন্দরে বসবাসরত প্রতিটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রাণের স্পন্দন।


চৈত্রসংক্রান্তির বিদায়বেলা আর নববর্ষের আবাহন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় পাহাড়ের অনন্য লোকজ ঐতিহ্যে। এই উৎসব কেবল আনন্দের নয়, বরং শিকড়ের টানে ফেরার, ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করার এবং আদিম সংস্কৃতির সৌরভকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার এক মহাসম্মেলন।


পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তম নৃগোষ্ঠী চাকমাদের প্রধান উৎসব হলো ‘বিজু’। এটি মূলত তিন দিনব্যাপী পালিত হয়—ফুল বিজু, মূল বিজু এবং গোজ্যাপোজ্যা দিন। প্রথম দিন ভোরে ফুল দিয়ে ঘর সাজানো এবং নদীতে ফুল ভাসিয়ে গঙ্গা দেবীর পূজা করা হয়, যা পাহাড়ের স্নিগ্ধতাকে দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়। বাড়ির আঙিনায় শিশুদের কলকাকলি আর প্রিয়জনের সান্নিধ্যে এই দিনটি হয়ে ওঠে অত্যন্ত আনন্দময়।

বিজুর দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ মূল বিজুর মূল আকর্ষণ হলো ‘পাজন’। এটি অন্তত ৩২ রকমের সবজি দিয়ে তৈরি এক বিশেষ নিরামিষ ব্যঞ্জন, যা প্রতিটি ঘরে রান্না করা হয়। এই দিনে পাড়ার ঘরে ঘরে নিমন্ত্রণ বিনিময় চলে এবং ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলার পাশাপাশি ‘বিজু নৃত্য’ পরিবেশিত হয়। উৎসবের আমেজ প্রতিটি পাহাড়ি জনপদকে এক রঙিন রূপ দান করে।

তৃতীয় দিন তথা গোজ্যাপোজ্যা দিনটি মূলত বিশ্রামের এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের আশীর্বাদ নেওয়ার দিন। বৌদ্ধমন্দিরে গিয়ে প্রার্থনা এবং প্রদীপ প্রজ্বালনের মাধ্যমে তারা জগতের সকল প্রাণীর মঙ্গল কামনা করে। এই দিনটি আধ্যাত্মিক শান্তিতে পূর্ণ থাকে।


মারমা সম্প্রদায়ের প্রধান সামাজিক উৎসব হলো ‘সাংগ্রাই’। তারা মূলত চান্দ্রমাস অনুসারে বছরের শেষ তিন দিন এই উৎসব পালন করে থাকে। উৎসবের প্রথম দিনে তারা বুদ্ধমূর্তি স্নান করায় এবং ধর্মীয় শোভাযাত্রা বের করে। মারমাদের এই উৎসবটি তাদের ঐতিহ্যের এক সমৃদ্ধ প্রতিফলন, যেখানে আধ্যাত্মিকতা ও সামাজিকতা হাত ধরাধরি করে চলে।


সাংগ্রাইয়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং দর্শনীয় অংশ হলো ‘রিলং পোয়ে’ বা জলকেলি উৎসব। তরুণ-তরুণীরা একে অপরের গায়ে পানি ছিটিয়ে পুরোনো বছরের গ্লানি ধুয়ে ফেলে এবং পবিত্র মনে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়। এই পানি ছিটানোর উৎসব অনেকটা বিশুদ্ধ ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। মনে হয় যেন পাহাড়ের চূড়া থেকে দেবতারাও এই জলকেলিতে যোগ দিতে ব্যাকুল হয়ে ওঠেন।


উৎসবের সমাপ্তি ঘটে নানাবিধ পিঠা তৈরি এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। মারমারা তাদের বিশেষ ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে নাচ-গানে মেতে ওঠে। কবি শঙ্খ ঘোষের ভাষায়, ‘পবিত্র এই জলধারা যেন ধুয়ে দেয় মনের সব কলুষতা’। সাংগ্রাই উৎসবের মধ্য দিয়ে মারমা সমাজ তাদের সংহতি এবং ভ্রাতৃত্ববোধের এক অনন্য নজির স্থাপন করে।


ত্রিপুরাদের প্রধান উৎসবের নাম ‘বৈসু’। চৈত্রসংক্রান্তির দুই দিন আগে থেকেই উৎসবের প্রস্তুতি শুরু হয়। উৎসবের প্রথম দিনকে বলা হয় ‘হারি বৈসু’, দ্বিতীয় দিন ‘বিসুমা’ এবং তৃতীয় দিন ‘বিসিকাতাল’। ছোট ছেলেমেয়েরা ভোরে ফুল সংগ্রহ করে ঘরদোর সাজায় এবং গৃহপালিত পশুদের গলায় ফুলের মালা পরিয়ে সম্মান জানায়।


বৈসু উৎসবের বিশেষ একটি দিক হলো ‘গড়াইয়া নৃত্য’। ত্রিপুরারা বিশ্বাস করে, গড়াইয়া দেবতা তাদের তুষ্ট হলে জুম চাষ ভালো হবে এবং রোগবালাই দূর হবে। তরুণ-তরুণীরা ঢোলের তালে তালে এই নাচে অংশ নেয়, যা বীরত্ব ও আধ্যাত্মিকতার সংমিশ্রণ। তাদের এই রঙিন পোশাক আর ছন্দময় নাচে পাহাড়ের প্রকৃতিও যেন নতুন রূপ ধারণ করে।


ত্রিপুরাদের আতিথেয়তা এই সময়ে চরমে পৌঁছায়। তারা অতিথিদের ‘সুজানি’ বা বিশেষ পানীয় দিয়ে আপ্যায়ন করে। বিসুমা দিনে ঘরে ঘরে বিশেষ খাবার প্রস্তুত করা হয় এবং


একে অপরের বাড়িতে গিয়ে কুশল বিনিময় করে। এটি কেবল একটি উৎসব নয়, বরং ত্রিপুরা জাতির আত্মপরিচয় রক্ষার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।


তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের উৎসবের নাম ‘বিষু’। তারা মনে করে চৈত্রসংক্রান্তির এই সময়টি প্রকৃতির পরিবর্তনের প্রতীক। বিষু উৎসবের প্রথম দিনে তারা নদী বা ঝরনায় স্নান করে পবিত্র হয় এবং ফুল দিয়ে বাড়িঘর সাজায়। তাদের সরল জীবনযাপনের প্রতিফলন এই উৎসবের পরতে পরতে লক্ষ করা যায়।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও