কেমন গেল মেয়র মামদানির প্রথম ১০০ দিন
নিউইয়র্কের মেয়র হিসেবে প্রথম ১০০ দিন অতিবাহিত করেছেন জোহরান মামদানি। তাঁর নির্বাচনকে ঘিরে যে উত্তেজনা, প্রত্যাশা ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছিল; তার অনেকটা মিইয়ে এসেছে। তিনি এখন আর নিয়মভঙ্গকারী কোনো র্যাডিক্যাল নন। তাঁর ভয়ে শহর ত্যাগ করেছে এমন কোনো বিলিয়নিয়ারের কথা শোনা যায়নি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর প্রবল কলহের যে আশঙ্কা কোনো কোনো মহলে ব্যক্ত করা হয়েছিল, তাও সত্যি প্রমাণিত হয়নি।
তিনি এখন কেবলই একজন মেয়র। এক শ দিনের মাথায় তাঁর যে রিপোর্ট কার্ড, তাতে এই শহরের নাগরিকদের প্রতিক্রিয়া মিশ্র। ৪৮ শতাংশ মানুষ তাঁর প্রতি আস্থা রাখে বলে জানিয়েছে, অনাস্থা জানিয়েছে ৩০ শতাংশ মানুষ। অবশিষ্ট ২২ শতাংশ মানুষ জানিয়েছে, তারা এখনো তাদের এই তরুণ মেয়রের ব্যাপারে মনস্থির করে উঠতে পারেনি।
অন্য কথায়, মোটের ওপর ভালো। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যদি এমন রিপোর্ট কার্ড হতো, তিনি বর্তে যেতেন।
নির্বাচনের আগে মামদানি বিস্তর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ইতিপূর্বে আমি লিখেছিলাম, ৩৩ বছর বয়স্ক এই ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট স্রেফ স্বপ্ন বিক্রি করে নির্বাচনে জিতে গেলেন। কথাটা একদম মিথ্যে নয়। তিনি বিনে পয়সায় সরকারি বাস চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বলেছিলেন ভাড়া-নিয়ন্ত্রিত অ্যাপার্টমেন্টের ভাড়া বৃদ্ধি স্থগিত রাখবেন। সরকারি মালিকানায় মুদিদোকান খোলার কথাও বলেছিলেন। স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য কয়েক হাজার নতুন বাড়ি বানানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এর কোনোটাই বাস্তবায়িত হয়নি। সমস্যা অর্থের। তিনি ক্ষমতা গ্রহণের আগেই শহরের বাজেটে বড় রকমের ঘাটতি ধরা পড়েছিল। ক্ষমতা গ্রহণের পর ধরা পড়ল ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ছয় বিলিয়ন ডলার। এত বড় ঘাটতি নিয়ে নগর প্রশাসনের নিয়মিত কাজকর্ম চালানোই দুষ্কর।
একমাত্র যে ক্ষেত্রে তিনি নিজের কথা আংশিক হলেও রাখতে পেরেছেন, তা হলো সরকারি খরচে সর্বজনীন শিশু পরিচর্যার ব্যবস্থা। এ কাজে তাঁকে হাত বাড়িয়ে দেন নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের গভর্নর ক্যাথি হোকুল। প্রাথমিকভাবে তিনি রাজ্য সরকারের কাছ থেকে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি সাহায্য পেয়েছেন, যার ফলে এই কর্মসূচির প্রথম ধাপ তিনি চালু করতে পেরেছেন।
ছোটখাটো আরও কিছু কাজ তিনি করেছেন। নিউইয়র্ক টাইমস তার একটা সংক্ষিপ্ত ফিরিস্তি দিয়েছে এভাবে; ‘তিনি বাসের গতি বাড়ানোর একটি প্রকল্প চালু করেছেন; ডেলিভারি কর্মীদের জন্য সিটি হলের একটি বিশ্রামকেন্দ্র নির্মাণ করেছেন; শহরের প্রধান জেলখানা রাইকার্স আইল্যান্ডের বন্দীদের জন্য একটি নতুন চিকিৎসাকেন্দ্র চালু করেছেন; ধাপে ধাপে বিনা মূল্যে প্রিস্কুল সম্প্রসারণের জন্য রাজ্য থেকে অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করেছেন; এবং তাঁর দপ্তরের ক্ষমতা ব্যবহার করে খারাপ বাড়িওয়ালাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছেন।’
আকাশচুম্বী কোনো সাফল্যগাথা নয়, কিন্তু খুব মন্দও নয়।
মামদানির জন্য প্রধান সমস্যা হলো, তিনি চাইলেও করার মতো অর্থ বা প্রশাসনিক ক্ষমতা তাঁর নেই। তিনি বলেছিলেন অতিরিক্ত রাজস্ব সংগ্রহের জন্য মিলিয়নিয়ার-বিলিয়নিয়ারদের ওপর অতিরিক্ত আয়কর ধার্য করবেন। পারেননি, কারণ আয়কর বাড়াতে হলে তাঁকে গভর্নর হোকুলের সমর্থন পেতে হবে। কিন্তু হোকুল তাতে সায় দেননি। তাঁকে এ বছর নভেম্বরে পুনর্নির্বাচনে দাঁড়াতে হবে। তার আগে কর বাড়ানো আত্মহত্যার শামিল হবে।
মামদানি শহরের সম্পত্তি কর বাড়ানোর কথাও বলেছিলেন, কিন্তু নগর আইন পরিষদের সমর্থন না পাওয়াতে সে কাজও আপাতত বাদ দিয়েছেন। নিম্ন আয়ের ভাড়াটেদের আর্থিক সহায়তার যে প্রস্তাব তিনি করেছিলেন, অর্থের অভাবে তাও বাদ দিতে হয়েছে।
মোটকথা, যে স্বপ্ন তিনি নগরবাসীর কাছে বিক্রি করেছিলেন, তার অধিকাংশই আপাতত ফাইলবন্দী হয়ে থাকল।
তবে একটা জিনিস স্পষ্ট। মামদানি রাতদিন খেটে যাচ্ছেন। প্রায় প্রতিদিন শহরের পাঁচ জেলার (বড়) কোনো না কোনো রাস্তায় তাঁকে দেখা যায় সাধারণ নাগরিকদের সঙ্গে কথা বলতে। শহরে বরফ জমেছে, তিনি নিজে শাবল হাতে নিয়ে বরফ সরাতে নেমে গেছেন। পাবলিক বাসে ও পাতালরেলের সমস্যা কী দেখতে নিজে বাসে-পাতালরেলে ঘুরে অন্যান্য যাত্রীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। মুখখানা সারাক্ষণ হাসিমাখা। চেনা-অচেনা সবার প্রতিটি প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন যত্নসহকারে।
তিনি যে চেষ্টা করছেন তার সেরা সার্টিফিকেট পেয়েছেন আমেরিকার সবচেয়ে বিখ্যাত ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সের কাছ থেকে। এই বর্ষীয়ান র্যাডিক্যাল রাজনীতিক বলেছেন, মামদানি এ কথা প্রতিষ্ঠা করেছেন যে নিউইয়র্ক যতই ধনী বা প্রাচুর্যে ঠাসা হোক না কেন, এর প্রধান সমস্যা ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য। স্যান্ডার্স বলেছেন, সুখের চেয়ারের বসে লম্বা লম্বা কথা বলা সহজ। কিন্তু মামদানি শুধু কথা নয়, হাতেকলমে প্রতিটি সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করছেন। এতে তিনি আশার ইঙ্গিত দেখেন। ‘শুধু নিউইয়র্কে নয়, মামদানিকে দেখে অনুপ্রাণিত হচ্ছে পৃথিবীর অন্য অনেক দেশের মানুষ,’ স্যান্ডার্স বলেছেন।
- ট্যাগ:
- মতামত
- মেয়র
- কার্যক্রম
- পরিচালনা
- জোহরান মামদানি