আমরা কি পারমাণবিক বিপর্যয়ের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলাম?

ডেইলি স্টার মাহফুজ আনাম প্রকাশিত: ১০ এপ্রিল ২০২৬, ১৩:৫৩

চলমান আলোচনার মধ্যেই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আকস্মিক হামলা চালিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতাসহ আরও কয়েকজনকে হত্যা করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আশা করেছিলেন, দেশটি ভেঙে পড়বে। জানা গেছে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বলেছিলেন, ইরানের ওই নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করে দিলে দেশটি ভেঙে পড়বে এবং যুক্তরাষ্ট্রবান্ধব ও ইসরায়েলের অনুগত একটি সরকার সেখানে ক্ষমতায় আসবে।


কিন্তু ইরান তাদের আক্রমণকারীদের বিস্মিত করেছে এবং তাদের প্রতিরোধব্যবস্থার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে সম্মান অর্জন করেছে। হ্যাঁ, তারা কয়েকটি উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশে হামলা চালিয়েছে। তবে তা সীমাবদ্ধ ছিল সেসব দেশে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা এবং কিছু জ্বালানি অবকাঠামোতে, যখন সংশ্লিষ্ট দেশগুলো তাদের ভূখণ্ড থেকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলকে হামলা চালানোর অনুমতি দিচ্ছিল। ইরানের জনগণ প্রশংসার দাবিদার। কারণ তারা প্রমাণ করেছে, কোনো দেশ বা জোট সামরিকভাবে যতই শক্তিশালী হোক না কেন, তাদের কর্মকাণ্ডের নৈতিক ও ন্যায়সঙ্গত ভিত্তি না থাকলে আক্রান্ত দেশ প্রতিরোধ করতে পারে, টিকে থাকতে পারে এবং পাল্টা আঘাতও হানতে পারে। এটি সবার জন্যই তাৎপর্যপূর্ণ শিক্ষা।


সম্প্রতি দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে যেটি থামানো হয়েছে, সেখানে যুদ্ধের চেয়ে বেশি ছিল উন্মাদনা। এমন এক উন্মাদনা, যা বিশ্বকে পারমাণবিক বিপর্যয়ের কিনারায় নিয়ে গিয়েছিল, যা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকেও নিয়ে যেতে পারত। এই সংঘাতের সঙ্গে যেসব দেশের কোনো সম্পর্ক নেই, তাদের জনগণকেও চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। বাংলাদেশে আমরা আমাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে মারাত্মক বিঘ্নের সম্মুখীন হয়েছি। বুধবার প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যাবে, ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচেই থেকে যাবে যাদের অবস্থার পরিবর্তন হওয়ার কথা ছিল, ৬ লাখ কর্মসংস্থান হারিয়ে যাবে এবং ২০২৮ অর্থবছরের মধ্যে সরকারি ঋণ জিডিপির ৪৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। এই সবই হয়েছে সেই উন্মাদনার কারণে।


বিশ্বব্যাংক তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, ‘মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতিকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করতে পারে, বিদ্যমান দুর্বলতাগুলোকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।’ তারা আরও জানায়, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি হ্রাস এবং প্রবাসী আয়ের পতন চলতি হিসাবের ভারসাম্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। অন্যদিকে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং বিনিময় হারের ওপর চাপ ইতোমধ্যেই মূল্যস্ফীতিকে আরও বৃদ্ধি করতে পারে।


বাংলাদেশ এবং একই ধরনের অর্থনৈতিক অবস্থানে থাকা অন্যান্য দেশগুলো কি এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার কথা ছিল? এমনকি উন্নত দেশগুলোও কি পারমাণবিক সংঘাতের এতটা কাছাকাছি চলে যাওয়ার কথা ছিল?


এই যুদ্ধে আমরা এমন পরাশক্তি দেখছি, যারা অন্ধভাবে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও সম্প্রসারণবাদী শক্তির দ্বারা অযৌক্তিকভাবে প্রভাবিত। প্রথমজন তথ্য, যুক্তি, অভিজ্ঞতা বা বাস্তবতার পরিবর্তে প্রবৃত্তির ওপর নির্ভর করেন। আর দ্বিতীয়জন অন্য দেশ দখল করে নিজের দেশ সম্প্রসারণের স্বপ্ন দেখেন, যদিও এতে তার দেশের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ে।


সব পক্ষের মাঝে পাকিস্তান আপাতত মধ্যস্থতাকারী হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছে এবং ইসলামাবাদে আলোচনার আয়োজন হচ্ছে। ঘোষণা অনুযায়ী, শুক্র বা শনিবার আলোচনা শুরু হওয়ার কথা। আমরা আশা করি, আলোচনা সফল হবে এবং এই অঞ্চলসহ পুরো বিশ্বে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসবে। তবে অবশ্যই ইসরায়েল এটি ব্যাহত করার চেষ্টা করবে, যার প্রাথমিক লক্ষণ ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান।


দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আজকের যুক্তরাষ্ট্র এমন এক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বিশ্বাসী হয়ে উঠেছে বলে মনে হয়, যা আইনের ভিত্তিতে নয়, বরং উন্মুক্ত শক্তি প্রদর্শন ও আধিপত্য বিস্তারের ওপর নির্ভরশীল। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে অপহরণ, গ্রিনল্যান্ড দখলের প্রকাশ্য ঘোষণা এবং কিউবা ‘পরিচালনার’ হুমকি—এসব দেখে মনে হয়, ট্রাম্প গোটা বিশ্বকে হাতের ‘খেলনা’ ভাবেন, যেটা যেমন খুশি চালাতে পারেন।


৭ এপ্রিল ইরানের জ্বালানি ও পরিবহন অবকাঠামোর ওপর ব্যাপক হামলা চালানোর নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘আজ রাতে পুরো একটি সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে’। কোনো সভ্যতার সব মানুষকে হত্যা না করে কীভাবে এটিকে ধ্বংস করা যায়? তাহলে কি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের প্রতিটি পুরুষ, নারী ও শিশুকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেছিলেন? এটি কেবল পারমাণবিক বোমা ব্যবহার করেই সম্ভব। এর আগে যখন তিনি ইরানকে ‘প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে দেওয়ার’ হুমকি দেন, তখন তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, দেশটিতে এমন তীব্র বোমাবর্ষণ করা হবে যাতে আধুনিক জীবনের প্রতিটি অবকাঠামো—বাড়ি, স্কুল, হাসপাতাল, সড়ক, পানির সরবরাহ, খাদ্যের উৎস এবং সাধারণ জীবিকার উপকরণ—সব ধ্বংস হয়ে যাবে। এসবই ইরানের জনগণের প্রতি গভীর ঘৃণার ইঙ্গিত বহন করে।


ট্রাম্প প্রশাসনের একটি যুক্তি রয়েছে যা কিছুটা বিবেচনার দাবি রাখে। সেটি হলো—ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখা। কিন্তু গত মার্চের মাঝামাঝি সময়ে পদত্যাগকালে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সন্ত্রাসবাদবিরোধী কর্মকর্তা জো কেন্ট প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘কোনো তাৎক্ষণিক হুমকি’ নয়। এরপরেও ইরানের ওপর হামলা চালানো দেশটির ক্ষেত্রে এমন প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার যৌক্তিকতা তৈরি করে। উত্তর কোরিয়া সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র একটি কথাও বলে না। অথচ তাদের মিত্র দক্ষিণ কোরিয়া কেবল পারমাণবিক বোমা থাকার কারণে উত্তর কোরিয়ার ভয়ে সর্বদা আতঙ্কে থাকে।


এখানে আমাদের মনে রাখা উচিত, ২০১৫ সালে ভিয়েনায় ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া এবং চীনের মধ্যে জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) চুক্তি সই হয়েছিল। চুক্তি অনুযায়ী এটি নিশ্চিত করা হয়েছিল যে ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরি করবে না। মূলত এটি ছিল অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা, যার প্রধান লক্ষ্য ছিল ইরানকে পারমাণবিক বোমা তৈরির পথ থেকে বিরত রাখা। ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখতে (যা অস্ত্রমান ৯০ শতাংশের অনেক নিচে), তাদের মজুদ প্রায় ৯৮ শতাংশ কমাতে, পারমাণবিক অবকাঠামো সংকুচিত করতে এবং আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) কঠোর তদারকি মেনে নিতে সম্মত হয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা এই চুক্তিকে ইতিহাসের ‘অন্যতম শক্তিশালী পরিদর্শন ব্যবস্থার’ একটি হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। এর বিনিময়ে ইরান নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ এবং অর্থনৈতিক একীকরণের সুযোগ পাওয়ার কথা ছিল।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও