আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের ঝুঁকিগুলো কী
আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে অন্তর্বর্তী সরকারের করা সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশকে স্থায়ী আইনে রূপ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে দৈনিক প্রথম আলো ৩ এপ্রিল জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ১৬টি শিগগিরই অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। এসবের মধ্যে বিচারক নিয়োগ, গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার কমিশন ও দুদকের ক্ষমতা বাড়ানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বিএনপি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিষিদ্ধ করা নাকি রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করার এসব জরুরি সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেবে?
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড: দল নিষিদ্ধ কবে, কীভাবে
বিষয়টি সহজভাবে বুঝতে হলে আন্তর্জাতিক নিয়ম কী বলে, তা দেখা দরকার। ইউরোপের ‘কাউন্সিল অব ইউরোপ’-এর অধীন ভেনিস কমিশন ২০০০ সালে একটি গাইডলাইন দেয় (গাইডলাইনস অন প্রোহিবিশন অ্যান্ড ডিসলিউশন অব পলিটিক্যাল পার্টিজ অ্যান্ড অ্যানালগাস মেজারস)। সেখানে বলা হয়েছে, কোনো রাজনৈতিক দলকে সহজে নিষিদ্ধ করা যাবে না; এটি করা যাবে শুধু খুবই ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে, যেমন দলটি সহিংসতা সমর্থন করে বা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভাঙতে সহিংস পথ নেয়। শুধু রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেই দল নিষিদ্ধ করা গ্রহণযোগ্য নয়।
এ দৃষ্টিতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে কেউ অপরাধ করলে ব্যক্তিগতভাবে তার বিচার হওয়া উচিত, পুরো দলকে দায়ী করা নয়।
আন্তর্জাতিক গাইডলাইন অনুযায়ী, দল নিষিদ্ধ হবে একেবারে শেষ উপায়—‘আটমোস্ট রেস্ট্রেইন্ট’ বা সর্বোচ্চ সংযম মেনে। নইলে এটি ‘কালেকটিভ পানিশমেন্ট’ বা সমষ্টিগত শাস্তি হয়ে যেতে পারে, যা রাজনীতিকে একপেশে ও প্রতিশোধমূলক করে তোলে। তাই ভেনিস কমিশন এবং অর্গানাইজেশন ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড কো-অপারেশন ইন ইউরোপ বলেছে, এ ক্ষেত্রে ‘প্রপোরশনালিটি’ (মাত্রার ভারসাম্য রাখা), ‘নেসেসিটি’ (অপরিহার্যতা) ও ‘জুডিশিয়াল স্ক্রুটিনি’ (বিচারিক যাচাই-বাছাই) মানা জরুরি।
আন্তর্জাতিক উদাহরণ দেখলে বিষয়টি আরও সহজে বোঝা যায়। সব দেশে দল নিষিদ্ধ করলে একই ফল হয় না, কিন্তু প্রায় সব ক্ষেত্রেই এতে বড় ঝুঁকি তৈরি হয়। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের একটি ব্রিফিং (ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট ব্রিফিং অন পলিটিক্যাল পার্টি ব্যানস’, আগস্ট ২০২৫) দেখায়, সেখানে দল নিষিদ্ধকে গণতন্ত্র বাঁচানোর শেষ অস্ত্র হিসেবে দেখা হয়; সাধারণ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সামাল দেওয়ার উপায় হিসেবে নয়। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাকে দেশভিত্তিকভাবে দেখলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়।
- অভিজ্ঞতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়, তা হলো প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতিকে দুর্বল করে কোনো রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করা সম্ভব নয়। বিএনপির জন্য এখানেই একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা রয়েছে।
- নিষেধাজ্ঞাকে যদি স্থায়ী আইনি কাঠামোয় রূপ দেওয়া হয়, কিন্তু একই সঙ্গে বিচার, মানবাধিকার, গুম প্রতিরোধ ও দুর্নীতি দমনসংক্রান্ত সংস্কারগুলো পিছিয়ে যায়, তাহলে তা একটি সংকট সৃষ্টি করবে।
জার্মানি
প্রথমে জার্মানির কথা ধরা যাক। সেখানে ‘মিলিট্যান্ট ডেমোক্রেসি’ (প্রতিরক্ষামূলক গণতন্ত্র) ধারণা থাকলেও বাস্তবে কোনো দল নিষিদ্ধ করা খুবই কঠিন। আদালতকে প্রমাণ করতে হয়, দলটি সত্যিই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বংসের জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। শুধু অপছন্দ, ঘৃণা বা অতীতের অভিযোগ যথেষ্ট নয়। ভেনিস কমিশনের গাইডলাইনেও (গাইডলাইনস অন লেজিসলেশন অন পলিটিক্যাল পার্টিজ, ২০০০) একই কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ শক্ত প্রমাণ ও স্বাধীন আদালতের সিদ্ধান্ত ছাড়া দল নিষিদ্ধ করা যায় না।
স্পেন
স্পেনের অভিজ্ঞতা একটি ভিন্ন চিত্র দেখায়। বাস্ক অঞ্চলের দল ‘বাতাসুনা’ নিষিদ্ধ করা নিয়ে গবেষক আন্দ্রেউ আরেনাস ২০২১ সালে ‘পার্টি ব্যানস অ্যান্ড পলিটিক্যাল ভায়োলেন্স: এভিডেন্স ফ্রম বাতাসুনা’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি দেখান, দল নিষিদ্ধ করলে কখনো ‘ডিটারেন্স’ (প্রতিরোধমূলক ভীতি–প্রদর্শন) কাজ করলেও ‘ব্যাকল্যাশ’ (তীব্র পাল্টা–প্রতিক্রিয়া) তৈরি হতে পারে। তবে এ উদাহরণ সরাসরি প্রযোজ্য নয়, কারণ সেখানে ইটা (ইউস্কাদি তা আস্কাতাসুনা)-এর মতো সশস্ত্র সংগঠনের বিষয় ছিল। তাই এটিকে সাধারণ রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা ঠিক নয়।
মিসর
এরপর মিসরের অভিজ্ঞতা আরও বড় সতর্কতা দেয়। ২০১১ সালের পর গণতন্ত্রের সুযোগ থাকলেও তা ব্যর্থ হয় এবং মুসলিম ব্রাদারহুড নিষিদ্ধ করার পরও সংগঠনটি শেষ হয়নি; বরং ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ কার্যক্রম ও ‘ভিকটিমহুড ন্যারেটিভ’ বা সব সময় অন্যের অত্যাচারের শিকার হিসেবে নিজেকে তুলে ধরার বয়ান বেড়েছে। এতে সমাজে বিভাজন ও উত্তেজনা আরও বেড়ে যায় (সিএফআর, অ্যানালিসিস অন ইজিপ্ট, ২০১৪; ব্রুকিংস রিপোর্ট অন রিথিংকিং পলিটিক্যাল ইসলাম, ২০১৫)। অর্থাৎ নিষিদ্ধ করলেই সমস্যা শেষ হয় না; বরং নতুন রূপ নেয়।
- ট্যাগ:
- মতামত
- নিষিদ্ধ
- দলীয় কার্যক্রম
- আওয়ামী লীগ