যুদ্ধ, জ্বালানি, বাজার—ত্রিমুখী চাপ থেকে উত্তরণের উপায়
ইরানে আমেরিকা ও ইসরায়েলের আক্রমণ আপাতদৃষ্টিতে দূরের কোনো আন্তর্জাতিক ঘটনা মনে হলেও, বাংলাদেশের জন্য এটি এক গভীর সংকটের সংকেত। বৈশ্বিক বাণিজ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বাংলাদেশ আজ এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে হরমুজ প্রণালির সামান্য অস্থিরতাও আমাদের রান্নাঘর থেকে শুরু করে বড় শিল্পকারখানা পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি আমদানির ওপর অত্যধিক নির্ভরশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের টানাপোড়েন এবং প্রবাসী আয়ের অনিশ্চয়তা—এই ত্রিমুখী চাপ বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে এক আচানক বহিরাগত ধাক্কার সামনে দাঁড় করিয়েছে।
বাংলাদেশ সীমিতভাবে হলেও বৈশ্বিক বাণিজ্য ও রাজনৈতিক চক্রের অংশীজন। গ্লোবালাইজেশন বা বিশ্বায়নের পরিসরেই বাংলাদেশের অর্থনীতির একটা বড় অংশ যুক্ত। ইরান-আমেরিকা-ইসরায়েলের যুদ্ধ কিংবা এর ফলে সৃষ্ট ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা তাই বাংলাদেশের জন্য কোনো বিচ্ছিন্ন আন্তর্জাতিক ঘটনা নয়।
বাংলাদেশের অর্থনীতি জ্বালানি আমদানির ওপর দারুণভাবে নির্ভরশীল। বিশেষ করে তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানির ক্ষেত্রে, এমনকি বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ক্রমশ আমদানিনির্ভর ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বা সামরিক উত্তেজনা বাড়লে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা, সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ ও আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যস্তর দ্রুত অস্থিতিশীল হয়ে উঠলে তার প্রত্যক্ষ অভিঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় আকারে পড়তে পারে। এ পরিস্থিতিতে বড় ঝুঁকিগুলো হলো—জ্বালানি আমদানি ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমে ব্যয়-চাপের বিকাশ ও প্রসার।
এই ভূ-রাজনৈতিক সংকটের স্বল্পমেয়াদী, মধ্যমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে। সংকটের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়তে পারে জ্বালানি মূল্য ও অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতির ওপর। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও এলএনজির দাম বৃদ্ধি পেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন, শিল্প কার্যক্রম, সেচ ও সার উৎপাদন—এসব খাতে ব্যাপক ব্যয়বৃদ্ধি ঘটতে পারে। এর ফলে অর্থনীতিতে একটি শক্তিশালী ব্যয়-প্রণোদিত মূল্যস্ফীতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা খাদ্য, পরিবহন, নির্মাণসামগ্রী ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে দ্রুত নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এমনকি কৃষি খাত, যা অন্তত প্রথম দৃষ্টিতে বৈশ্বিক ধাক্কা থেকে তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত বলে মনে হতে পারে, সেটিও উৎপাদন উপকরণের উচ্চমূল্য এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল হওয়ার কারণে পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ অবস্থায় সরকারকে কঠিন নীতিগত সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হবে। জ্বালানি ভর্তুকি বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় সমন্বয়, অথবা উচ্চ মূল্যে জ্বালানি আমদানি করতে হতে পারে। বিশেষ করে বৈশ্বিক বাজারে এলএনজির স্পট মূল্য অতিমাত্রায় বেড়ে গেলে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি, লোডশেডিং এবং শিল্প উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটার ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যেতে পারে। স্বল্পমেয়াদে এসব সংকট আমাদের রাজনীতি ও সামাজিক জীবনকেও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
মধ্যমেয়াদে এই ভূ-রাজনৈতিক সংকট বাংলাদেশের উৎপাদন কাঠামো, রপ্তানি সক্ষমতা ও বৈদেশিক খাতে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। জ্বালানি ব্যয় ও আন্তর্জাতিক শিপিং খরচ বৃদ্ধি পেলে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, সিরামিক, ইস্পাত, সিমেন্ট ও রাসায়নিক শিল্পের মতো জ্বালানি-নির্ভর খাতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। একই সঙ্গে সামুদ্রিক বাণিজ্যপথে অনিশ্চয়তা, বীমা ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ চেইনে বিঘ্নের কারণে আমদানি ও রপ্তানি উভয় ক্ষেত্রেই বিলম্ব ও ব্যয়চাপ সৃষ্টি হবে। এতে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে যেসব রপ্তানিমুখী শিল্প বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে। অন্যদিকে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পেলে ডলারের চাহিদা বাড়বে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিনিময় হার এবং সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক প্রবাসী শ্রমিক সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমানসহ উপসাগরীয় অর্থনীতিতে কর্মরত। যুদ্ধের কারণে এসব দেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মন্থর হলে, অবকাঠামো বিনিয়োগ কমে গেলে কিংবা শ্রমবাজার সংকুচিত হলে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ দারুণভাবে কমে যেতে পারে। বৈদেশিক শ্রমবাজার সংকুচিত হবার আশঙ্কাকেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ফলে এ সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো বাংলাদেশের রেমিট্যান্স আয়ে নেতিবাচকতা সৃষ্টি ও শ্রমবাজারের ঝুঁকি। রেমিট্যান্স কেবল বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎস নয়; এটি গ্রামীণ অর্থনীতি, পারিবারিক ভোগব্যয়, আবাসন, শিক্ষা ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। রেমিট্যান্সে স্থবিরতা বা পতন অভ্যন্তরীণ চাহিদা দুর্বল করে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমিয়ে দেয়। ফলে এই ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা মধ্যমেয়াদে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিসহ অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে।