পুড়িয়ে দেওয়া এক ভবনের ‘আলো’ ও হিটলারের বই পোড়ানোর গল্প
সম্প্রতি প্রথম আলো অফিসের অগ্নিদগ্ধ ভবনে শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ‘আলো’ শুরু হয়েছে। ঢাকায় বিদেশি রাষ্ট্রদূতের প্রতিনিধি থেকে শুরু করে সমাজের নানা স্তরের মানুষ দেখছেন আগুনে পোড়ানো দগ্ধ সেই ভবনের ব্যতিক্রমধর্মী শৈল্পিক রূপ।
প্রথম ঘটনাটি ঘটে ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর। ওই দিন প্রথম আলো কার্যালয়ের সামনে ‘বাংলাদেশের জনগণ’ ব্যানারে গরু জবাই করার কর্মসূচি ও বিক্ষোভ সমাবেশ পালন করেন কিছু লোক।
সমাবেশে ‘বিক্ষোভকারীরা’ অভিযোগ করেন, ভারতীয় আগ্রাসন প্রতিরোধে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার–এর ‘তওবা করানোর’ জন্য এ ‘জিয়াফতের’ আয়োজন করা হয়েছে। পরে তারা কালো রঙের একটি গরু জবাই করেন।
সেই ঘটনাই শেষ নয়। গত বছর ১৮ ডিসেম্বর রাত পৌনে ১১টার দিকে একদল প্রতিহিংসাপরায়ণ উগ্রবাদী লোক প্রথম আলো কার্যালয়ে হামলা চালান। তাঁরা ব্যাপক তাণ্ডব করে প্রথম আলো কার্যালয়ের শাটার ও বড় বড় কাচের দরজা ভেঙে ফেলেন।
ভেতরে ঢুকে তাঁরা লুটপাট চালান। জিনিসপত্র ভাঙচুর করেন, প্রথমা প্রকাশনের বইপত্রে আগুন ধরিয়ে দেন। এরপর তাঁরা দ্য ডেইলি স্টার ভবনে হামলা করেন। তাঁরা ডেইলি স্টার ভবনেও ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন।
বাংলাদেশের দুই স্বনামধন্য পত্রিকাতে এই আগুন দেওয়ার ঘটনায় দেশ–বিদেশে সর্বত্র প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। এ ঘটনার খবর ইউরোপের বিভিন্ন মিডিয়াতে নিউজ ও ভিডিও আকারে গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়।
বইপত্র বা পত্রিকা অফিসে অগ্নিসংযোগ কোনো সভ্য দেশের রেওয়াজ নয়। যাঁরা একটি দেশ ও জাতিকে সভ্যতার আলো থেকে অন্ধকারে ঠেলে নিয়ে যেতে চান, এসব ঘটনা তাঁদেরই কারসাজি। এসব ঘটনার পেছনে রয়েছে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা।
পরিকল্পনাকারীরা অপেক্ষায় ছিলেন গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলার সময় ও ক্ষণের। দ্বিমত প্রকাশের মাধ্যম হতে হয় সৃজনশীল লেখনী, চিন্তা ও যুক্তির খণ্ডন দিয়ে। আগুন দিয়ে নয়।
বাংলাদেশের অগ্রগণ্য পত্রিকাতে আগুন দেওয়ার ঘটনার সঙ্গে জার্মানিতে হিটলারের নাৎসি দল বা জাতীয় সমাজতান্ত্রিক জার্মান শ্রমিক দল (এনএসডিএপি) সমর্থকদের বই পোড়ানোর ঘটনা এক করা যাবে না বটে, তবে এ ধরনের ঘটনার পেছনে থাকে একটি জাতির স্বকীয়তা, সংস্কৃতিকে পিছিয়ে দেওয়ার ঘৃণ্য অভিপ্রায়।
কিন্তু বার্লিনের সেই বই পোড়ানোর ঘটনার সঙ্গে বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে বই, পাঠাগার বা পত্রিকা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনার যোগসূত্র খোঁজার কারণই–বা কী!
জার্মানির স্বৈরশাসক অ্যাডলফ হিটলার ১৯৩৩ সালের ৩০ জানুয়ারি ক্ষমতায় আসার পাঁচ মাসের মাথায় বই পুড়িয়ে দেওয়ার তাণ্ডব শুরু করেছিলেন।
তবে সেই পরিকল্পনার ছক আঁটা হয়েছিল অনেক আগে বেশ সুচারুভাবে। আর বাংলাদেশে সাম্প্রতিক কালে পর্যায়ক্রমে দরগাহ, মাজারে হামলা; শিল্প, সাহিত্য, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও পত্রিকা অফিসে হামলা একটি গোষ্ঠীর দীর্ঘ পরিকল্পনার অংশ।
১৯৩৩ সালের মার্চ মাসে হিটলার ক্ষমতায় আসার পরপরই শুরু হয়েছিল বই পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা। আজ থেকে ৯২ বছর আগে ফ্যাসিজমের গুরু অ্যাডলফ হিটলার তাঁর ক্ষমতা পোক্ত করতে রাজধানী বার্লিনে বই পুড়িয়েছিলেন।
১৯৩৩ সালের ১০ মে বার্লিনে সাবেক অপেরা স্কয়ার বর্তমানে ব্যাবল স্কয়ারে হিটলারের ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট জার্মান স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন সদস্যরা হাজার হাজার বই পুড়িয়ে দেন। জার্মানির বিভিন্ন শহরের ১৮টি বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে বা শহরের কেন্দ্রে ঘটে একই ঘটনা।