‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হলে রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আসবে
বহুল প্রত্যাশিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণায় সারা দেশ মুখর করে তুলেছে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নির্বাচনি প্রচারণা চালাছে।
সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আশা করা হচ্ছে, নির্বাচন সুষ্ঠু, সুন্দর এবং ব্যাপক অংশগ্রহণমূলক হবে। এ নির্বাচন শুধু সরকার পরিবর্তনের গতানুগতিক নির্বাচন নয়, এর তাৎপর্য অনেক গভীরে প্রোথিত। কাজেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশ্নাতীতভাবে গ্রহণযোগ্য হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
বিগত স্বৈরাচারী শাসনামলে নির্বাচনব্যবস্থাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ক্ষমতাচ্যুত বিগত সরকার তিনটি বিতর্কিত সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে প্রমাণ করেছিল কীভাবে জনমতকে উপেক্ষা করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা যায়। ওইসব নির্বাচনকে বৈধতা দেওয়ার জন্য তদানীন্তন সরকার তাদের আজ্ঞাবহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলকে ব্যবহার করেছিল।
ইতঃপূর্বে বাংলাদেশে ১২টি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এবারই প্রথম অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধান স্বীকৃত সরকার নয়। এর আগে ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম, ১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত সপ্তম, ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত অষ্টম এবং ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
এর মধ্যে ১৯৯১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনও সংবিধান স্বীকৃত সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়নি। বাংলাদেশের সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এটি নিশ্চিতভাবেই প্রমাণিত হয়েছে যে, বাংলাদেশের মতো একটি রাজনৈতিক সংঘাতময় দেশে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
বিজ্ঞ আদালত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধান থেকে বাদ দেওয়ার রায় বাতিল করে দিয়ে তাদের পর্যবেক্ষণে বলেছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে পারে। পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। গণভোটের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ভবিষ্যতে যাতে কোনো স্বৈরাচারী সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হতে না পারে অথবা ক্ষমতাসীন হয়ে স্বৈরাচারী সরকারে পরিণত হতে না পারে, তা নিশ্চিত করা।
একইসঙ্গে বিদ্যমান রাজনৈতিক কালচারকে পরিবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি সত্যিকার উদার ও কল্যাণময় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করা। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো সংসদ নির্বাচনে জনসমর্থন অর্জনের লক্ষ্যে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালালেও গণভোটের বিষয়ে তারা অনেকটাই নিশ্চুপ। অথচ জাতির বৃহত্তম স্বার্থেই রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত জুলাই সনদের প্রতি জনসমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে প্রচারণা চালানো।
গণভোটে যদি জুলাই সনদের প্রতি জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন আদায় করা না যায়, তাহলে আগামীতে আবারও কোনো না কোনো প্রক্রিয়ায় আমাদের ওপর স্বৈরশাসন চেপে বসতে পারে। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক কালচার যুগোপযোগী নয়। তাই রাজনীতির প্রচলিত ধারার পরিবর্তন একান্ত প্রয়োজন। জনগণ যদি জুলাই সনদের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করে এবং রাজনৈতিক দলগুলো পরবর্তীকালে জুলাই সনদ মেনে চলে, তাহলে দেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন সাধিত হবে, এটি নিশ্চিত করে বলা যায়।
সাধারণ ভোটারদের মাঝে গণভোট নিয়ে সচেতনতার অভাব রয়েছে। একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট) তাদের এক জরিপে উল্লেখ করেছে, দেশের ভোটারদের মধ্যে মাত্র ৪০ শতাংশ জুলাই সনদ ও গণভোট সম্পর্কে ধারণা রাখে। সাধারণ ভোটারদের মধ্যে গণভোট নিয়ে খুব একটা উচ্ছ্বাসও লক্ষ করা যাচ্ছে না। তারা বরং সংসদ নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। কোনো কারণে গণভোটে ‘না’ বিজয়ী হলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনার আলোকে দেশের রাজনীতিকে ঢেলে সাজানোর প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাবে।
তাই রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের স্বার্থেই গণভোটে জুলাই সনদের পক্ষে জনসমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে আরও তৎপর হতে হবে। এর আগে দেশে বেশ কয়েকবার গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তিত হলেও রাজনৈতিক কালচারের কোনো গুণগত পরিবর্তন হয়নি। নতুন সরকার ক্ষমতাসীন হয়ে পুরোনো ধারায় দেশ চালানোর চেষ্টা করেছে। ফলে আন্দোলনের মাধ্যমে সৃষ্ট গণ-আকাঙ্ক্ষা বারবারই পদদলিত হয়েছে। এবার মানুষ আর হতাশ হতে চায় না। তারা যে কোনো মূল্যে রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন কামনা করছে।