নাম বদলালেই কি বদলে যাবে র‌্যাব?

বিডি নিউজ ২৪ পারভেজ আলম প্রকাশিত: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৩:৫২

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজপথে এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মঞ্চে আমাদের লড়াইটা ছিল অসম যুদ্ধের মতো। আমরা যখনই গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা টর্চার সেলের ভয়াবহতা নিয়ে কথা বলেছি, তখনই আমাদের কপালে জুটেছে ‘দেশবিরোধী’ তকমা। আমাদের আন্দোলন ছিল একটি নির্দিষ্ট বাহিনীর দানবীয় হয়ে ওঠার বিরুদ্ধে, যারা আইনি কাঠামোর ভেতরে থেকেও আইনের ঊর্ধ্বে নিজেদের স্থান করে নিয়েছিল।


২০২৪ সালের জুলাইয়ের সেই রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থান যখন স্বৈরাচারের পতন ঘটাল, তখন আমরা যারা বছরের পর বছর ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছি, তাদের মনে এক চিলতে আশার আলো জেগেছিল। আমরা ভেবেছিলাম, এবার হয়তো সেই অন্ধকার অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটবে এবং যে বাহিনীটি রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের প্রতীকে পরিণত হয়েছিল, তাকে চিরতরে বিলুপ্ত করা হবে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে যখন র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) নামের ওই বাহিনীকে বিলুপ্ত না করে কেবল নাম এবং ইউনিফর্ম পরিবর্তনের প্রস্তাব আসে, তখন সেই আশা চরম হতাশায় রূপ নেয়। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে ঝরা শত শত প্রাণের বিনিময়ে আমরা কি শুধু একটি নামের পরিবর্তন চেয়েছিলাম? কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন রাখলেই তো সে চক্ষুষ্মান হয় না।


র‍্যাবের ইতিহাস মূলত বিচারহীনতার জলজ্যান্ত দলিল। ২০০৪ সালে যখন এই বিশেষ বাহিনী গঠিত হয়, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের স্বস্তি ছিল যে তারা অপরাধ দমন করবে। কিন্ত অতি দ্রুতই এই বাহিনী একটি ‘ডেথ স্কোয়াড’ বা ঘাতক বাহিনীতে পরিণত হয়, যার প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে তথাকথিত ‘ক্রসফায়ার’।


হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২০১১ সালে তাদের ‘ক্রসফায়ার’ প্রতিবেদনে দেখিয়েছিল যে, ২০০৯ থেকে ২০১১ সালের মধ্যেই প্রায় ২০০ মানুষ এই বাহিনীর হাতে প্রাণ হারিয়েছে। সেই প্রতিবেদনে স্পষ্ট হয়েছিল যে, র‍্যাব একটি পরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় নীতি অনুযায়ী সাধারণ নাগরিকদের তুলে নিয়ে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করছে এবং পরবর্তীতে সেটিকে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ হিসেবে চালিয়ে দিচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে এই বাহিনীর ভেতরের সামরিক সংস্কৃতি এবং জবাবদিহিতার অভাব একে একটি সমান্তরাল বিচার ব্যবস্থায় পরিণত করেছে।


বছরের পর বছর ধরে রাসেল আহমেদ ভুট্টো বা কায়সার মাহমুদ বাপ্পির মতো অসংখ্য মানুষের খুনের সাক্ষী হয়েছে এই দেশ। ভুট্টোর কথা মনে পড়লে এখনো শিউরে উঠতে হয়; যাকে সাদা পোশাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার এক সপ্তাহ পর তার নিজের পাড়াতেই এনে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। র‍্যাব দাবি করেছিল সেটি ছিল বিশেষ অভিযান, অথচ প্রত্যক্ষদর্শীরা দেখেছিল তাকে মাইক্রোবাসে করে এনে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। আবার বাপ্পির ক্ষেত্রে দেখা গেছে, এটি ছিল স্রেফ ‘ভুল পরিচয়ে’ এক নিরপরাধ তরুণকে হত্যা করা। এমনকি সরকারি তদন্ত কমিটিও বাপ্পির হত্যাকাণ্ডে র‍্যাবের ভুল স্বীকার করে দোষীদের শাস্তির সুপারিশ করেছিল, কিন্তু সেই প্রতিবেদন আর আলোর মুখ দেখেনি। এই ধরনের হাজারো ঘটনার মধ্য দিয়ে র‍্যাব একটি ফ্রাঙ্কেনস্টাইনে পরিণত হয়েছে, যাকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা কোনো সরকারই দেখায়নি।


আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এবং জাতিসংঘ দীর্ঘদিন ধরেই র‍্যাবের এই ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন র‍্যাব এবং এর সাতজন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তখন বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে এই বাহিনীর ভাবমূর্তি ধূলিসাৎ হয়ে যায়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ অন্তত ১২টি আন্তর্জাতিক সংস্থা জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা মিশন থেকে র‍্যাব সদস্যদের বহিষ্কারের দাবি জানিয়ে আসছিল। তাদের প্রধান যুক্তি ছিল, যারা নিজের দেশের মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করে এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকে, তারা বিদেশের মাটিতে শান্তি রক্ষা করতে পারে না। জাতিসংঘ হিউম্যান রাইটস এক্সপার্টরা বারবার এই বাহিনীর সদস্যদের ব্যাকগ্রাউন্ড স্ক্রিনিং বা যাচাই-বাছাইয়ের কথা বললেও বিগত সরকার তা বারবার উপেক্ষা করেছে।


জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনারের কার্যালয় জুলাই-অগাস্টের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী একটি প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে র‍্যাব বিলুপ্ত করার সুপারিশ করেছে। সেই রিপোর্টে বলা হয়েছে, র‍্যাবের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইতিহাস এতটাই গভীর যে এই প্রতিষ্ঠানটি আর সংস্কারের যোগ্য নয়। তারা পরামর্শ দিয়েছিল যে, এই বাহিনীকে বিলুপ্ত করে এর সদস্যদের যারা কোনো অপরাধে জড়িত নয়, তাদের নিজ নিজ মূল বাহিনীতে ফিরিয়ে নিতে হবে। আন্তর্জাতিক মঞ্চের এই স্পষ্ট বার্তা থাকা সত্ত্বেও আজ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভিন্ন সুর শোনা যাচ্ছে।


জুলাইয়ের সেই উত্তাল দিনগুলোতে যারা রাজপথে দাঁড়িয়ে স্লোগান দিয়েছিলো, তখন তাদের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান। অন্তর্বর্তী সরকার যখন দায়িত্ব নিল, প্রধান উপদেষ্টার বক্তৃতায় আমরা ‘নতুন বাংলাদেশের’ স্বপ্ন দেখেছিলাম যেখানে প্রতিটি জীবনের মূল্য থাকবে। নাগরিক কল্যাণ নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো স্পষ্ট ভাষায় বলেছে যে, এই বাহিনীর সংস্কার সম্ভব নয়, একে কেবল বিলুপ্তই করতে হবে কারণ এটি একটি সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্রের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে।


কিন্তু স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর বক্তব্য সেই আশাভঙ্গের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, র‍্যাবকে বিলুপ্ত না করে বরং এর নাম ও ইউনিফর্ম পরিবর্তন করে একটি নতুন বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব বিবেচনা করা হচ্ছে, যার নাম হতে পারে ‘স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স’ (এসআইএফ)। এই প্রস্তাব নাকি ইতোমধ্যে প্রধান উপদেষ্টার অনুমোদন পেয়েছে।


প্রশ্ন জাগে, ইউনিফর্মের রং আর নাম বদলালেই র‌্যাব বদলে যাবে? বদলে যাবে বাহিনীর ভেতরে গড়ে ওঠা সেই নিপীড়ক মানসিকতা? যখন একটি প্রতিষ্ঠান পদ্ধতিগতভাবে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, তখন তার খোলস পাল্টানো কোনো সমাধান নয়; এ কেবল অপরাধীদের নতুন পরিচয়ে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা দেওয়ার একটি কৌশল মাত্র।


র‍্যাব কেন সংস্কারযোগ্য নয়, তার একটি বড় কারণ হলো এর গঠনতন্ত্র। এটি সেনাবাহিনী এবং পুলিশের একটি সংকর বাহিনী, যেখানে সামরিক কর্মকর্তাদের প্রাধান্য থাকে। সেনা সদস্যদের প্রশিক্ষণ এবং পুলিশের প্রশিক্ষণ এক নয়। বেসামরিক আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় সামরিক সংস্কৃতি প্রয়োগের ফলেই ক্রসফায়ারের মতো শব্দগুলো আমাদের আইনি অভিধানে ঢুকে পড়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বারবার বলেছে, যে কোনো নতুন বাহিনী গঠন করা হলে তা হতে হবে সম্পূর্ণ বেসামরিক এবং এর সদস্যদের কোনোভাবেই সামরিক বাহিনী থেকে আনা যাবে না। অথচ সরকার যে পুনর্গঠনের কথা বলছে, সেখানে এই মৌলিক পরিবর্তনের কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা আমরা এখনো দেখতে পাচ্ছি না।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

এই সম্পর্কিত

আরও