গ্যাস সংকট প্রবল হলো কেন?
গ্যাস আমাদের দেশের জ্বালানি সম্পদ। লক্ষ-কোটি বছর আগের উদ্ভিজ্জ উচ্চ চাপ ও তাপে রাসায়নিকভাবে বিয়োজিত হয়ে মিথেন গ্যাস উৎপাদন করেছে। এই গ্যাস ভূগর্ভে সঞ্চিত ছিল। আমরা সেসব ভূ-সঞ্চিত সম্পদ টেনে তোলার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছি। আমাদের শক্তির চাহিদা মেটাতে এদের ব্যবহার করেছি।
গ্যাস একইসাথে একটি জীবাশ্ম জ্বালানি এবং পরিচ্ছন্ন উৎস। ‘ক্লিন’ বা পরিচ্ছন্ন কেননা এদের দহনে যদিও কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসৃত হয়, তবু তেল বা কয়লার তুলনায় এই নিঃসরণ অনেক অনেক কম। কয়লার নিঃসরণের তুলনায় গ্যাসের নিঃসরণ ৫০ বা ৬০-শতাংশ কম।
সেজন্য গ্যাস এখন বৈশ্বিকভাবে জ্বালানি পছন্দের এক নম্বরে অবস্থান করছে। গৃহস্থালি বলুন, শিল্পকারখানা বলুন, যানবাহন বা বিদ্যুৎ উৎপাদন বলুন—এইসব প্রয়োজনীয় খাতগুলোতেই এখন প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যাপক চাহিদা আছে, দেশে এবং বিদেশে।
এমন এক সময় ছিল, আমাদের স্মৃতিতে আছে, আমরা শুনেছি দেশ তো গ্যাসে ভাসছে। কিন্তু সেই সুদিন আর নেই। দেশের প্রাকৃতিক গ্যাসসম্পদ কমে আসছে। কোনো সঞ্চিত সম্পদই চিরকালীন নয়। গ্যাসও নয়। ব্যবহারের পরিচিত নিয়মেই তা কমে আসছে।
আমেরিকান ভূতাত্ত্বিক কিং হুবার্ট (১৯০৩-১৯৮৯) একটা তাত্ত্বিক মডেল দিয়ে বলেছিলেন, গ্যাস বা তেলের মতো প্রাকৃতিক সম্পদের উৎপাদনের একটা চূড়া ও ক্রমান্বয়িক পতন আছে। আমেরিকার তেলের উৎপাদন ১৯৭০-এর দশকে কমে যেতে থাকায় তিনি বিখ্যাত হয়ে উঠলেন। পরে অবশ্য তেলের অন্য উৎস আবিষ্কৃত হয়েছে।
আমাদের অনেকের মত হলো বাংলাদেশের গ্যাস উৎপাদনের জন্য হুবার্টের এই পিক বা চূড়া আমরা পেরিয়ে এসেছি। গণমাধ্যমের সূত্রমতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ব্যবহৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের মধ্যে দেশীয় গ্যাস উত্তোলনকারী তিন কোম্পানির মাধ্যমে ৭ হাজার ৮৬২ মিলিয়ন ঘনমিটার এবং বহুজাতিক কোম্পানি শেভরন ও তাল্লো মিলে ১১ হাজার ৭৩৮ মিলিয়ন ঘনমিটার পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ দিয়েছে। বাকি গ্যাস সরবরাহ (৫৮ লাখ ৮ হাজার মেট্রিক টন) এসেছে আমদানিকৃত তরলীকৃত গ্যাস বা এলএনজি থেকে (১৪ জানুয়ারি ২০২৬)।
অধ্যাপক ম তামিম লিখেছেন, “বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রায় ৫০ শতাংশ গ্যাস আসে, সেখানেও উৎপাদন কমে যাচ্ছে। যেকোনো সময় ২০০ থেকে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট উৎপাদন কমে গেলে আমাদের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন এক ধরনের বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।” [কালের কণ্ঠ, ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫]
একটি সাধারণ দিনের গ্যাসের উত্তোলন, সঞ্চালন ও বিতরণের হিসাব দেখা যাক। জাগো নিউজের সূত্র বলছে, ৯ জানুয়ারি পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশি ও বহুজাতিক পাঁচটি কোম্পানির ২৩টি গ্যাসক্ষেত্র থেকে উত্তোলিত ১,৭৫৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়েছে। পাশাপাশি আমদানিকৃত এলএনজি থেকে ৮৭৯ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে দিয়েছে ‘রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি’ (আরপিজিসিএল)।
একই দিনে সারাদেশে পেট্রোবাংলার ছয় বিতরণ কোম্পানির মাধ্যমে ২,৪৩৯ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ব্যবহার হয়। এর মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৬৫৫ মিলিয়ন ঘনফুট, সার কারখানায় ২৩৯ মিলিয়ন ঘনফুট এবং গৃহস্থালি, শিল্প, বাণিজ্যিক, চা-বাগান গ্রাহকদের সরবরাহ করা হয় ১,৫৪৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হয়। অর্থাৎ বিদ্যুৎ খাত পেয়েছে মাত্র ২৭ শতাংশ গ্যাস।
- ট্যাগ:
- মতামত
- গ্যাস সংকট