জলবায়ু পরিবর্তন : আর্থ-সামাজিক প্রভাবের পাশাপাশি মনস্তাত্ত্বিক ও ভাষাগত দিক বিবেচনায় নিতে হবে
ব্রিটিশ ভূগোলবিদ অ্যান্ড্রু হারবার্টসন আবহাওয়া ও জলবায়ুর মধ্যে পার্থক্য করতে গিয়ে বলেছেন, ‘জলবায়ু হলো যা আমরা প্রত্যাশা করি, আর আবহাওয়া হলো যা আমরা বাস্তবে পাই।’ বস্তুত আবহাওয়া বলতে বায়ুমণ্ডলের স্বল্পমেয়াদি ও প্রাত্যহিক অবস্থাকে বোঝায়; অন্যদিকে জলবায়ু হলো কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি ও পূর্বাভাসযোগ্য আবহাওয়ার ধরন, যা কয়েক দশকের গড় হিসাবের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়।
আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক বিষয়গুলোর পাশাপাশি ভাষা, আর্থ-সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
‘আমেরিকান অ্যানথ্রোপলজিক্যাল জার্নাল’-এ (২০০০) প্রকাশিত বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে তুলনামূলক এক গবেষণায় দেখা গেছে যে আমাদের কথা বলার ধরন নির্ভর করে আমরা কতটা সময় বাইরে অতিবাহিত করি, তার ওপর। বাইরে কাটানো সময় এবং ভাষার ব্যবহারের এই পার্থক্যের সঙ্গে আবহাওয়ার সম্পর্ক রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ উত্তর মেরু অঞ্চলের আবহাওয়ায় বাইরে বসে কথা বলাটা স্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়; অথচ আফ্রিকার ক্ষেত্রে দেখা যায়, মানুষ রোদে কোনো গাছের ছায়ায় বা ছাউনির নিচে বেঞ্চে বসে কথা বলছে।
এ কারণেই দক্ষিণাঞ্চলীয় ভাষাগুলোতে ব্যঞ্জনবর্ণ ও স্বরবর্ণের সমন্বয়ে গঠিত শব্দাংশ বেশি দেখা যায়। কারণ এগুলোর উচ্চারণ শক্তিশালী হয় এবং অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যা বাইরে কাজ করার সময় প্রয়োজন হয়। পক্ষান্তরে উত্তর মেরু তথা ভাইকিংদের ভাষায় ব্যঞ্জনবর্ণ-স্বরবর্ণ-ব্যঞ্জনবর্ণ বিন্যাসের শব্দাংশ বেশি দেখা যায়, যা উচ্চারণ করতে তুলনামূলক কম শক্তির প্রয়োজন হয়।
আবহাওয়া অন্যান্য উপায়েও ভাষাকে প্রভাবিত করে। যেসব জায়গায় আর্দ্রতার মাত্রা বেশি, সেখানকার ভাষায় স্বরবর্ণের অনুপাত বেশি থাকে, ঠিক যেমন চীনা ভাষার মতো সুরপ্রধান ভাষা আর্দ্র জলবায়ুতে উদ্ভূত হয়। এটাও লক্ষ করা যায় যে, যেখানে ঘন গাছপালা আচ্ছাদিত এলাকা রয়েছে সেখানে আরো জোরালো স্বরবর্ণ শোনা যায়, যার অর্থ উচ্চ ধ্বনিগত শক্তি এবং তীব্রতা। কারণ সেগুলোকে ঘন গাছপালার মধ্য দিয়ে নিজেদের পথ করে নিতে সংগ্রাম করতে হয়।
‘ইভল্যুশনারি হিউম্যান সায়েন্সেস’ (২০২৪) জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে যে জলবায়ু ও আবহাওয়া ভাষার বিবর্তনকে প্রভাবিত করে, কিন্তু এর প্রভাব শুধু এটুকুই নয়। জলবায়ু মানুষের বিশ্বাসের বিবর্তনকেও চালিত করে, যাকে বলা হয় ‘ভাষিক আপেক্ষিকতাবাদ’ নীতি।
এই নীতি অনুযায়ী একটি ভাষার গঠন নির্ধারণ করে তার বক্তারা বিশ্বকে কিভাবে উপলব্ধি করে এবং চিন্তা করে তার ওপর। এর অর্থ হলো, ভাষা বিশ্বদৃষ্টিকে প্রভাবিত করে। চরম আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে, ভাষাবিদ এবং বিজ্ঞানীরা যুক্তি দেন যে পরিভাষাকে নিষ্ক্রিয় বা বিমূর্ত ধারণা থেকে সক্রিয়, মানবকেন্দ্রিক ভাষায় পরিবর্তন করা গেলে তা জনসম্পৃক্ততা এবং জলবায়ু কার্যক্রমকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে তুলতে পারে।
জলবায়ু ও আবহাওয়া সম্পর্কিত আরেকটি দিক হলো, কোনো দেশ যত বেশি উষ্ণ ও আর্দ্র হয়, তাকে তত বেশি রোগজীবাণুর মোকাবেলা করতে হয় এবং তার মধ্যে সামাজিকভাবে রক্ষণশীল বলে মনে হওয়া মূল্যবোধগুলো গ্রহণ করার সম্ভাবনাও তত বেশি থাকে। পার্সোনালিটি অ্যান্ড সোশ্যাল সাইকোলজি বুলেটিন (২০১৭)-এ প্রকাশিত গবেষণা থেকে জানা যায় যে উচ্চ মাত্রার রোগজীবাণুযুক্ত পরিবেশ কঠোর নিয়ম-কানুনকে উৎসাহিত করে, যাতে কেউ অপ্রত্যাশিত কিছু না করে। তারা সাধারণত সমষ্টিবাদী হয়—ব্যক্তির চেয়ে সম্প্রদায়কে বেশি প্রাধান্য দেয়। কারণ উচ্চ সংক্রমণের বিশ্বে একজন ব্যক্তির সিদ্ধান্ত পুরো গোষ্ঠীর ওপর বিধ্বংসী প্রভাব ফেলতে পারে। একই কারণে এ ধরনের পরিবেশ ভিন্ন চেহারার মানুষের প্রতি অধিক পক্ষপাতিত্ব এবং নতুনত্বের প্রতি ভীতি তৈরি হওয়ার পূর্বাভাস দেয়।
জীবাণু এবং চরম আবহাওয়া ছাড়া জলবায়ুর পরিবর্তনশীলতা আমাদের বিশ্বাসের ওপর প্রভাব ফেলে। চরম জলবায়ু অনমনীয় বিশ্বাস ও আচরণ প্রদর্শন করতে পারে, কিন্তু অত্যন্ত পরিবর্তনশীল জলবায়ু এর বিপরীত ফল দেয়। হার্ভার্ডে নান ও জুলিয়ানো (২০০৯) দ্বারা পরিচালিত গবেষণা থেকে জানা যায় যে যেসব স্থানে আবহাওয়ার পরিবর্তন বেশি, সেখানকার মানুষ পরিবর্তনের প্রতি বেশি উন্মুক্ত এবং ঐতিহ্যের প্রতি কম আসক্ত হয়। এর অর্থ হলো, পরিবর্তনশীল জলবায়ু আমাদের মনোভাবের মধ্যে নমনীয়তা নিয়ে আসে, কিন্তু অত্যন্ত গরম ও আর্দ্র জলবায়ু মানুষকে আরো অন্তর্মুখী করে তোলে।
চরম আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য আমরা বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক, ভাষাগত এবং আর্থ-সামাজিক বিষয় বিবেচনা করলেও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা আমাদের মনে রাখতে হবে। এর কিছু কঠিন এবং কিছু নমনীয় সীমাবদ্ধতা থাকবে। উদাহরণস্বরূপ একটি কঠিন ভৌত সীমাবদ্ধতা হলো, যেখানে ভূমি সমুদ্রে বিলীন হয়ে যায়। নমনীয় সীমাবদ্ধতা হলো, জনগণ বা সরকার কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে পারে অথবা মানুষ কোন ধরনের অসুবিধা মেনে নিয়ে জীবনযাপন করতে ইচ্ছুক। নিচু ভূমিকে উঁচু করা গেলে অনেক উপকূলীয় অঞ্চলে মানুষ বসবাস করতে পারে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অভ্যন্তরীণ স্থানের সুবিধা থাকলে মানুষ প্রচণ্ড গরমের এলাকায়ও বসবাস করতে পারে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকি