সভ্যতার দ্বিমুখী যাত্রা
মানব ইতিহাস মূলত অনুসন্ধানের ইতিহাস। সুদূর অতীত থেকে আজকে পর্যন্ত এই অনুসন্ধান আকাঙ্ক্ষা মহাকাশ গবেষণার স্বর্ণযুগে পৌঁছে দিয়েছে। আমরা প্রতিনিয়ত প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি দেখছি; স্মার্টফোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের মতো বিস্ময়কর আবিষ্কার মানবসভ্যতার প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বকে প্রমাণ করে। তবে এই বাহ্যিক উন্নতির বিপরীতে দাঁড়িয়ে আজ আমাদের সমাজকাঠামোর দিকে তাকালে এক গভীর বৈপরীত্য দৃশ্যমান হয়।
একদিকে আমাদের প্রযুক্তির রকেট গতি, অন্যদিকে সামাজিক ও মানবিক সম্পর্কগুলোতে তৈরি হচ্ছে চরম ভারসাম্যহীনতা। বিজ্ঞানকে আমরা যন্ত্র বা প্রযুক্তির উপযোগিতা হিসেবে গ্রহণ করেছি ঠিকই, কিন্তু বিজ্ঞানের মূল দর্শন—যে দর্শন মানুষকে উদার, মানবিক ও সৃষ্টিজগতের সঙ্গে আত্মিকভাবে যুক্ত হতে শেখায়—তাকে অনুধাবন করতে কোথাও যেন ব্যর্থ হচ্ছি। সম্প্রতি আবিষ্কৃত মহাকাশের এক নতুন ঠিকানা ‘এলএইচএস ১১৪০ বি’ এবং আমাদের বর্তমান সামাজিক বাস্তবতা এই দ্বিমুখী যাত্রার এক তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা বহন করে।
পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্ব নিয়ে মানবজাতির কৌতূহল অনেক দিনের। এই দীর্ঘদিনের প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীরা রাতের পর রাত মহাকাশের অসীমে চোখ রেখে চলেছেন। সম্প্রতি এমনই এক যুগান্তকারী আবিষ্কার আমাদের দীর্ঘদিনের সেই কল্পনাকে বাস্তবের অনেকটাই কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক সম্প্রতি ‘এলএইচএস ১১৪০ বি’ নামের একটি বিশেষ ভিনগ্রহ কিংবা এক্সোপ্ল্যানেট শনাক্ত করেছেন, যা পৃথিবী থেকে প্রায় ৪৯ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় এটি সুপার-আর্থ। অর্থাৎ, এটি বৃহস্পতি বা শনির মতো কোনো গ্যাসীয় দানব নয়, বরং পৃথিবীর মতোই একটি কঠিন পাথুরে গ্রহ—তবে আকারে ও ভরে পৃথিবীর চেয়ে বেশ বড়।
এর ভর পৃথিবীর চেয়ে প্রায় ৫ দশমিক ৬ গুণ এবং ব্যাস প্রায় ১ দশমিক ৭ গুণ। তবে সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, এটি তার কেন্দ্রীয় লাল বামন অথবা রেড ডয়ার্ফ তারাটিকে প্রদক্ষিণ করছে। ঠিক সেই তারার বাসযোগ্য অঞ্চলে অবস্থান করছে, যেখানে অতিরিক্ত গরম বা অতিরিক্ত ঠান্ডার বদলে তরল পানি টিকে থাকার মতো অনুকূল পরিবেশ থাকে।
গবেষকেরা নিশ্চিত হয়েছেন, ‘এলএইচএস ১১৪০ বি’-এর চারপাশে একটি সুনির্দিষ্ট বায়ুমণ্ডল বিদ্যমান। বিশেষ করে, সেখানে হিলিয়াম গ্যাসের উপস্থিতি শনাক্ত করা গেছে। কোটি কোটি বছর ধরে কোনো গ্রহ তার বায়ুমণ্ডল ধরে রাখতে পারার বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একটি স্থায়ী বায়ুমণ্ডল থাকা মানেই সেখানকার তাপমাত্রা উপযুক্ত, অর্থাৎ বায়ুমণ্ডল গ্রহের সার্বিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে গ্রিনহাউস প্রভাবের মতো কাজ করে। ক্ষতিকর বিকিরণ রোধ মানে মহাজাগতিক তেজস্ক্রিয় রশ্মি ও কণার তীব্র আঘাত থেকে গ্রহের পৃষ্ঠকে সুরক্ষা দেয়। তরল পানির স্থায়িত্ব মানে বায়ুমণ্ডলীয় চাপের কারণে গ্রহের পৃষ্ঠে পানি বাষ্প হয়ে উড়ে না গিয়ে তরল অবস্থায় জমা থাকতে পারে। যদিও এ পর্যন্ত হাজার হাজার এক্সোপ্ল্যানেট আবিষ্কৃত হয়েছে, কিন্তু কোনো পাথুরে গ্রহের বাসযোগ্য অঞ্চলে বায়ুমণ্ডলের এমন সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়ার ঘটনা এই প্রথম। এটি প্রমাণ করে, আমাদের পৃথিবীর মতো উপযোগী পরিবেশ হয়তো মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির অন্য কোনো কোণেও গড়ে উঠতে পারে।
তবে বাস্তবতার চিত্রটি এতটাও সহজ বা সরল নয়। লাল বামন তারাগুলো প্রায়ই অত্যন্ত বিধ্বংসী সৌরশিখা বা ফ্লেয়ার নির্গত করে, যা অনবরত আঘাত হেনে পাশের গ্রহের বায়ুমণ্ডলকে ক্ষয় করে দিতে পারে। তা ছাড়া এখন পর্যন্ত শুধু হিলিয়ামের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। প্রাণের বেঁচে থাকার জন্য যেসব মৌলিক উপাদান প্রয়োজন; যেমন অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, জলীয় বাষ্প বা মিথেন—তা সেখানে আছে কি না, তা জানতে আরও দীর্ঘ গবেষণার প্রয়োজন।
মহাকাশে প্রেরিত অত্যাধুনিক জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ ইতিমধ্যে ‘এলএইচএস ১১৪০ বি’-এর মতো গ্রহগুলোর বায়ুমণ্ডল বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা শুরু করেছে। খুব নিকট ভবিষ্যতেই হয়তো স্পেকট্রোস্কোপি প্রযুক্তির মাধ্যমে এই গ্রহের বায়ুমণ্ডলে পানির কণা বা অক্সিজেনের সন্ধান পাওয়া সম্ভব হবে। এখন প্রশ্ন হলো, ‘এলএইচএস ১১৪০ বি’-এর মতো আবিষ্কার যখন অসংখ্য সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে, তখন আমাদের ঘরের ভেতরের পৃথিবীটা কেমন আছে?
আজ প্রযুক্তির কল্যাণে ৪৯ আলোকবর্ষ দূরত্বের গ্রহের বায়ুমণ্ডল আমরা পরিমাপ করতে পারছি, অথচ পাশাপাশি ঘরে থাকা নিকটজনের মনের দূরত্ব পরিমাপ করতে পারছি না। ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থা আমাদের বিশ্বজুড়ে যুক্ত করেছে, কিন্তু একক পরিবার ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক মানসিকতার দরুন সামাজিক বন্ধনগুলো ঢিলে হয়ে যাচ্ছে। মানুষ ভার্চুয়াল জগতে হাজারও ‘ফ্রেন্ড’ বা ‘ফলোয়ার’ পেলেও বাস্তব জীবনে নিঃসঙ্গতায় ভুগছে। প্রযুক্তি আমাদের কাজের গতি বাড়িয়েছে, কিন্তু সহমর্মিতা, ধৈর্য এবং গভীর সামাজিক সম্পর্কের সুতাকে করে তুলেছে ভঙ্গুর। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে আমরা বস্তুগত সুবিধা লাভ করছি ঠিকই, কিন্তু এর ফলে মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিকভাবে এক ধরনের চরম বৈষম্য ও বিচ্ছিন্নতা তৈরি হচ্ছে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- তথ্য-প্রযুক্তির বিকাশ