সাফল্যের পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতাও কম নয়
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর ৮ আগস্ট ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়। এরই মধ্যে ঘোষিত নির্বাচন তফসিল অনুসারে ১২ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে অন্তর্বর্তী সরকারের পদত্যাগ করার কথা রয়েছে। নির্বাচন যদি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ হয় তাহলে সেটাই অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে ঐতিহাসিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হবে। একই দিনে প্রস্তাবিত বিবিধ সাংবিধানিক সংস্কার ও নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার সংক্রান্ত ‘জুলাই সনদ’ জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য কিনা সেটা নির্ধারণের জন্য হ্যাঁ/না গণভোট অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে। ওই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলে পরবর্তী নির্বাচিত সংসদে ওই প্রস্তাবগুলো গ্রহণের বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি হবে। এ দুটো পদক্ষেপই অন্তর্বর্তী সরকারের ঐতিহাসিক মিশন, যার ফলে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে ভবিষ্যতে স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আশঙ্কা অনেকখানি দূর হয়ে যাওয়ার কথা। তবুও বলতে হবে, এ দুটো পদক্ষেপ বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের আন্তরিকতা সম্পর্কে জনমনে দৃঢ় বিশ্বাস সৃষ্টি হলেও এবং দেশের প্রধান কয়েকটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় পার্টি আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না দেয়ায় নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ থেকেই যাবে।
অন্তর্বর্তী সরকার এ ইস্যুকে যথাযথভাবে মীমাংসা করতে পারেনি প্রধানত গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছাত্রছাত্রীদের চরম বিরোধিতার কারণে। একই সঙ্গে এ ইস্যুতে জামায়াতে ইসলামীর বিরোধিতা প্রধান প্রতিবন্ধক হিসেবে বিরাজমান। এদিকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব যেকোনো মূল্যে নিজের কাছে ধরে রাখতে পতিত স্বৈরশাসক শেখ হাসিনাও মরিয়া তৎপরতা অব্যাহত রাখায় তার বিরুদ্ধে গিয়ে অন্য কোনো নেতানেত্রী আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের দায়িত্ব নিতে সাহস পাননি। সেজন্য বিষয়টি অমীমাংসিত রয়েই গেল।
এ দুটো বিষয় ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য বিবেচিত হবে সরকারের নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ থেকে বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করার জন্য অধ্যাদেশ প্রণয়ন। এ ব্যাপারে সদ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমদের ঐতিহাসিক অবদান জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। অ্যাটর্নি জেনারেল ঠিকই বলেছেন, তিনি ছিলেন এ ব্যাপারে গ্রিক পুরাণের ‘প্রমিথিউসের’ মতো দৃঢ়চেতা ও লক্ষ্য পূরণে একাগ্র। অবসর গ্রহণের মাত্র কয়েক দিন আগে তিনি বিচার বিভাগের জন্য আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠার কাজটি সম্পন্ন করে বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতার রক্ষাকবচটি প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। এর আগে বিচারকদের নিয়োগ, পদোন্নতি, চাকরি পরিবর্তন ও ট্রান্সফারের পুরো ক্ষমতা তিনি নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করার ব্যবস্থা করে গেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশের ৫৪ বছরে কোনো সরকারই এ সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাটি বাস্তবায়ন করে যায়নি। ভবিষ্যতেও যাতে কোনো সরকার আমলাতন্ত্রের ফাঁদে পড়ে আবার বিচার বিভাগকে কুক্ষিগত করার অপতৎপরতা চালাতে না পারে সে ব্যাপারে জাতিকে সদাজাগ্রত থাকতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের এ ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের জন্য ড. ইউনূস ও তার উপদেষ্টা পর্ষদ সাধুবাদ পেতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আরেকটি বড় সাফল্য হতে পারত পুলিশ কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত। কিন্তু ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা হলো, প্রস্তাবিত পুলিশ কমিশনে আমলাতন্ত্র ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সরকারের কর্তাব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণের নানা ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করে ওটাকে অনেকখানি ক্ষমতাহীন করার অপতৎপরতা চালানো হয়েছে। অতএব, আগামী দেড় মাসের মধ্যে এ প্রস্তাবিত পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশটিকে পুনরায় ঝালাই করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য। স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা দেশের পুলিশ বাহিনীকে তার আজ্ঞাবহ লাঠিয়াল বাহিনীতে রূপান্তরিত করেছিল। তার সরকারের পতন ঠেকানোর জন্য পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালিয়ে প্রায় দেড় হাজার মানুষকে হত্যা করেছে এবং প্রায় কুড়ি হাজার মানুষকে আহত, পঙ্গু ও অন্ধ করে ফেলেছে। (শেষের দিকে পুলিশ বাহিনীকে বলা হতো ‘গোপালী বাহিনী’)। এহেন হত্যাযজ্ঞ এ দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কলঙ্কজনক অধ্যায় রচনা করে ফেলেছে। উপরন্তু পুলিশ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে প্রায় ৯৫ শতাংশ ঘুসখোর ও দুর্নীতিবাজ বলে বদনাম দৃঢ়মূল হয়ে রয়েছে জনমনে। ব্যাপারটির কোনো সুরাহার রাস্তা দেখাতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার, যা তাদের একটি বড়সড় ব্যর্থতা।
অন্তর্বর্তী সরকারের আরেকটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হয়েছে প্রায় দেউলিয়াত্বের গিরিখাতে উপনীত ব্যাংকিং সিস্টেমকে স্থিতিশীল অবস্থায় নিয়ে আসার মাধ্যমে। পতিত স্বৈরশাসক হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে সবচেয়ে বেশি লুণ্ঠনের শিকার হয়েছিল ব্যাংক খাত। এর ফলে ৬১ ব্যাংকের মধ্যে ১১টি দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছিল। দেশে ৬১ ব্যাংকের প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও হাসিনার খামখেয়ালি সিদ্ধান্তে তার আত্মীয়-স্বজন, আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা এবং হাসিনার পৃষ্ঠপোষকতায় অলিগার্ক ব্যবসায়ী ও ‘রবার ব্যারনে’ পরিণত হওয়া লুটেরাদের পুঁজি লুণ্ঠনের অবিশ্বাস্য সুযোগ করে দেয়ার জন্য এতগুলো ব্যাংকের লাইসেন্স প্রদান করেছিল স্বৈরশাসক হাসিনা। এ ১১ ব্যাংকের মধ্যে চট্টগ্রামের কুখ্যাত ব্যাংক লুটেরা এস আলম কর্তৃক লুণ্ঠিত নিচে উল্লিখিত সাতটি ব্যাংক অন্তর্ভুক্ত ছিল—ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, এসআইবিএল, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, কমার্স ব্যাংক, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক এবং আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক। একজন ব্যক্তিকে সাতটি ব্যাংকের ওপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করতে দেয়ার দ্বিতীয় নজির বিশ্বের কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত এস আলম তার নিয়ন্ত্রণাধীন সাতটি ব্যাংক থেকে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা লুটে নিয়ে বিদেশে পাচার করে দিয়েছে। পতিত সরকারের ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী লুটে নিয়েছে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংককে। পতিত হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বেক্সিমকো গ্রুপের বিভিন্ন ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, দেশের বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে এ সমস্যার কোনো কূলকিনারা পেতে হলে অবিলম্বে প্রত্যেক ব্যাংকের শীর্ষ ১০ ঋণখেলাপিকে দ্রুত বিচারের আওতায় নিয়ে আসার জন্য তিন/চারটি ‘খেলাপি ঋণ ট্রাইব্যুনাল’ গঠন করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। কারণ ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চতর আদালতে আপিল করা যায় না, ফলে বছরের পর বছর মামলাগুলোকে ঝুলিয়ে রাখা যায় না। এ ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মহোদয়ের দ্বিধা ও নিষ্ক্রিয়তা দুর্বোধ্য ও অগ্রহণযোগ্য। যেসব রাঘববোয়াল ঋণখেলাপি বিদেশে পালিয়েছে তাদের খেলাপি ঋণ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে আদায় করার ব্যাপারে আমি মোটেও আশান্বিত নই। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠিত হলে দ্রুত তাদের এ দেশে থাকা কলকারখানা-সহায়-সম্পদ সরকার ক্রোক করে নিতে পারবে। উপরন্তু অদূর ভবিষ্যতে দেশে নতুন করে ‘ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি’ হওয়ার প্রবণতা দূরীভূত হয়ে যাবে।