নয়া বন্দোবস্ত নিয়ে যত কথা

যুগান্তর ড. মাহবুব উল্লাহ প্রকাশিত: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:৫৯

‘নয়া বন্দোবস্ত-সুস্পষ্ট ধারণাই জনগণ পায়নি’ শিরোনামে শুভ্রাংশু চক্রবর্তী একটি দৈনিকের প্রথম পাতায় তার মন্তব্য প্রকাশ করেছেন। শুভ্রাংশু চক্রবর্তী একজন সুপরিচিত মার্কসবাদী অ্যাক্টিভিস্ট। তার কথা ও লেখার গুরুত্ব নিশ্চয়ই আছে। তিনি লিখেছেন, ‘আমি যখন আজকের দেশের বাস্তবতার দিকে তাকাই, তখন এক গভীর অস্বস্তি আমাকে গ্রাস করে। আমাদের দেশে প্রায় ১৬ কোটি মানুষ-যারা হয় দরিদ্র, নয়তো দারিদ্র্যের একদম কাছাকাছি অবস্থানে বাস করছে। তাদের জীবনের কোনো অর্থবহ অধিকার সম্প্রসারণ হয়নি-না অর্থনৈতিকভাবে, না সামাজিকভাবে, না রাজনৈতিকভাবে। চাকরি কমে যাচ্ছে, জীবনের নিশ্চয়তা ভেঙে পড়ছে, অথচ এসব নিয়ে রাষ্ট্রের কোনো কার্যকর জবাব নেই।’


শুভ্রাংশু চক্রবর্তী শ্রেণিসংগ্রামের রাজনীতি করেন। তিনি আমার চেয়ে ভালো করে জানেন, একটি শ্রেণিবিভক্ত সমাজে অধিপতি শ্রেণি কীভাবে নিম্নবর্গের মানুষের কাছ থেকে উদ্বৃত্ত আত্মস্যাৎ করে নিজেরা ধনী হয়। এ ধনী হওয়ার প্রক্রিয়ায় তারা রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে। রাষ্ট্রযন্ত্র নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা তারা অর্জন করে অর্থনৈতিক ক্ষমতা থেকে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এর চেয়েও ভিন্ন প্রকৃতির। এখানে সত্যিকার অর্থে পুঁজিবাদ বিকশিত হয়নি। আমরা দেশে প্রচুর ধনাঢ্য ব্যক্তি দেখছি। কিন্তু তাদের ধনের উৎস শতকরা ৯০ ভাগ ক্ষেত্রে মেহনতি মানুষের শ্রমের দ্বারা সৃষ্ট উদ্বৃত্ত আহরণের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয়নি। এদের সঙ্গে উৎপাদন কিংবা উৎপাদিকা শক্তির কোনো যোগাযোগ নেই। এরা লুটেরা, এরা দুর্বৃত্ত, এরা দুর্নীতিপরায়ণ এবং পরস্ব অপহরণে সিদ্ধহস্ত। একে যদি আমরা পুঁজিবাদ বলি, তাহলে এটা পুঁজিবাদের অতি প্রাথমিক স্তর। কার্ল মার্কস এ স্তরটি সম্পর্কে বলেছেন, এটা হলো আদিম সঞ্চয়নের স্তর বা Primitive accumulation-এর স্তর। মার্কস এ অবস্থাকে আদি পাপের সঙ্গে তুলনা করেছেন। যে আদি পাপের ফলে আদম-হাওয়া স্বর্গচ্যুত হয়েছেন।


যে সমাজে লুণ্ঠন ও দুর্বৃত্তপনা প্রাধান্য বিস্তার করে, সে সমাজে অর্থনৈতিক বিকাশ রুদ্ধ হয়। এরকম সমাজে বর্ধিত পুনরুৎপাদনের মাধ্যমে (Extended Reproduction) পুঁজি বিকশিত হয় না এবং পুঁজির বিনিয়োগও হয় না। যা হয় সেটা হলো, একজনের হাত থেকে অন্যজনের হাতে সম্পদের পুনর্বণ্টন-এরকম সমাজে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মুখ থুবড়ে পড়ে। প্রবৃদ্ধি হয় না বলে বেকারত্ব বাড়তে থাকে। বাড়ে দারিদ্র্যও। বাংলাদেশ এ মুহূর্তে এমন একটি ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে আটকে আছে। যারা ব্যাংকব্যবস্থা এবং অন্য সূত্র থেকে লুণ্ঠন করেছে, তারা তাদের লুণ্ঠিত সম্পদ দেশে রাখেনি। বিদেশে পাচার করেছে। টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ বিশাল। এ সম্পদ যদি দেশে থাকত তাহলে কোনো-না-কোনো পর্যায়ে এ সম্পদের উৎপাদনশীল ব্যবহার হতে পারত। কিন্তু পাচার করা পুঁজি উদ্ধারের সম্ভাবনা অতি ক্ষীণ। ফলে দেশের অপরিমেয় ক্ষতি হয়ে গেছে। যারা লুণ্ঠন করেছে, তাদের থর্সস্টিন ভেবলেনের Leisure Class-এর সঙ্গে তুলনা করা যায়। এই শ্রেণির লোকেরা অলস জীবনযাপন করে; কিন্তু তারা ভোগবিলাসে মত্ত থাকে। তাদের এ বিশ্রাম জীবনের উৎস খেটে খাওয়া মানুষের হাড়ভাঙা শ্রম। বাংলাদেশের একজন প্রয়াত অর্থনীতিবিদ দরিদ্রদের সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন, এরা হলো হার্ড ওয়ার্কিং পুওর। কী নিষ্ঠুর দ্বান্দ্বিক অবস্থা! ছোটবেলায় পড়েছিলাম, আলস্য সব সর্বনাশের মূল। এখন বাস্তবে দেখছি হাড়ভাঙা শ্রমই সব দুঃখ-কষ্টের মূল। এদেশে ‘পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি’। কিন্তু এদেশে পরিশ্রম দুর্দশারই নামান্তর। শুভ্রাংশু চক্রবর্তী দেশের এ পরিস্থিতির জন্য, যেমন বেকারত্ব, দারিদ্র্য ও শোষণের কারণে রাষ্ট্রের কাছে জবাব চেয়েছেন। রাষ্ট্র কেন এ জবাব দেবে? রাষ্ট্র তো এমন অবস্থান উত্তরোত্তর নবায়ন করে চলছে। এখন প্রশ্ন হলো, যে পুরোনো রাষ্ট্রযন্ত্র এত অনাচার-অবিচারের জন্য দায়ী, তাকে পরিবর্তন করে অথবা সংস্কার করে নতুন ব্যবস্থার গোড়াপত্তন করতে না পারলে ভালো কিছু অর্জন করা সম্ভব হবে না। এ পরিবর্তনের চূড়ান্ত রূপটি হতে পারে একটি রাষ্ট্রবিপ্লব। অনেকে বলে থাকেন, তারা লিবারেল ডেমোক্রেসিতে বিশ্বাসী, বিপ্লবে নয়। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, দেশের যে হাল হয়েছে, তা থেকে উত্তরণ লিবারেল ডেমোক্রেসি বা উদারনৈতিক গণতন্ত্রের দ্বারা সম্ভব কি না।


শুভ্রাংশু চক্রবর্তী আরও লিখেছেন, ‘আমি শুরু থেকেই বলতে চাই-‘নয়া বন্দোবস্ত’ কথাটি এলো কেন? এ শব্দটি আমার কাছে প্রথম থেকেই একটা গণসংগ্রামের শব্দ বলে মনে হয়েছিল। বহু আগেই আমি লক্ষ করেছি, কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠী তাদের বক্তব্যে নতুন ধরনের ভাষা, নতুন রেটোরিক ব্যবহার করছে। ‘নয়া বন্দোবস্ত’ সেই ভাষাই অংশ। কিন্তু প্রশ্ন হলো-এ নয়া বন্দোবস্ত আসলে কী করবে? কী তার কর্মসূচি? বাস্তবতা হলো, এ বিষয়ে কখনোই কোনো সুস্পষ্ট ধারণা আমরা পাইনি। একসময় শোনা গেল ‘দয়া করে’-এ শব্দটাও একধরনের রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত হলো। কথার দিক থেকে নতুন, কিন্তু কাজের দিক থেকে পুরোনো ব্যবস্থাই আরও নিষ্ঠুরভাবে ফিরে এলো।’


এ কথা সত্য যে, ‘নয়া বন্দোবস্ত’ কথাটি রাজনীতির একটি রেটোরিকে পরিণত হয়েছে। অনেকে বুঝে কিংবা না বুঝে নয়া বন্দোবস্তের পক্ষে কথা বলেন। নয়া বন্দোবস্ত প্রপঞ্চটির কথা প্রথম বলেছেন লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের অর্থনীতি বিভাগের স্বনামধন্য বাংলাদেশি বাংশোদ্ভূত অধ্যাপক ড. মুশতাক খান। মুশতাক খান প্রতিষ্ঠান অর্থনীতির ক্ষেত্রে যুগান্তকারী অবদান রেখেছেন এবং রেখে চলেছেন। আমরা একটি বহুল আলোচিত গ্রন্থের নাম জানি। এ গ্রন্থটি হলো Why Nations Fail. গ্রন্থটি রচনা করেছেন ডারন এসেমোগলু এবং জেমস এ. রবিনসন। তারা হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। তাদের বক্তব্য হলো, একটি জাতির ব্যর্থতার মূলে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো যখন অকেজো দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন একটি জাতির অগ্রগতি তো দূরের কথা, ধ্বংস অনিবার্য হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা। যখন দেশের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, পুলিশি ব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, গোয়েন্দা সংস্থা ও কারাগার ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, তখন রাষ্ট্র বা দেশটিকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। এজন্যই রাষ্ট্র সংস্কারের কথা উঠেছে, প্রতিষ্ঠান সংস্কারের কথা উঠেছে। যে রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠানগুলো মজবুত ও সুসংহত, সে রাষ্ট্রে অর্থনৈতিক লেনদেনের ব্যয় সবচেয়ে নিচে নেমে আসে। এখানেই হলো প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও