খালেদা জিয়ার শেষ বক্তব্যগুলোতে ছিল ‘প্রতিহিংসাহীন’ রাজনীতির আহ্বান
মানুষের স্বতস্ফূর্ত উপস্থিতিই সব বলে দিয়েছে। গত বুধবার তার জানাজায় লাখো মানুষের জনস্রোত ছিল ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ। তারা এসেছিলেন নিজেদের ভেতরের এক তাগিদ থেকে, এমন একজন মানুষকে শ্রদ্ধা জানাতে, যাকে তারা মনে করতেন নিজেদের প্রতিনিধি।
বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে এ দেশের মানুষের এই বন্ধন রাজনীতির ঊর্ধ্বে। তার জানাজায় আসা সবাই দলীয় নেতাকর্মী ছিলেন না। অধিকাংশই ছিলেন সাধারণ মানুষ। কীভাবে তিনি এত এত সাধারণ মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছিলেন, তা ছিল সত্যিই অবিশ্বাস্য!
দ্য ডেইলি স্টার অফিসের সামনের সড়কটিতে যান চলাচল বন্ধ থাকায় সৌভাগ্যজনকভাবে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের দিকে যাওয়া মানুষের স্রোতের অংশ হতে পেরেছিলাম। হাঁটতে হাঁটতে আমি চারপাশের মানুষের মাঝে অতি গভীর এক শোকের অনুভূতি পেয়েছি। সবাই নীরবে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। প্রতিটি পদক্ষেপে ফুটে উঠছিল এক গভীর শূন্যতার অনুভূতি। সেই শূন্যতা কীভাবে পূরণ হবে, সেটা তারাও যেন জানেন না।
জানাজায় ঠিক কত মানুষ উপস্থিত ছিলেন, তার নির্ভরযোগ্য হিসাব করা সম্ভব না। তবে সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে যে আনুমানিক হিসাব করেছি, তা কয়েক নিযুতে গিয়ে ঠেকেছিল। পরদিনের প্রতিবেদনেও সেটা উল্লেখ করেছি। জানাজায় মানুষের এমন ঢলের পরও সামগ্রিক শৃঙ্খলা ছিল চোখে পড়ার মতো। সবাই এসেছেন, শোক জানিয়েছেন, চলে গেছেন—সবকিছুতেই ছিল মর্যাদা ও সংযমের ছাপ। খালেদা জিয়া যে মূল্যবোধগুলোর প্রতীক ছিলেন, সবাই যেন সেগুলোরই প্রতিনিধিত্ব করে গেলেন। তার ব্যক্তিত্বে যে শান্ত ভাব ছিল, তা ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন তার অনুসারীদের মাঝেও।
২০০৬ সাল থেকে ক্ষমতার বাইরে ছিলেন খালেদা জিয়া। পরবর্তী সাত বছর কাটিয়েছেন নির্জন কারাগার ও গৃহবন্দি অবস্থায়। আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলের অধিকাংশ সময় তিনি হাসিনা সরকারের ধারাবাহিক ও নির্মম অপমানের শিকার হয়েছেন। সেই প্রেক্ষাপটে জানাজায় তার স্মৃতির প্রতি যে সম্মান প্রদর্শিত হয়েছে, তা এক কথায় অলৌকিক।
সম্ভবত হাসিনা যত বেশি হেয় করেছেন, খালেদা জিয়ার প্রতি মানুষের ভালোবাসা ততই বেড়েছে। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ক্ষমতার বাইরে থাকা মানেই সাধারণত মানুষের মন থেকে হারিয়ে যাওয়া। কিন্তু খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে তার ওপর চালানো নিপীড়নই বরং তার জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছে, তার প্রতি মানুষের সম্মান অব্যাহতভাবে বেড়েছে। যে অনুভূতি এতদিন ছিল গোপন, তা শেষ পর্যন্ত তার জানাজায় এসে প্রকাশ করতে পেরেছে সাধারণ মানুষ।
২০২৪ সালের ৭ আগস্ট, হাসিনার পতনের মাত্র দুই দিনের মাথায় খালেদা জিয়া প্রথমবারের মতো জুমের মাধ্যমে এক জনসভায় ভাষণ দেন। ২০১৮ সালে গ্রেপ্তারের পর এটাই ছিল তার প্রথম ভাষণ। গণঅভ্যুত্থানের জন্য শিক্ষার্থীদের ধন্যবাদ জানানো এবং অব্যাহত সংগ্রামের জন্য দলীয় কর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি তার মূল বার্তা ছিল, 'মেধা, যোগ্যতা ও জ্ঞানভিত্তিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার ও সাম্যের ভিত্তিতে নির্মাণ করতে হবে শোষণহীন সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।' সেই ভাষণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো, 'ধ্বংস নয়, প্রতিশোধ নয়, প্রতিহিংসা নয়, ভালোবাসা, শান্তি ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলি।'
উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনে অবস্থানকালে গত বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি জুমের মাধ্যমে দেওয়া দ্বিতীয় ভাষণে তিনি তার স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সেই বক্তব্য স্মরণ করেন—'ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়'। একইসঙ্গে তিনি আবারও প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করে পারস্পরিক ভালোবাসা ও সৌহার্দ্যের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানান।
খালেদা জিয়ার এই দুটি ভাষণের কথা উল্লেখ করছি কারণ, তিনি বারবার জোর দিয়ে বলেছেন, আমাদের সবাইকে—এমনকি তার নিজের দলকেও—প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার রাজনীতি বাদ দিতে হবে। সম্ভবত এই মুহূর্তে দেশের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বার্তাই এটি। যে গণউন্মাদনার সংস্কৃতি আমাদেরকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে গ্রাস করে ফেলছে, সেখান থেকে সরে আসতে হবে। এটি খালেদা জিয়ার প্রজ্ঞা, সহনশীলতা, পরিপক্বতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধেরই প্রমাণ।
আমাদের রাজনৈতিক ঐতিহ্য বিবেচনা করলে—বিশেষ করে ১৯৯১ সালের পর থেকে—আমরা দেখতে পাই, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ধীরে ধীরে এতটাই তিক্ত হয়ে উঠেছে যে, দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দল শত্রুতে পরিণত হয়েছে, যারা পরস্পরকে ধ্বংসে লিপ্ত। যে কারণে দ্য ইকোনমিস্ট খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার রাজনীতিকে আখ্যা দিয়েছে 'দ্য ব্যাটলিং বেগমস' নামে।
১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফল কোনো পক্ষই পুরোপুরি মেনে না নেওয়ায় নির্বাচন ব্যবস্থা ও ভোটারদের স্বাধীনভাবে প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার অধিকার ক্রমাগত দুর্বল হয়েছে। তাদের যুক্তি যেন ছিল—আমি জিতলেই নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু…। প্রতিটি নির্বাচনের পর পারস্পরিক শত্রুতা আরও নগ্নভাবে দৃশমান হয়েছে, আর রাজনীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে 'প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসা'র।
এই লেখাটি খালেদা জিয়ার সামগ্রিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড মূল্যায়নের জন্য নয়। তার সাফল্য ও ব্যর্থতা নিয়ে আমরা আলাদাভাবে লিখব। আজ আমাদের উদ্দেশ্য হলো, মৃত্যুর আগে তার শেষ বার্তাগুলোর তাৎপর্যের ওপর আলোকপাত করা।
যা এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি, সেই বার্তাগুলোই দেওয়ার কারণে খালেদা জিয়ার সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলো বিশেষভাবে মূল্যবান। বাংলাদেশকে নতুন করে গড়ে তুলতে হবে এবং সেটা শুরু করতে হবে এখনই। এর জন্য জরুরিভিত্তিতে প্রয়োজন একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন।