রোহিঙ্গাদের লড়াইকে বৈধতা দেবে ভাষার ডিজিটালাইজেশন

(প্রিয়.কম) দশকের পর দশক ধরে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে অস্বীকার করে আসছে মিয়ানমার। কিন্তু জাতিসংঘের বর্ণনায়, বিশ্বের সবেচেয়ে নিপীড়িত এই জনগোষ্ঠী তাদের পরিচয়ের একটি সূত্র রক্ষার দ্বারপ্রান্তে গিয়ে পৌঁছেছে। নিজস্ব বর্ণমালার ডিজিটাল সংস্করণ পেতে যাচ্ছে তারা। 

রাষ্ট্রহীন এই মুসলিম জনগোষ্ঠী তাদের বর্ণমালাকে বৈশ্বিক কোডিং সিস্টেম ইউনিকোডে উন্নীত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ডিজিটাল মাধ্যমে রোহিঙ্গারা নিজস্ব ভাষায় ইমেইল লেখা, মেসেজ পাঠানো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করতে পারবে। 

১৯৮০ সাল পর্যন্ত এই জনগোষ্ঠীর কোনো লিখিত লিপিও ছিল না। আর ইউনিকোডে তাদের ভাষা প্রতিস্থাপিত হলে তা হবে এই জনগোষ্ঠীর জন্য বিশাল অর্জন। মিয়ানমারে সহিংসতার শিকার এই জনগোষ্ঠী জাতিগত নিধনযজ্ঞের মুখে রয়েছে। অনেক রোহিঙ্গাই গুগল সার্চ, আর টুইট করার মতো টেকনোলোজি দূরে থাক মৌলিক শিক্ষারও সুযোগ পাননি। 

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোহিঙ্গাদের নিজস্ব ভাষার এই ডিজিটাল স্ক্রিপ্ট তাদের স্বীকৃতি আর বেঁচে থাকার একটি বিশাল প্রতীক হিসেবে কাজ করবে। এমনকি এটা যদি তারা খুব তাড়াতাড়ি শিখতেও না পারে।

‘একটি জনগোষ্ঠীর যদি নিজস্ব লিখিত ভাষা না থাকে, তখন এটা বলা আরও সহজ হয়ে যায় যে, তোমাদের আসলেই অস্তিত্ব নেই,’ বলেন মাদ্রাসা শিক্ষক মোহাম্মদ হানিফ। ১৯৮০’র দশকে তিনিই প্রথম রোহিঙ্গা ভাষায় লেখার পদ্ধতির উন্নয়ন ঘটান। তিনি বলেন, ‘তখন তাদের নিপীড়ন করা আরও সহজ হয়ে যায়।’

রোহিঙ্গাদের জন্য এটা একটা মৌলিক সমস্যা। মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের নিজস্ব নাম রাখারও অনুমোদন দেয় না। দেশটি জনগোষ্ঠীটিকে ‘বাঙালি’ বলে অভিহিত করে। আর কয়েক প্রজন্ম ধরে মিয়ানমারে বসবাস করে আসলেও তাদেরকে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অবৈধ অভিবাসী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভাষা এই ইস্যুটির একটি অংশ। রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা চট্টগ্রামে ব্যবহৃত বাংলা ভাষার একটি উপভাষা ব্যবহার করে থাকে। মিয়ানমারের বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে তা বিদেশি হিসেবে বিবেচিত হয়।   

সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীটিকে মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্য থেকে পদ্ধতিগত নিপীড়নের মাধ্যমে তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। আর সম্প্রতি সেনাবাহিনী ওই নিপীড়নে যোগ দিয়েছে। ‘ডক্টর্স উইদায়ইট বার্ডার’ নামে একটি সাহায্য সংগঠন বলছে, সম্প্রতি সেনা অভিযান শুরুর প্রথম মাসেই হত্যার শিকার হয়েছেন ছয় হাজার সাতশো রোহিঙ্গা। 

গত আগস্টে ওই অভিযোন শুরুর পর সাড়ে ছয় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে শুধুমাত্র মাতৃভূমিতে আগুন, ধর্ষণ আর হত্যা থেকে বাঁচতে। 

রোহিঙ্গাদের কোনো লিখিত লিপি ছিল না, যতক্ষণ পর্যন্ত ইসলামি পণ্ডিত হানিফ সহিংসতার শিকার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসে ভাষার পার্থক্য নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। হানিফ বলেন, এখন এই লিপিতে লেখা প্রায় ৫০টি বই পাওয়া যায়। এই বইগুলো মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, সৌদি আরব আর কানাডায় রোহিঙ্গাদের নিয়ে পরিচালিত স্কুলে পড়ানো হয়।

তবে রোহিঙ্গা ভাষায় লেখার পদ্ধতির উন্নতি ঘটাতে অন্য চেষ্টাও হয়েছে। আরবি, উর্দু আর ইংরেজি লিপি ব্যবহার করে লেখা ওই স্ক্রিপ্টগুলো ‘রোহিঙ্গা-লিশ’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। কিন্তু ‘হানিফি রোহিঙ্গা’ই শুধু ইউনিকোড কনসোর্টিয়ামে অন্তর্ভুক্ত হতে যাচ্ছে। অলাভজনক এই প্রতিষ্ঠানটি ডিজিটাল বর্ণ ও সংখ্যার বৈশ্বিক মান বজায় রাখার কাজ করে। 

যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক ওই কনসোর্টিয়ামের এক প্রতিনিধি বার্তা সংস্থা এএফপি-কে বলেন, ‘হানিফি রোহিঙ্গা’ লিপির পরবর্তী সংস্করণ নিয়ে বিবেচনা করছে তারা। আগামী ফেব্রুয়ারিতে এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে। 

অনুমোদন পেলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাস করা রোহিঙ্গারা হোয়াটস অ্যাপের মতো চ্যাট সার্ভিস ব্যবহার করে নিজস্ব ডিজিটাল বর্ণমালায় বার্তা আদান-প্রদান করতে পারবে। এমনকি বাংলাদেশে বসবাস করা আট লাখ রোহিঙ্গাও এই সুবিধা পাবে। 

আর ‘এই পদক্ষেপ রোহিঙ্গাদের ভাষা আর এর নিপীড়িত মানুষের লড়াইকে বৈধতা দেবে’, বলেন মোহাম্মদ নুর। এই সফটওয়্যার প্রকৌশলী ‘হানিফি রোহিঙ্গা’ ভাষার জন্য নিজস্ব কম্পিউটার টাইপরীতি তৈরি করে দিয়েছেন। এই টাইপরীতি দিয়ে অফলাইনে ওয়ার্ড প্রসেসিং করা যায়।

সংকটপূর্ণ এলাকায় অনুবাদকের কাজে সহায়তাকারী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘ট্রান্সেলেটরস উইদাউট বর্ডারস’ এর কর্মকর্তা রেবেকা পেট্রাস রোহিঙ্গা ভাষার জিডিটাল মাধ্যমে প্রবর্তনের গুরুত্বকে ‘বৈপ্লবিক’ বলে অভিহিত করেছেন।

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরে কাজ করা রেবেকা বলেন, ‘যেকোনো ভাষার টিকে থাকার জন্য লিপি খুবই জরুরি। ডিজিটাল মাধ্যম ভাষাকে শক্তিশালী হতে সাহায্য করবে। একইসঙ্গে এটাকে সংরক্ষণের পথে বহুদূর এগিয়ে নেবে।’

সূত্র: গার্ডিয়ান

প্রিয় সংবাদ/শান্ত