ইলিশের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৩ হাজার টাকা কেজি দরে। ছবিটি সম্প্রতি বরিশালের বাকেরগঞ্জ থেকে তোলা। ছবি: স্টার মেইল

বিশ্বসেরা ইলিশের দেশে কেন ভারতীয় স্বাদহীন ইলিশের অনুপ্রবেশ?

তানজিল রিমন
প্রিয় নিউজ
প্রকাশিত: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯:৪৯
আপডেট: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯:৪৯

পৃথিবীতে ইলিশের মোট উৎপাদনের প্রায় ৮৬ শতাংশই হয় বাংলাদেশে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইলিশ উৎপাদনে বাংলাদেশের ধারে-কাছেও কোনো দেশ নেই। ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবেও বাংলাদেশের ইলিশ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। অথচ সম্প্রতি দেশের বড় বড় মৎস্য বাজারগুলোতে ঘুরলে চোখে পড়বে এক অদ্ভুত চিত্র। দেশি ইলিশের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের পুরোপুরি বাইরে চলে গেছে। ঠিক এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে দেদারসে দেশের ভেতরে ঢুকছে ভারত থেকে আসা ইলিশ।

যে দেশের ইলিশের অনন্য স্বাদ, সুগন্ধ ও গুণগত মান বিশ্বজুড়ে সমাদৃত, সেই দেশকেই কেন আজ স্বাদহীন বিদেশি ইলিশের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে? উৎপাদনে শীর্ষস্থানে থেকেও কেন এ দেশের সাধারণ মানুষ এক টুকরো ইলিশের স্বাদ নিতে পারছে না? আজ আমরা এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করব।

আবেগের অপর নাম ইলিশ: ইতিহাস ও সাহিত্যে শেকড়

বাঙালির সমাজ, সংস্কৃতি ও প্রাত্যহিক জীবনের সাথে ইলিশের সম্পর্ক শতাব্দীপ্রাচীন। এটি কেবল রসনাবিলাসের বস্তু নয়, বরং আভিজাত্য, সামাজিক মর্যাদা এবং বাঙালি জাতিসত্তার অন্যতম প্রতীক। দ্বাদশ শতাব্দীর সর্বানন্দের ‘টীকাসর্বস্ব’ গ্রন্থ থেকে শুরু করে মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য—সবখানেই ইলিশের সগৌরব উপস্থিতি রয়েছে। বিজয় গুপ্তের ‘মনসামঙ্গল’ কিংবা ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যে ইলিশের রান্নার যে নিখুঁত বর্ণনা পাওয়া যায়, তা প্রমাণ করে অন্তত আটশ বছর আগে থেকেই বাঙালি সমাজে ইলিশের কতটা কদর ছিল। বেহুলা ও লখিন্দরের বিয়ের ভোজেও অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল ভাজা ইলিশ।

আধুনিক বাংলা সাহিত্যে ইলিশ একাধারে মধ্যবিত্তের রোমান্টিসিজম এবং প্রান্তিক জেলের রূঢ় বাস্তবতার প্রতীক। বিংশ শতাব্দীর অন্যতম কবি বুদ্ধদেব বসু তাঁর বিখ্যাত ‘ইলিশ’ কবিতায় একে ভালোবেসে নাম দিয়েছিলেন ‘জলের উজ্জ্বল শস্য’। বর্ষার আবহে ইলিশের আগমনকে তিনি চিত্রিত করেছেন কেরানির গিন্নির ভাঁড়ারে সরিষার ঝাঁজ ও ইলিশ ভাজার গন্ধ দিয়ে। অন্যদিকে প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর কালজয়ী ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসে কুবের মাঝির নৌকায় লণ্ঠনের আলোয় চকচক করা মৃত ইলিশগুলোকে জেলেদের চরম দারিদ্র্য ও শোষণের রূপক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। প্রখ্যাত রম্য রচয়িতা সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর একাধিক লেখায় ইলিশের কথা তুলে ধরেছেন।

যেকোনো উৎসবে খাবার টেবিলে এক টুকরো সর্ষে ইলিশ, ভাপা ইলিশ, ইলিশের পাতুরি বা ইলিশ পোলাও আভিজাত্য ও আনন্দের প্রতীক। প্রাচীনকালে ‘স্মোকড হিলসা’ বা ধোঁয়া ওঠা ইলিশেরও প্রচলন ছিল। কিন্তু আধুনিক সময়ে এসে মধ্যবিত্তের এই সাংস্কৃতিক নস্টালজিয়া যেন বাজারের রূঢ় বাস্তবতার মুখে থমকে দাঁড়িয়েছে।

পদ্মার ইলিশ কেন বিশ্বসেরা?

বাংলাদেশের ইলিশ, বিশেষ করে পদ্মা ও মেঘনার ইলিশের জাদুকরী স্বাদের পেছনে রয়েছে চমৎকার বৈজ্ঞানিক ও পরিবেশগত কারণ। ইলিশ মূলত ‘অ্যানাড্রোমাস’ বা পরিযায়ী মাছ। এরা জীবনের একটি বড় সময় সমুদ্রের লোনা পানিতে ফাইটোপ্লাংকটন ও জুপ্লাংকটন খেয়ে কাটায় এবং শরীরে প্রচুর চর্বি জমায়। কিন্তু যখন প্রজনন বা ডিম ছাড়ার সময় হয়, তখন এরা মোহনা পেরিয়ে নদীর মিঠা পানিতে প্রবেশ করে।

সমুদ্র থেকে পদ্মা নদীর দূরত্ব অনেক বেশি হওয়ায় ইলিশকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। উজানের প্রবল স্রোতের বিপরীতে মাইলের পর মাইল সাঁতার কাটার কারণে মাছের শরীরে জমে থাকা ফ্যাট বা চর্বি ধীরে ধীরে ভেঙে পেশিতে ছড়িয়ে পড়ে। স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটার এই দীর্ঘ পরিশ্রমে চর্বির সুষম বণ্টনের কারণেই পদ্মার ইলিশে এক অপূর্ব স্বাদ ও মোলায়েম ভাব তৈরি হয়, যা সামুদ্রিক ইলিশে পাওয়া যায় না। সামুদ্রিক ইলিশের শরীরে চর্বি এক জায়গায় জমাট বেঁধে থাকে বলে তা নদীর ইলিশের মতো সুস্বাদু হয় না।

পুষ্টিবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, পদ্মার ইলিশে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড (EPA এবং DHA) প্রচুর পরিমাণে বিদ্যমান। এছাড়া বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পদ্মার ইলিশে গ্লুটামিক এসিড, অ্যাসপার্টিক এসিড, অ্যালানিন এবং ওলিক এসিডের মাত্রা অন্যান্য অঞ্চলের মাছের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এই নির্দিষ্ট অ্যামাইনো এসিডগুলোই মাংসে ‘উমামি’ স্বাদ বা তীব্র সুগন্ধ নিয়ে আসে। এর পাশাপাশি পদ্মার পানিতে রয়েছে ‘ডায়াটম’ নামের এক বিশেষ ধরনের শৈবাল, যা ইলিশের অত্যন্ত প্রিয় খাবার। এই শৈবাল ইলিশের শরীরে বিশেষ ধরনের তেল তৈরি করে, যা এর স্বাদকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

ভারতীয় ইলিশ বনাম দেশি রূপালি শস্য: জিনগত ও স্বাদগত বিস্তর ফারাক

ভারত থেকে বেনাপোল বন্দর দিয়ে যে ইলিশ বাংলাদেশে আমদানি হচ্ছে, তার বেশিরভাগই আসে গুজরাট অঞ্চল বা আরব সাগরের মোহনা (তাপ্তি ও নর্মদা নদী) থেকে। ক্রেতাদের অনেকেই জানেন না যে, বঙ্গোপসাগরীয় অববাহিকার ইলিশ এবং আরব সাগরীয় অববাহিকার ইলিশ সম্পূর্ণ আলাদা দুটি জেনেটিক স্টক। উন্নত জিনগত গবেষণায় (যেমন- সাইটোক্রোম বি জিন সিকোয়েন্সিং) প্রমাণিত হয়েছে যে, ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার কারণে এই দুই অঞ্চলের ইলিশের মধ্যে জিনগত আদান-প্রদান ঘটে না।

গুজরাট থেকে আসা ইলিশগুলোর শারীরিক গঠন দেশি ইলিশের চেয়ে বেশ ভিন্ন। এগুলো তুলনামূলকভাবে খাটো, পেট বেশি মোটা ও চওড়া প্রকৃতির হয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো- প্রজনন মৌসুমের কারণে এই মাছগুলো ডিমে ভরপুর থাকে। ডিমওয়ালা হওয়ার কারণে মাছের শরীরের বেশিরভাগ নির্যাস, প্রোটিন ও ফ্যাট ডিমে চলে যায়। ফলে এর পেশি হয়ে পড়ে রুক্ষ ও স্বাদহীন। দেশি ইলিশের যে রূপালি ঔজ্জ্বল্য, জিভে জল আনা সুঘ্রাণ এবং রান্নার পর যে মোলায়েম ভাব থাকে, ভারতীয় ইলিশে তা একেবারেই অনুপস্থিত।

অথচ বাজারের চিত্র ভয়াবহ। অসাধু ব্যবসায়ীরা ভারত বা মিয়ানমার থেকে আসা এই স্বাদহীন, সস্তা ইলিশগুলোকে অনায়াসেই ‘পদ্মা বা বরিশালের ইলিশ’ বলে চড়া দামে সাধারণ ক্রেতাদের গছিয়ে দিচ্ছেন। এতে একদিকে ক্রেতারা আর্থিকভাবে চরম প্রতারণার শিকার হচ্ছেন, অন্যদিকে বাংলাদেশের ইলিশের যুগান্তকারী সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

কেন এই আকস্মিক ধস ও আমদানিনির্ভরতা?

বিগত এক দশক ধরে দেশে ইলিশের উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এসে এতে বড় ধরনের ধস নামে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড ৫ লাখ ৭১ হাজার টন ইলিশ উৎপাদিত হয়েছিল। কিন্তু গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা প্রায় ৭১ হাজার টন কমে ৫ লাখ টনের নিচে নেমে এসেছে। দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে বড় মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রগুলোতে, যেমন বরিশালের পোর্ট রোডে, যেখানে আগে দিনে ১০০-১৫০ মণ ইলিশ আসত, সেখানে এখন মাত্র ৩-৫ মণ ইলিশ আসছে।

সরবরাহ কমে যাওয়ায় খুচরা বাজারে আগুন লেগেছে। ৮০০ গ্রাম থেকে এক কেজির ওপরের ইলিশের দাম আড়াই হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকায় গিয়ে ঠেকেছে, যা নিম্ন-মধ্যবিত্ত তো বটেই উচ্চ-মধ্যবিত্তেরও নাগালের বাইরে। এই ঘাটতি ও আকাশছোঁয়া দামের সুযোগটাই নিচ্ছেন কিছু অসাধু আমদানিকারক ও সিন্ডিকেট। ভারত থেকে শুল্ক, কর ও পরিবহন খরচ মিলিয়ে প্রতি কেজি ইলিশ আনতে আমদানিকারকদের খরচ পড়ছে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকার মতো। অথচ সেই একই মাছ খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে দেড় হাজার থেকে দুই হাজার টাকায়। অর্থাৎ খামার বা আমদানি পর্যায় থেকে খুচরা বাজারের মূল্যের ব্যবধান এতটাই বেশি যে, হাতবদলের প্রতিটি ধাপে মধ্যস্বত্বভোগীরা অস্বাভাবিক মুনাফা লুটছে।

বাংলাদেশের ইলিশের স্বাদ অতুলনীয়, যার বিপরীতে ভারতীয় ইলিশের স্বাদ তেমন নেই। দেশি ইলিশের ফাইল ছবি

জেলেদের কান্না ও মহাজনি দাদনের নিষ্ঠুর ফাঁদ

ইলিশের দাম এত চড়া হলেও যিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে নদী বা সাগর থেকে মাছ ধরছেন, সেই প্রান্তিক জেলের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। এর মূল কারণ উপকূলীয় অঞ্চলের দীর্ঘদিনের অভিশাপ ‘দাদন প্রথা’ বা মহাজনি ঋণব্যবস্থা।

ইলিশ ধরার মৌসুমে জালের সুতা, ট্রলারের জ্বালানি তেল এবং সংসারের দৈনন্দিন খরচ মেটাতে জেলেরা আড়তদার বা মহাজনদের কাছ থেকে উচ্চ সুদে অগ্রিম ঋণ নিতে বাধ্য হন। দাদনের কঠিন শর্ত হলো, বাজারদর যাই হোক না কেন, মাছ ধরে এনে ওই মহাজনের কাছেই নির্ধারিত এবং নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করতে হবে। ফলে একজন জেলে যে মাছ ৩০০-৪০০ টাকা কেজিতে মহাজনের কাছে তুলে দেন, সেই মাছ তিন-চার হাত (ফড়িয়া, পাইকার, খুচরা বিক্রেতা) ঘুরে শহরের বাজারে পৌঁছাতেই দাম হয়ে যায় তিন হাজার টাকা। উৎপাদক থেকে ভোক্তার এই দীর্ঘ যাত্রায় মুনাফার পুরো মাখনটাই খেয়ে ফেলছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। দাদন প্রথার এই শৃঙ্খল ভাঙতে না পারলে ইলিশের বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

নদীর কান্না: ফরাক্কা বাঁধ, জলবায়ু পরিবর্তন ও দূষণ

ইলিশ উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কাঠামোগত কারণ হলো নদীর বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হয়ে যাওয়া। ১৯৭৫ সালে গঙ্গা নদীতে ভারতের নির্মিত ফরাক্কা বাঁধ বাংলাদেশের ইলিশের জীববৈচিত্র্যের ওপর এক বিশাল বিপর্যয় ডেকে এনেছে। শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় পদ্মা-মেঘনায় শত শত ডুবোচর জেগে উঠেছে। সমুদ্র থেকে নদীতে প্রবেশের মোহনাগুলো বালু জমে সরু হয়ে গেছে। প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ যখন ডিম ছাড়ার জন্য নদীতে আসতে চায়, তখন এই ডুবোচরগুলোর কারণে তারা বাধাগ্রস্ত হয় এবং বাধ্য হয়ে সাগরে ফিরে যায় বা গতিপথ পরিবর্তন করে।

এর সাথে যুক্ত হয়েছে ভয়াবহ নদীদূষণ। শিল্পকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য, প্লাস্টিক ও কৃষিকাজে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার বৃষ্টির পানির সাথে মিশে নদীতে পড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, দূষণের কারণে মেঘনা নদীতে ইলিশের প্রধান খাদ্য ‘প্লাংকটন’-এর পরিমাণ প্রায় ৬৮ শতাংশ কমে গেছে। দূষিত পানি ও খাদ্যাভাবের কারণে ইলিশ তার স্বাভাবিক বৃদ্ধি হারাচ্ছে এবং যে মাছগুলো ধরা পড়ছে, সেগুলোর গড় ওজন আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে।

পাশাপাশি নাব্যতা সংকট ও দূষণের সুযোগে অসাধু জেলেরা নদীতে অবৈধ কারেন্ট জাল, ছোট ফাঁসের জাল ও ‘চায়না দুয়ারি’র ব্যাপক ব্যবহার করছে। এসব জালে প্রজননক্ষম মা ইলিশের পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে জাটকা ধরা পড়ছে, ফলে ভবিষ্যৎ ইলিশের মজুত আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে।

সংরক্ষণের চ্যালেঞ্জ ও সরকারি সহায়তায় অব্যবস্থাপনা

মা ইলিশ ও জাটকা রক্ষায় সরকার বছরে কয়েকবার মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা (যেমন ২২ দিন বা ৬০ দিনের নিষেধাজ্ঞা) আরোপ করে। এটি ইলিশ সংরক্ষণে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয়েছে বিকল্প কর্মসংস্থান ও খাদ্য সহায়তা বিতরণে।

নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন অভাবী জেলেদের ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় যে চাল দেওয়ার কথা, তা নিয়ে প্রান্তিক পর্যায়ে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে প্রকৃত জেলেরা অনেক সময়ই সময়মতো এই চাল পান না। ৪০ কেজি চালের জায়গায় অনেকে মাত্র ২০-২৫ কেজি পান, যা দিয়ে একটি পরিবারের সারা মাস চলা অসম্ভব। এছাড়া অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনার জন্য নগদ অর্থের কোনো ব্যবস্থা নেই। পেটের দায়ে এবং মহাজনের ঋণের কিস্তি মেটানোর চাপে বাধ্য হয়ে অনেক জেলে রাতের আঁধারে লুকিয়ে আইন অমান্য করে মাছ ধরেন। জেলেদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কেবল আইন প্রয়োগ করে ইলিশ রক্ষা করা একপ্রকার অসম্ভব।

‘ইলিশ কূটনীতি’র স্ববিরোধী সমীকরণ

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতেও ইলিশ এক অদ্ভুত ভূমিকা পালন করছে। প্রতি বছর দুর্গাপূজা উপলক্ষে বন্ধুত্বের নিদর্শনস্বরূপ বাংলাদেশ থেকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নির্দিষ্ট পরিমাণ ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়, যাকে বলা হয় ‘ইলিশ কূটনীতি’। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা ভাষার ও সংস্কৃতির মিলের কারণে বাংলাদেশের পদ্মার ইলিশের প্রতি গভীর আবেগ ধারণ করেন।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, একদিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ব্যবসায়ীরা দুর্গাপূজায় পদ্মার ইলিশের জন্য মুখিয়ে থাকেন এবং বাংলাদেশ সরকারের কাছে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আবেদন জানান। অন্যদিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের আগুন নেভাতে ব্যবসায়ীরা খোদ ভারতের গুজরাট থেকে নিম্নমানের ইলিশ আমদানি করছেন। এই বিপরীতমুখী বাণিজ্যপ্রবাহ প্রমাণ করে যে, ইলিশ কেবল একটি ভোজ্য পণ্য নয়, এটি দুই দেশের পানিবণ্টন, নদী কূটনীতি ও অর্থনৈতিক চাহিদার এক জটিল সমীকরণ। ফরাক্কার কারণে সৃষ্ট অববাহিকাগত সংকট নিরসন না হলে এই সমস্যা আরও প্রকট হবে।

ভবিষ্যতের পরিণতি ও উত্তরণের পথ

বাংলাদেশের ইলিশ আজ একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও সংকটাপন্ন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। বিশ্বের সর্বোচ্চ ইলিশ উৎপাদনকারী দেশ হয়েও ভারত থেকে স্বাদহীন ইলিশ আমদানি করাটা আমাদের মৎস্য ব্যবস্থাপনা, নদী সংরক্ষণ ও বাজার নিয়ন্ত্রণের কাঠামোগত দুর্বলতার দিকেই আঙুল তুলছে।

ভবিষ্যতে যদি নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে বিজ্ঞানভিত্তিক ড্রেজিংয়ের ব্যবস্থা না করা হয়, নদীদূষণ কঠোর হাতে দমন করা না যায় এবং সর্বোপরি জেলেদের দাদনের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য না ভাঙা যায়, তবে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। এর জন্য জেলেদের সহজ শর্তে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ দেওয়া এবং ভিজিএফ কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা আনা জরুরি। পাশাপাশি বাজারে কঠোর নজরদারি চালাতে হবে যেন আমদানিকৃত ইলিশ দেশি ইলিশের নামে প্রতারণামূলকভাবে বিক্রি না হয়।

এমন একদিন হয়তো খুব দূরে নয়, যেদিন কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে ‘বিশ্বসেরা ইলিশের দেশ’ কথাটি কেবল বইয়ের পাতাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে এবং সাধারণ মানুষের পাতে থাকবে শুধু স্বাদহীন বিদেশি মাছের টুকরো। জাতীয় মাছ ইলিশের এই হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে এবং টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করতে হলে নীতিনির্ধারকদের এখনই দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত ও বিজ্ঞানভিত্তিক পদক্ষেপ নিতে হবে। নতুবা প্রকৃতির এই অমূল্য উপহার অচিরেই আমাদের হাতছাড়া হয়ে যাবে।