প্রতিদিন সীমান্তের নানান প্রান্তে পুশ-ইনের চেষ্টা করছে বিএসএফ। ছবি: সংগৃহীত
ভিসা চালু, থামেনি পুশ-ইন: কোন পথে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক?
আপডেট: ০২ জুলাই ২০২৬, ২০:৫৩
প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশিদের জন্য ভারতীয় ভিসা কার্যক্রম পুনরায় চালু হয়েছে। ২০২৪ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দুই দেশের সম্পর্কে যে স্থবিরতা ও তিক্ততা তৈরি হয়েছিল, ভিসা চালুর মধ্য দিয়ে তাতে কিছুটা বরফ গলার ইঙ্গিত মিলছে। চিকিৎসা, পর্যটন ও শিক্ষার উদ্দেশ্যে ভারতগামী বাংলাদেশিদের পাশাপাশি কলকাতার ব্যবসায়ীদের মধ্যেও ফিরেছে স্বস্তি।
তবে দৃশ্যমান এই স্বস্তির আড়ালে সম্পর্কের আসলেও কতটুকু উন্নতি হয়েছে, সেই প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে। কারণ একদিকে ভিসা চালু হলেও অন্যদিকে সীমান্তে অব্যাহত ‘পুশ-ইন’ ও অস্বস্তিকর পরিবেশ এখনও থামেনি।
টানা দুই বছরের এই টানাপোড়েনের পর ভিসা চালু হওয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তবে সীমান্ত পরিস্থিতির কারণে তারা সতর্ক আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. আকমল হোসেন প্রিয় নিউজকে বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্কের যে অবনতি হয়েছিল, সেটি কারও জন্যই ভালো নয়। ভারতের বর্তমান সরকার দেখেছে, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নতি করা প্রয়োজন। কারণ প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশের যেমন ভারতকে প্রয়োজন, বাংলাদেশকেও ভারতের প্রয়োজন। ফলে সম্পর্ক উন্নতির জন্য প্রাথমিক উদ্যোগ হিসেবে ভিসা কার্যক্রম চালু ইতিবাচক।
ভিসা কার্যক্রম চালুর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের যাতায়াত বাড়লে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার দিকে আরও এগিয়ে যাবে বলে মনে করেন ড. আকমল হোসেন।
সম্পর্ক উন্নয়নে ভিসা কার্যক্রম না থাকা একটা বড় বাধা ছিল এবং সেটা দূর হয়েছে বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির। তিনি প্রিয় নিউজকে বলেন, “ভিসা দেওয়ার মাধ্যমে সম্পর্ককে উন্নতির দিকে এগিয়ে নেওয়া হলো। এতে দুই দেশের মানুষের মধ্যে যাতায়াত বাড়বে, যোগাযোগের ভিত তৈরি হবে। সম্পর্কে উন্নয়নে ভিসা চালু হওয়াটা বড় অগ্রগতি।”
পুশ-ইন বন্ধে বাংলাদেশকে কূটনৈতিকভাবে চাপ প্রয়োগ করতে হবে জানিয়ে এম হুমায়ুন কবির বলেন, “পুশ-ইন দ্রুত বন্ধে আলোচনায় বসতে হবে। ভিসা কার্যক্রম স্বাভাবিকের করার ফলে পুশ-ইন বন্ধে কার্যকর আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।”
অন্যদিকে পুশ-ইনের চেষ্টা বাংলাদেশকে চাপে রাখার একটা কৌশল হতে পারে বলে মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক ড. লাইলুফার ইয়াসমিন। কারণ দুই দেশই সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে উদ্যোগী, অথচ সীমান্তে অস্থিরতা তৈরি করা হচ্ছে।
ভিসা চালুর আকস্মিক ঘোষণা ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ভিসা কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় বাংলাদেশ ও ভারত। এরপর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠন করলে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রত্যাশা তৈরি হয়। তবে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর সীমান্তের পরিস্থিতি নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
এরই মধ্যে ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিদেশ সফর। ক্ষমতায় আসার পর তিনি প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরের জন্য মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নেন। প্রধানমন্ত্রী যখন চীন সফরে, ঠিক সেই সময়টাতেই আকস্মিক ভিসা চালুর ঘোষণা দেয় ভারত।
গত ২৫ জুন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের কাছে পরিচয়পত্র পেশ করেন নবনিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। ওই দিনই যমুনায় ভারতীয় ভিসা সেন্টার পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, ‘আমরা অত্যন্ত আনন্দের সাথে ট্যুরিস্ট ভিসার আবেদন কার্যক্রম পুনরায় শুরু করছি। মানবিক বিবেচনায় জরুরি মেডিকেল ভিসার সুবিধাও অব্যাহত থাকবে। আশা করি, এর ফলে দুই দেশের জনগণের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে।’
পরে গত ২৮ জুন থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট ও খুলনার ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রে (আইভিএসি) পর্যটন ভিসার কার্যক্রম শুরু হয়।
উপদেষ্টাকে ইমিগ্রেশনের বাধা
ভিসা চালুর মাত্র কয়েকদিন আগেই এক অনাকাঙ্ক্ষিত কূটনৈতিক টানাপোড়েনের সাক্ষী হয় দুই দেশ। ১৫ জুন দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশনের (আইওআরএ) বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিতে ১৪ জুন সন্ধ্যায় দিল্লি পৌঁছান প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। কিন্তু ইমিগ্রেশনে তাকে আড়াই ঘণ্টা বসিয়ে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
পরে অনুমতি পেলেও প্রতিবাদস্বরূপ ভারতে প্রবেশ না করে দেশে ফিরে আসেন তিনি। এ প্রসঙ্গে জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘আমি সেখানে রাষ্ট্রের একজন প্রতিনিধি হিসেবে গিয়েছিলাম। ফলে আমার সাথে যা হয়েছে, তার তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করা দরকার বলে মনে করেছি। ভারত একপর্যায়ে প্রবেশের অনুরোধ করলেও, প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা হিসেবে আমার মনে হয়েছে—রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি বার্তা দেওয়া দরকার। বার্তাটি হলো, এটা শেখ হাসিনা সরকার নয়।’
এই ঘটনায় আবার নতুন করে প্রমাণ হয়, দুই দেশের সম্পর্ক এখনও স্বাভাবিক হয়নি। এর কয়েকদিন পরই ভারতীয় ভিসা কার্যক্রম চালু করা হয়।
কলকাতার ব্যবসায়ীদের উচ্ছ্বাস
ভিসা চালুর খবরে সবচেয়ে বেশি উচ্ছ্বসিত কলকাতার ব্যবসায়ীরা। ২৮ জুন ভিসা চালুর খবর পেয়ে নিউমার্কেট এলাকার ব্যবসায়ীরা মিষ্টি বিতরণ করে আনন্দ উদযাপন করেন। বাংলাদেশি পর্যটকদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে ব্যবসায়ী সমিতি জরুরি বৈঠক করে নজরদারি জোরদার করেছে।
এর আগে, ২০২৫ সালের আগস্টে ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ভিসা জটিলতায় কলকাতার ‘মিনি বাংলাদেশ’ খ্যাত মারকুইস স্ট্রিট ও ফ্রি স্কুল স্ট্রিট এলাকায় স্মরণকালের ভয়াবহ ধস নেমেছে। বাংলাদেশি পর্যটক শূন্যের কোঠায় নেমে আসায় গত এক বছরে ওই এলাকায় লোকসানের অঙ্ক ১ হাজার কোটি রুপি ছাড়ায়। ফ্রি স্কুল স্ট্রিট ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক হায়দার আলী খান জানান, নিউমার্কেট ও বড়বাজারের ক্ষতি ধরলে বার্ষিক লোকসান ৫ হাজার কোটি রুপি ছাড়িয়ে যাবে। প্রায় ৪০ শতাংশ রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ভিসা চালুর পর এখন তারা ফের পুরোনো প্রাণচাঞ্চল্য ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন।
পুশ-ইন থামছেই না
ভিসা নিয়ে যখন কিছুটা স্বস্তির খবর ছড়িয়ে পড়েছে, তখন সীমান্তে চলছে অস্বস্তিকর পরিবেশ। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয়ের পর বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে জোরপূর্বক ‘পুশ-ইন’ চরম আকার ধারণ করেছে।
ভিসা কার্যক্রম চালুর পরদিন ২৯ জুন শেরপুরের সীমান্ত এলাকা দিয়ে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশের সময় এক যুবক ও এক তরুণকে আটক করেছে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি)। পরে সীমান্ত দিয়ে তাঁদের পুশব্যাক করা হয়।
একই দিন মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার নাজিরাকোনা সীমান্ত দিয়ে ১০ জনকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করেছে বিএসএফ। তবে বিজিবি ও স্থানীয় গ্রামবাসীর বাধার মুখে শেষ পর্যন্ত তাদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয় বিএসএফ।
হবিগঞ্জের সীমান্ত এলাকায় বিএসএফের পুশ-ইন অপচেষ্টা প্রতিহত করেছে বিজিবি। ওইদিন রাতে চুনারুঘাট উপজেলার গুইবিল সীমান্তে সিকিউরিটি লাইট বন্ধ করে বেশ কয়েকজন ভারতীয় নাগরিককে পুশ-ইনের চেষ্টা করে বিএসএফ। এসময় সতর্ক অবস্থানে থাকা বিজিবি হবিগঞ্জ ৫৫ ব্যাটালিয়নের সদস্যরা তা প্রতিহত করেন।
প্রতিদিন সীমান্তের একাধিক জায়গায় পুশ-ইন চেষ্টা চালায় বিএসএফ। মে ও জুন মাসে রাতের অন্ধকারে নারী ও শিশুসহ অসংখ্য মানুষকে শূন্যরেখায় ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হয়, যা স্থানীয়দের সহায়তায় কঠোরভাবে রুখে দিয়েছে বিজিবি।
যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া শূন্যরেখায় নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের আটকে রাখার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটি একে ‘আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করেছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার কঠোর কূটনৈতিক অবস্থান নিয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানিয়েছেন, পুশ-ইন বন্ধের কঠোর আহ্বান জানিয়ে নয়াদিল্লিকে অন্তত ১২ থেকে ১৩টি আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদলিপি পাঠানো হয়েছে। ঢাকা স্পষ্ট জানিয়েছে, আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া রাতের অন্ধকারে একতরফা পুশ-ইনের এই জবরদস্তিমূলক নীতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
যেভাবে শুরু হয়েছিল সম্পর্কের টানাপোড়েন
বর্তমান প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হবে গত দুই বছরের ঘটনাবলির দিকে। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্কে শীতলতা শুরু হয়। ওই মাসে বাংলাদেশের ফেনী ও নোয়াখালীতে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার জন্য ভারত সরকারের পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই জলকপাট (স্লুইস গেট) খুলে দেওয়াকে দায়ী করেছিল বাংলাদেশ। মূলত এখান থেকেই দুই দেশের সম্পর্কের দৃশ্যমান অবনতি শুরু।
রাজনৈতিক এই দূরত্বের প্রভাব খুব দ্রুতই পড়ে অর্থনীতিতে। ভারতনির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকতে শুরু করে ঢাকা। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে চাল আমদানির ঘোষণা দেয়। একই মাসে আলু ও পেঁয়াজ আমদানিতেও বিকল্প উৎস খোঁজার কথা জানায় ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন।
পরের বছর অর্থাৎ গত এপ্রিলে বাণিজ্যিক সম্পর্কে চরম উত্তেজনা ছড়ায়। ভারত আকস্মিকভাবে তাদের বন্দর ব্যবহার করে তৃতীয় দেশে বাংলাদেশের পণ্য পরিবহনের ‘ট্রান্সশিপমেন্ট’ সুবিধা বাতিল করে। এর জবাবে ১৫ এপ্রিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ভারত থেকে স্থলবন্দর দিয়ে সুতা, তৈরি পোশাকের কাঁচামাল, নিউজপ্রিন্ট, গুঁড়া দুধ, মোটর পার্টস, সিরামিকসসহ বেশ কিছু পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
এই রেষারেষির ধারাবাহিকতায় বিবৃতিতে কঠোর ভাষা ব্যবহার, ভিসা ও কনস্যুলার সেবা সীমিত করার পাশাপাশি সীমান্তে উত্তেজনা বাড়ে। এমনকি রাজনীতি ও অর্থনীতির এই উত্তাপ থেকে বাদ যায়নি ক্রীড়াঙ্গনও। আইপিএল থেকে বাংলাদেশের পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেয় ভারত; পাল্টা প্রতিবাদস্বরূপ ভারতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ বয়কট করে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল।