বিশ্বকাপ ক্রিকেটে এখন বুঁদ হয়ে আছেন অনেকেই। ছবি: সংগৃহীত

কোন খেলায় জিতলে বিশ্বের সবচেয়ে সুখি দেশ হওয়া যায়

কাকন রেজা
সিনিয়র সাংবাদিক ও কলাম লেখক
প্রকাশিত: ০৫ জুলাই ২০১৯, ২০:০০
আপডেট: ০৫ জুলাই ২০১৯, ২০:০০

খেলা কখনোই জীবনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না। এ কথাটা বোধহয় আমাদের বোঝানো যাবে না। সেদিন বাসে ফিরছিলাম বাসায়। পাশের সিটে দুজন। বাচ্চা বলা যাবে না, বাচ্চার বাপ। সেলফোনে ক্রিকেট খেলায় মগ্ন দুজনই। তাদের সমস্ত চিন্তা সন্নিবেশিত খেলাকে ঘিরে। বাংলাদেশের খেলা ছিল না, তবুও নিমগ্ন তারা। তাদের কথায় মনে হচ্ছিল, নিজেদের সমর্থিত দলটি হেরে গেলে নির্ঘাত বজ্রপাত হবে। এই নিমগ্নতার মধ্যেই পেছনের সিট থেকে, সম্ভবত তাদেরই একজন বলে উঠলেন, ‘ওই রিফাত হত্যার সাথে জড়িত আরেকজন অ্যারেস্ট হয়েছে’। সামনে যার হাতে সেলফোন, তিনি খেঁকিয়ে উঠলেন। ‘রাখ, ওইরকম “ইয়ে”র দুই চারটা রিফাত মরলে কিছু হইবো না, ব্যাটা খেলায় “অমুকে”র জিতন চাই।’

সদ্য নিজের ছেলে, মানে সাংবাদিক ইহসান ইবনে রেজা ফাগুন (ফাগুন রেজা) হত্যার বিচারের দাবিতে মানববন্ধন থেকে ফিরছি। রিফাতও ফাগুনের বয়সী, হয়তো ওর চেয়ে দু’চার বছরের বড় ছিল। তাই মন্তব্যটা শুনে মেজাজটাকে ধরে রাখতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল প্রশ্ন করি, আপনারও নিশ্চয়ই সন্তান রয়েছে, রিফাত যদি আপনার সন্তান হতো? নিজেকে সামলেছি। এই শ্রেণিটাকে বলে কী হবে। যাদের কেউ নিজেদের সমাজের মাথা মনে করেন। লেখক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক তারাই মেতে আছেন খেলায়। খেলার মাঝে কোথাও বড় কিছু ঘটলে, মান বাঁচাতে কি-বোর্ডে হাত রাখেন এবং যত দ্রুত সম্ভব কাজ সারেন।

অবশ্য ওই শ্রেণিটার সাথে এই শ্রেণিটার পার্থক্য হলো এই, ওরা না বুঝে করে, এরা করে বোঝে। এদের কাছে বাহ্যিকভাবে পৃথিবীর তাবৎ কিছুর চেয়ে খেলাটাই বড়। মূলত তাদের জীবনটাই খেলা। ছক্কার দানে পাওয়া জীবন। অর্থ-বিত্ত-বৈভব সব রয়েছে তাদের। বাচ্চারা পড়ে দেশের বাইরে কিংবা দেশের ‘পশ’ জায়গায়। তাদের লাইফে কোনো জটিলতা নেই। বাচ্চাদের বাসে ঝুলে, ট্রেনের ভিড়ে কোথাও যেতে হয় না। নিজ গাড়ি, বিমান, নিদেনপক্ষে ভ্রমণে ‘বিএমডব্লিউ’ বাস। সুতরাং তাদের তো খেলাই ফার্স্ট প্রায়োরিটি হবার কথা।

এসব কথাই বলছিলাম একজনের সাথে। তিনিও সাংবাদিকতা করেন এবং সততার পরীক্ষায় অনেক আগেই কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়েছেন। বললেন, ‘তুমি এদের নিয়ে মাথা ঘামাও কেন। এরা নিজেদের সমাজের মাথা ভাবলেও, এদেশের সমাজের আনুপাতিক কোনো অংশই নয় এরা। সমাজের মূল অংশ এদের দেখে বিরক্তি আর ঘৃণার চোখে। তারচেয়ে এই শ্রেণিটাকে প্রশ্ন করতে পারো, এই যে বাংলাদেশ হেরে গেল, তাতে কি বাংলাদেশের ওপর বজ্রপাত হয়েছে? ওলাউঠা দেখা দিয়েছে, না কি সারা দেশে ভূমিকম্পে ঘরবাড়ি ভেঙে পড়েছে? প্রশ্ন করো, বাংলাদেশ খেলায় জিতে গেলে কি হতো, দেশের দরিদ্র মানুষের তিনবেলা ঠিক ভাত জুটত, বস্তিতে বিনা চিকিৎসায় যে বাচ্চাটি কাতরাচ্ছে তার চিকিৎসা হতো, না রিফাতের মতো যারা কোপ খেয়ে মারা যাচ্ছে, তাদের মৃত্যুর মিছিল থামানো যেত? ফাগুন রেজাকে ফিরিয়ে দেওয়া যেত? না কি হাজার লাখ কোটি পাচারকৃত টাকা দেশে ফিরে আসতো?’

ওনার কোনো প্রশ্নের জবাব আমার কাছে ছিল না, কারো কাছেই নেই। থাকার কথা নয়। করপোরেট বিশ্বের চাল বোঝার ক্ষমতা সাধারণ মানুষের বেশির ভাগেরই নেই। আর যাদের কথা বলা হলো, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, লেখক, চিন্তক তাদের কতকও কর্পোরেট চেইনের অংশ। এদের বিবেক, বোধ, বুদ্ধি অনেক আগেই করপোরেট দুনিয়ায় বাঁধা। তাই এদের দুই চোখে ফাগুন বা রিফাতের পিতা-মাতার অশ্রু ভাসে না, ভাসে কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত, আর হৃদয়ে থাকে পাতায়া সি বিচ। বিবেক-বোধ-বুদ্ধি বন্ধক দেওয়া এমনদের জন্যই বোধহয় আল্লাহ তায়ালা সুরা ইয়াসিনের ১০ নম্বর আয়াতে বলেছেন, ‘তুমি ওদের সতর্ক করো বা না করো, ওদের পক্ষে উভয়ই সমান, ওরা বিশ্বাস করবে না’।

বিশ্বের সবচেয়ে সুখি দেশের তালিকায় এবারও শীর্ষে রয়েছে ফিনল্যান্ড। ফিনল্যান্ডের মানুষের সুখি হতে কিন্তু কোনো খেলায় চ্যাম্পিয়ন হতে হয়নি। কোনো যুদ্ধে জিততে হয়নি। নাগরিকদের আর্থিক সঙ্গতি, জীবনযাপনের স্বাধীনতা, কম দুর্নীতি, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা ও উদারতা—এসবের বিচারে সুখি দেশের তালিকা করেছে জাতিসংঘ। আর তাতেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ফিনল্যান্ড।

খেলার উন্মাদনা বাদ দিয়ে ভেবে দেখুন তো, জাতিসংঘের বিচারে এসবের কোন ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়ন আমরা। নিজেকে প্রশ্ন করুন তো, শুধু সামাজিক নিরাপত্তাই কতটা রয়েছে আমাদের? আর্থিক সঙ্গতি, জীবনযাপনের স্বাধীনতা, কম দুর্নীতি, স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রশ্ন না হয় বাদই রইল।

[প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রিয়.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কমের সম্পাদকীয় নীতির মিল না-ও থাকতে পারে।]

আরো পড়ুন