ছবি সংগৃহীত

চট্টগ্রামে সর্বনাশা মাদক, ক্ষমতাধরদের মদদপুষ্ট ৫০০ ব্যবসায়ী: নয়া দিগন্ত

priyo.com
লেখক
প্রকাশিত: ২১ জুন ২০১৫, ১৯:২৬
আপডেট: ২১ জুন ২০১৫, ১৯:২৬

(দৈনিক নয়া দিগন্ত, ওমর ফারুক) আলাউদ্দিন ওরফে আলো। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ও সিএ���পি এবং র‌্যাবের তালিকাভুক্ত শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী। নব্বইয়ের দশকে বাংলা মদ (চোলাই মদ) ও গাঁজা বিক্রি করতেন। এখন চট্টগ্রামে ইয়াবা, হেরোইন পাচারের অন্যতম শীর্ষ ব্যবসায়ী। চট্টগ্রামে মাদকবাণিজ্যের পুরো নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ কোরে আলো বর্তমানে কোটিপতি। তার রয়েছে বিলাসবহুল বাড়ি, গাড়ি, কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার ব্যাংক ব্যালান্স ও সম্পত্তি। প্রায়ই গ্রেফতার হলেও আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে এসে আবার জড়িয়ে পড়েন সর্বনাশা মাদক ব্যবসায়। চট্টগ্রাম নগরীর রবিশাল কলোনির রহিমা ছিলেন কাজের বুয়া। মাদক ব্যবসায়ী স্বামীর হাত ধরে মাদক ব্যবসায় আসেন ২০০৩ সালের দিকে। ১২ বছরের ব্যবধানে এখন তিনি কোটিপতি। তার সাথে রয়েছে প্রশাসনের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের সখ্য। চট্টগ্রাম নগরে মাদক ব্যবসায় জড়িত রয়েছে পাঁচ শতাধিক ব্যক্তি। তবে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের তালিকায় এ সংখ্যা ২৮৪। স্থানীয় থানা, আটক মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে এ তালিকা তৈরি করে পুলিশ। এ তালিকায় রয়েছে ৩৫ জন নারী। তারা ২৪৮টি জায়গায় মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। সিএমপি সূত্র ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, কোতোয়ালি থানার ৫৪টি জায়গায় মাদক ব্যবসা করছে ৯৬ জন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন মনির হোসেন, ছালামত উল্লাহ, ফারুক, মো: ইউছুফ, মোসলেম উদ্দিন, ইদু মিয়া, মনির, কামাল হোসেন, রহিমা, মিনু দাশ, বিমলা মালী, আলাউদ্দিন ওরফে আলো, স্বপন, পারভেজ ও ওয়াসিম। সরকারি দলের নেতাকর্মী, এমনকি জনপ্রতিনিধিদের প্রত্য বা পরো মদদে চলছে মাদকবাণিজ্য। সদরঘাট থানার চারটি জায়গায় মাদকবাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে শাহ আলম, বাবুল, তৈয়ব ও আজিজুল হক। শাহ আলম মাদক ব্যবসা করে গড়ে তুলেছেন বেশ কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। মাদকের হাট নামে পরিচিত বাকলিয়া থানা এলাকায় মাদক ব্যবসায়ীদের গডফাদার হিসেবে পুলিশের তালিকায় রয়েছে ২৪ জন। এরা হলো সেলিম ওরফে সোবাহান, বাবুল হোসেন, শানু, মমতাজ বেগম, জোসনা, সাজ্জাদ হোসেন, জসিমউদ্দিন প্রকাশ বার্মা জসিম, মতি, রিজিয়া ও মনু বড়–য়া। খুলশী থানার পাঁচ মাদক বিক্রেতা নিয়ন্ত্রণ করেন ২৬টি মাদকের স্থান। তারা হলেন ট্যাংকির পাহাড় এলাকার জুয়েল, সোহাগী, হাসিনার মা, রুমা ও সেলিমের বউ। তাদের নিয়ন্ত্রণে আরো ২৬ জন মাদক ব্যবসায়ী রয়েছেন। বায়েজিদ বোস্তামী থানার সাতজন মাদক ব্যবসায়ী নিয়ন্ত্রণ করে ১৩ মাদকের স্থান। এদের মধ্যে আবার পাঁচজন নারী মাদক ব্যবসায়ী। মূল মাদক ব্যবসায়ীরা হলেন, বাস্তুহারা বার্মা কলোনির জুলেখা, রেজিয়া প্রকাশ রাজিয়া, হোসেন প্রকাশ বুলু, রৌফাবাদ রেললাইন এলাকার শিল্পী, লিয়াকত ভাণ্ডারী, বিউটি ও বাংলাবাজার ডেবারপাড়ের রত্না। হালিশহর থানায় চার মাদক ব্যবসায়ী ১৪টি স্থানে মাদক বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করেন। এরা হলেন ছোটপুলের ডাইল করিম, মো: ইউসুফ, হাত কাটা আলী ও বড়পুলের ভাণ্ডারী। পাহাড়তলীর মাদকের বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন ১৪ জন মাদক ব্যবসায়ী। তারা হলেন সিগন্যাল কলোনির জাকির হোসেন, বাবুল, বেলাল, জহুরা, হাক্কানী পেট্রোলপাম্প এলাকার মো: রাজীব, রেললাইন গেট এলাকার নূরজাহান, আশরাফ আলী রোড, কাজীর দীঘির কাবের পারভীনের মা, পাটোয়ারি, আবুল বিড়ি ফ্যাক্টরি এলাকার আলী ভাণ্ডারী, মাটল্যা পাড়ার ইউসুফ, ডাইল নূর ও ডোলা পাড়ার ফরিদের বউ। ডবলমুরিং থানার ১০ জন মাদক ব্যবসায়ী নিয়ন্ত্রণ করে ২০ স্থানের মাদকের বাজার। তারা হলেন পাহাড়তলী বাজার ও ইউসেপ স্কুলের পাশে মণি, পাহাড়তলী রেলস্টেশনের দণি পাশে পাখির মা, এসআরবি বাংলা বাজারের বরিশাইল্ল্যা মিন্টু, আগ্রাবাদ জাম্বুরীর মাঠের ময়না, আগ্রাবাদ ডেবার পাড়ের শামীমা আক্তার, মগপুকুরপাড়ের পিচ্চি আলো, রনি ও জনি, আগ্রাবাদ চৌমুহনী, হালিশহর রোড ও জালাল কমিশনার বাড়ির আবু, পাহাড়তলী বাজারের ডাইল ইকবাল, কাশেম ড্রাইভার ও প্রগতি বেকারি, বড়ইতল এবং মাদারবাড়ির শাওন ও সোহেল। পুলিশের করা তালিকায় বন্দর থানার ছয়টি স্থানে মাদকের বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন তিনজন মাদক ব্যবসায়ী। তারা হলেন গোসাইল ডাঙ্গা ডাইল বিব্রজের পাশে ইকবাল ও জাহিদ। আকবর শাহ থানার ১৯টি স্থানে মাদক বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করেন ২২ জন। এর মধ্যে নিউ শহীদ লেন এলাকায় রয়েছে জমজমাট মাদকের হাট। সেখানকার মাদক ব্যবসায়ীরা হলেন, সেলিমের বাসার মো: শহীদ, বেগমের বাসার হাসেম, মিন্টুর বাসার রীনা আক্তার, পাখির বাসার পাখি আক্তার, দুলাল, কামাল হোসেন ও জামাল হোসেন নামের দুই সহোদর, বার্মানী, ফরিদের বউ জেসমিন আক্তার ও মো: জাফর। মিনারের পাশে ফিরোজশাহ এলাকায় আনোয়ার হোসেন, আফছার উদ্দিন, এক নম্বর মিলের পাশে জানু ভাণ্ডারী, নজির কমিশনার বাড়ির বশর, উত্তর কাট্টলীর বাবুল, লেদু, লিটন এবং পাক্কা রাস্তার মাথা, রেললাইনের ঘরে রাসেল। সিগন্যাল কলোনি রেললাইন গেটে কালা নজরুলের বউ ও ফাতেমা। নিউ শহীদ লেন, রওশন শাহ মাজারের সামনে আমীন, গার্লস স্কুলের সামনে ভেসপা সেলিম ও ডাইল সেলিম। ইপিজেড থানায় ১৫ জন ব্যবসায়ী নিয়ন্ত্রণ করেন মাদকের বাজার। তারা হলেন সিমেন্ট ক্রসিং মোড়ে ফারুকের ভাই আমজাদ, হাইটপাড়ার শফি ও দিদারের ভাই, বেড়িবাঁধ এলাকার দুলাল, ইপিজেডের ভেতরে মন্দিরের পাশে মনির, নয়ার হাটের রনি, মাইলের মাথার কোরবান, মাইলের মাথা সিঙ্গার শোরুমের নিচে জাহিদ, দারুস সালাম মসজিদের সামনে ল্যাংড়া মনির, নয়ারহাটের ইসলাম, কাসেম ও জুয়েল এবং ইপিজেড থানার পাশে খোকন ও বন্দর টিলার আক্কাস। সিএমপির তালিকায় পতেঙ্গা থানার মাদক ব্যবসায়ীরা হলেনÑ নেভাল কলোনির মো: টুনু, সি বিচ এলাকায় সুমন, বিজয় নগর এলাকার মো: জাফর, সোহরাব, ১৪ নম্বর এলাকার লালুনী, নিজাম মার্কেটের জামাল হোসেন ও ইসলাম কমিশনারের বাড়ির পাশে ও মাজার গলিতে মো: রাজু। কর্ণফুলী থানায় সাতজন মাদক ব্যবসায়ী নিয়ন্ত্রণ করেন দশটি মাদকের স্থান। তারা হলেনÑ ইয়ামিন চরল্যা ও চেয়ারম্যান বাড়ির কানা সাবের, কর্ণফুলী গার্ডেন, শিকলবাহা এলাকার মুজিব, চরল্যা বলিরগোষ্ঠী বাড়ির নজরুল ও তার স্ত্রী, পিয়ার আহমদ দাগী, শুক্কুর, খোরশেদ আলম ও ইছানগর এলাকায় দিলু। এ ছাড়া বরিশাল কলোনীর রহিমা বেগম, সুমা আক্তার, আরজু, ডবলমুরিং থানার শামীমা আক্তার, বহদ্দরহাটের পারভীন,খুলশীর নুর জাহান, কদমতলীর ননী ও লায়লা নগরের শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী। তারা ভারত-মিয়ানমার থেকে আসা ফেনসিডিল, ইয়াবা ও হেরোইনের চালানগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। কয়েক বছরের ব্যবধানে তারা মাদকবাণিজ্য করে বিলাসবহুল বাড়ি, গাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ অসংখ্য সম্পদের মালিক। তাদের অনেকের সন্তান পড়া লেখা করছে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে। তারা গডফাদার হিসেবে থেকে বর্তমানে উঠতি তরুণ-তরুণীদের দিয়ে মাদকবাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। মাদকব্যবসায় ব্যবহার করছেন সুন্দরী নারী ও দামি গাড়ি। মাঝে মধ্যে দুই একটা মাদকের চালান ধরা পড়লেও অধরা থেকে যাচ্ছেন এসব গডফাদার। এসব মাদক ব্যবসায়ীর সঙ্গে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর একশ্রেণীর কর্মকর্তাদের রয়েছে সখ্য। অভিযোগ উঠেছে, মতাধর ব্যক্তি ও সরকারি দলের লোকজনের মদদে এসব মাদক ব্যবসায়ী মাদকবাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। যার কারণে অনেক সময় প্রশাসনও মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেফতারে সাহস পাচ্ছে না। মাদক ব্যবসায়ী ও তাদের গডফাদারদের গ্রেফতার প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর চট্টগ্রাম উপ অঞ্চল উপপরিচালক মো: আলী আসলাম হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে অভিযান পরিচালিত করে গত ৫ মাসে (জানুয়ারি-মে) ২৮৬ জন মাদক ব্যবসায়ী ও ব্যবসায় জড়িত এবং মাদকসেবীকে গ্রেফতার করতে সম হয়েছি। তিনি বলেন, আগে নির্দিষ্ট স্থান থেকে মাদক বেচাকেনা হলেও এখন অপরাধীরা কৌশল পাল্টে মোবাইলে যোগাযোগের মাধ্যমে মাদক বিক্রি করছেন। এ কারণে তাদের গ্রেফতার করা অনেকটা কঠিন হয়ে পড়েছে। সৌজন্যে: দৈনিক নয়া দিগন্ত