কাঠুয়ায় শিশু আসিফাকে ধর্ষণের প্রতিবাদ ও দোষীদের বিচারের দাবি জানানো হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

ভালো-মন্দের উল্টো পিঠে

কাকন রেজা
সিনিয়র সাংবাদিক ও কলাম লেখক
প্রকাশিত: ২২ এপ্রিল ২০১৮, ২০:০১
আপডেট: ২২ এপ্রিল ২০১৮, ২০:০১

ভারতে সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে আমার একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছিল ‘প্রিয়.কমে’। ‘বিভেদ আর বৈষম্যের সংঘাত ছড়িয়ে পড়ছে দক্ষিণ এশিয়ায়’ শিরোনামে লেখাটির মধ্যে কয়েকটি ঘটনার রেফারেন্স ছিল। সাম্প্রদায়িকতা যে শুধু ধর্মভিত্তিক নয়, ধর্ম সাম্প্রদায়িকতার একটি অংশমাত্র, এমনটাই বুঝাতে চেয়েছিলাম ওই লেখায়। আর দক্ষিণ এশিয়ায় বহুমাত্রিক সাম্প্রদায়িকতার নজির হিসেবে ভারতের কিছু উদাহরণ উল্লেখ করা হয়েছিল তাতে। এজন্য অনেকেই আমার ওপর নাখোশ হয়েছেন। 

জানি, ভারতের মতো একটি বিশাল দেশ, একসময় যার সাথে যুক্ত ছিল বাংলাদেশ, পাকিস্তান; এমন দেশের বিষয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সহজ কাজ নয়। কিন্তু তারপরেও দক্ষিণ এশিয়ার ক্রমবর্ধমান সংঘাত সম্পর্কে আলোকপাতের ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা ছিল আমার লেখাটিতে। বিষয়টি না মেনে দুই-একজন মুখ ফুটে বিরক্তি ও বিস্ময়ের যুগপত প্রকাশ্যে বলেই ফেলেছেন, ভারতের কী ভালো কোনো দিক নেই! উত্তরে বিন্দুমাত্র সময় ক্ষেপণ না করে বলেছি, আছে। ভারতের সবচেয়ে ভালো দিক হলো রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সহিষ্ণুতা। সমালোচনা সয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে অসম্ভব রকম সহ্য ক্ষমতার পরিচয় দেন ভারতের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ।

‘হাসপাতালের বেডে টিবি রোগীর সাথে খেলা করে শুয়োরের বাচ্চা, সারা জাহাছে আচ্ছা’ প্রকাশ্যে মঞ্চে, টিভিতে এমন গান গাইতে পারার সাহস ভারতের শিল্পীদের আছে। নচিকেতা গাইছেন সবখানে। ‘হাল্লা বল’ বিষয়ক রাজনৈতিক গানে নচিকেতা রিজার্ভ চুরি, ব্যাংকের টাকা লোপাট এবং তা সুইস ব্যাংকে জমা রাখা সম্পর্কে বলছেন, ‘কয় হাজার কোটি টাকা রাজকোষ থেকে হচ্ছে ফাঁকা, করছে কে চুরি জানার সবার আছে অধিকার- নইলে কীসের সংবিধানের বাতেলা হাল্লা বল’। এখানেই ক্ষান্ত দেননি তিনি রাজনীতিকদের রীতিমতো গালি দিয়ে বলেছেন, ‘নিপাত যাক রাজনীতিক মন্ত্রী সব গণ্ডগোল, সব শুয়োরের বাচ্চারাই করাপ্টেড, দেশটা পিজরা বল’। তারপরেও কিন্তু নচিকেতা বহাল তবিয়তে আছেন, গান গাইছেন এবং রাজনৈতিক গানও। সম্প্রতি একটি গানে তিনি বলেন, ‘ভোট দিয়ে জনগণ আমাদের এনেছিল ক্ষমতায়, ভাইয়েরা খাচ্ছে অক্ষের টাকা, তাইতো কী মমতায়/ উড়াল পুলের সাবকন্ট্রাক্ট পার্টির ছেলেই খাবে, সেতু ভেঙ্গে কেউ মরলে না হয় পাঁচ লাখ পেয়ে যাবে।’ যদি রাজনৈতিক সহিষ্ণুতা না থাকতো, তাহলে কি গানে এমন কথা বলতে পারতেন নচিকেতা!

শুধু নচিকেতা কেন, গাইছেন কবির সুমন। এমনকি হালের কলকাতার রক ক্রেইজ রূপম ইসলামও গাইছেন। ছাত্রদের সাথে সংহতি জানিয়ে রূপম গানে বলছেন, ‘ছাত্রেরা বাকস্বাধীনতা চায়, ওরা হাঁটে যুক্তির রাস্তায়, সেই সড়কে অগাধ বিশ্বাস, আমারা তাই সংহতি জানাই’। সাথে বলছেন, ‘তুমি লেঠেল পাঠালে প্রশাসক, তুমি বশ্যতা চাও বিরোধীর/ জেনে নাও সবাই নয় স্তাবক, ওরা আগুন নতুন পঙতির’।

শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, ভারতজুড়েই গান-কবিতা-গদ্যে উঠে আসছে প্রতিবাদ। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন সচেতন মানুষ। পশ্চিমবঙ্গের কবি শ্রীজাত কবিতা লিখে একটু বেকায়দায় পড়লেও প্রতিবাদ প্রতিরোধে তিনি নির্বিঘ্নে বের হয়ে এসেছিলেন সাময়িক বেকায়দার জাল থেকে। সাথে যথারীতি প্রতিবাদ চালিয়ে গেছেন কবিতায়। আরও বেশি জোরালো হয়েছে তার প্রতিবাদের ভাষা। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে গায়ক কবির সুমনও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। বর্ধমানে অন্ধ মুসলিম ভিখারি যুগলের প্রতি নির্মমতায় গানে নয়, ফেসবুকে সরাসরি বলেছেন, ‘এক অন্ধ মুসলমান ভিখারির সঙ্গে এটা করলে- এই হলো তোমাদের বীরত্বের দৌড়। আমিও মুসলমান। আমার সঙ্গে একবার চেষ্টা করে দেখবে নাকি? আদাব, সক্কলে। খোদা হাফেজ।’ রাজনৈতিক সহিষ্ণুতা না থাকলে কী এটা সম্ভব হতো। এমনকি তিনি গানও গাইলেন, ‘১৬ বছরের ছেলেটাকে খুন করলে কজনে মিলে/ মুসলিম বলে এতটা ঘেন্না কটা বুকে রেখেছিলে? ইমাম ইমদাদুল্লাহ রশিদি ভারতের সম্মান/ তার নামে হাত ধরাধরি করো হিন্দু-মুসলমান।’

এগুলো সবই রাজনৈতিক সহিষ্ণুতার ফল। ভারতে যে প্রবল সাম্প্রদায়িকতা বুকে পুষে রাখা হয়, তার পুরোটার যদি প্রকাশ ঘটত, তাহলে ভারত এতদিন নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত। হতে পারেনি শুধু রাজনৈতিক সহিষ্ণুতার কারণে। তবে সাম্প্রতিককালে রাজনৈতিক কারণে ধর্ম ব্যবহারের বিষয়টি ক্রমেই প্রশ্ন হয়ে উঠে আসছে, সাথে বাড়ছে অসহিষ্ণুতা আর তাণ্ডব। তারপরেও লক্ষণীয় যে, অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর মানুষ আছেন। কবির সুমন, নচিকেতা, রূপম আর কবি শ্রীজাতের মতো অনেক মানুষই প্রতিবাদ করছেন। সমাজের সুশীল অংশ আদর্শ আর উদ্দেশ্যের বাইরে মানবতার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন নির্বিশেষে। সবচেয়ে বড় দিক হলো, তারা কথা বলতে পারছেন এবং তার জন্য রাষ্ট্র প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াচ্ছে না।  

শুধু সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতাও নয়, রাজনৈতিক বিচ্যুতির বিরুদ্ধেও তাদের প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছেন এমন মানুষজন। কলকাতার খ্যাত ব্যান্ডদল ‘চন্দ্রবিন্দু’র ‘গীতগোবিন্দ’ শিরোনামে একটি ব্যাঙ্গাত্মক গান রয়েছে। গানটি বিগত বামফ্রন্ট সরকারের সময় সৃষ্ট। সে গানের একটি লাইনে প্রেমিকাকে উদ্দেশ্যে করে বলা হয়েছে, ‘তুমিই আমার সিপিএম, তুমিই আমার এটিএম’ এমন একটি কথা। এটিএম বুথের সাথে তারা তুলনা করেছেন বামদল সিপিএমের, বোঝেন অবস্থা। তবে এতে কিন্তু তৎকালীন সিপিএম সরকার এই গানের দলটিকে নিষিদ্ধ কিংবা এই দলের কাউকে জেলে পুরেননি। এটাও রাজনৈতিক সহিষ্ণুতা।

মমতা ব্যানার্জিকে নিয়ে কত ব্যাঙ্গাত্মক কবিতা-গান রচিত হচ্ছে, গাওয়া হচ্ছে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী মোদিকে নিয়ে লেখা হচ্ছে, বলা হচ্ছে। সাংবাদিকরা হাত খুলে লিখছেন, গায়করা গান গাচ্ছেন, রম্য কবিতা রচিত হচ্ছে এবং এর সবই প্রায় ‘মোদিজি’ এবং তার সরকারের বিরুদ্ধে। কার্টুনিস্টরা মোদির কার্টুন আঁকছেন, ছবি বিকৃত করে ব্যাঙ্গ ‘ক্যাপশন’ দেওয়া হচ্ছে। কই এসব কারণে তো কাউকেই রাষ্ট্র বা সরকারদ্রোহিতার দায়ে জেলে যেতে হচ্ছে না, কেউই নিরুদ্দেশ যাত্রার যাত্রী হচ্ছেন না। নিদেনপক্ষে ভয় পেতে হচ্ছে না।

এমন রাজনৈতিক সহিষ্ণুতার ফলেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখিত হচ্ছে ভারত। গড়ে উঠেছে স্বাধীন নির্বাচন কমিশন। এ কারণেই নির্বাচনী আইনভাঙ্গায় ছাড় পাননি সোনিয়া তনয় রাহুল গান্ধীও। রাজনৈতিক সহিষ্ণুতার কারণেই এটা সম্ভব। ‘ইনকাম ট্যাক্স রেইড’ ভারতে একটি ভীতির নাম। ভারতীয় সিনেমাভক্তদের বিষয়টি জানার কথা। বিশেষ করে ক্ষমতাসীনদের ওপর নজর থাকে ইনকাম ট্যাক্স বিভাগের। বিরোধীদের হেনস্থায় ব্যবহার করা হয় না এই বিভাগটিকে। কালোটাকার সব মালিকরাই ভয়ে থাকেন ইনকাম ট্যাক্স রেইডের। রাজনৈতিক সহিষ্ণুতার কারণেই এমন স্বাধীন কর বিভাগ গড়ে উঠা সম্ভব হয়েছে। যে বিভাগের কাছে ক্ষমতার প্রবল প্রভাবও কোনো কাজে আসে না।

ভারতের ভালো দিকের কথা আর কী বলব। যারা সাম্প্রদায়িকতা বিষয়ে ভারতের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি উল্লেখ করায় আমার ওপর ‘নাখোশ’ হয়েছিলেন, আশা করি তারা এবার ‘দিলখোশ’ হয়েছেন। অবশ্য আমি সব সময় এমন মানুষদের নাখোশ-দিলখোশ নিয়ে বিভ্রান্তিতে থাকি। কারণ তাদের ‘খোশ’-এর ধরণ আমার ঠিক ঠাউরে আসে না। তারা কীসে খুশি আর কোনটায় বিরক্ত, তা আল্লা মালুম।

পুনশ্চ: আসিফার কথা বলি। কাশ্মীরের কাঠুয়া জেলার বাচ্চা মেয়েটির কথা। তার ওপর নির্মমতা সকল সীমা অতিক্রম করেছে। মারা যাবার পরেও রেহাই পায়নি সে। বিচারেও সৃষ্টি করা হয়েছে বাধা। একদল রীতিমত তাণ্ডব করেছে অপরাধীদের পক্ষে। এমন লোক সবদেশেই পাওয়া যায়। কিন্তু তার বিপরীত চিত্রও রয়েছে। ভারতের মানবতাবাদী মানুষ বালিতে মুখ গুজে থাকেননি। ‍পুলিশ সঠিক চার্জশিট দিয়েছে, সেখানে পুলিশের লোকও যে দায়ী, তাও বলা হয়েছে। মুসলমান নন, এমন একজন মহিলা আইনজীবী লড়ছেন আসিফার জন্য। সেই আইনজীবীকে ধর্ষণ ও হত্যার হুমকি দেওয়ার পরও দমে যাননি। ছাত্ররা এগিয়ে এসেছে, শিক্ষকরাও। এমনকি বিজেপির লোকজনও বুঝতে শুরু করেছে তাদের ভুলটা। স্বার্থান্ধতা, নিষ্ঠুরতা, অন্ধ আনুগত্য, তোষামোদ আর লোভের বিপরীতে আসিফার জন্যে দাঁড়ানো মানুষগুলো দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি উদাহরণ। 

ফুটনোট: এ লেখাটা শেষ করার মুহূ্র্ত থেকেই ‘কাকের কাছে ডাস্টবিনই স্বর্গ’- এমন একটি কথা মাথায় ঢুকে ঘুরপাক খাচ্ছে। হুমায়ূনীয় ভাষায়, অনেকটা ঘুনপোকার মতন।

[প্রকাশিত লেখা ও মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রিয়.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কমের সম্পাদকীয় নীতির মিল না-ও থাকতে পারে।]