মওলানা ভাসানীর ফারাক্কা লং মার্চ ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
আমাদের নদী, কৃষি ও জনজীবনের অস্তিত্ব রক্ষার আন্দোলনের ইতিহাসে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ফারাক্কা লং মার্চ এক অনন্য অধ্যায়। ১৯৭৬ সালে ভারতের ফারাক্কা বাঁধের কারণে গঙ্গার পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নদী শুকিয়ে যাওয়া, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, কৃষিসংকট ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দেয়।
এই প্রেক্ষাপটে মওলানা ভাসানী রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে জনগণের অধিকার ও নদীর ন্যায্য হিস্যার দাবিতে ঐতিহাসিক ফারাক্কা লং মার্চের ডাক দেন। তাঁর নেতৃত্বে হাজারো মানুষ সীমান্তমুখী এই পদযাত্রায় অংশ নেয়, যা ছিল নদী ও জীবনের প্রশ্নে বাঙালির আত্মমর্যাদার প্রতীক। আজ কয়েক দশক পরও বাংলাদেশের বহু নদীর নাব্যতা সংকট, পানির স্বল্পতা ও আন্ত সীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনার জটিলতা আমাদের নতুন করে সেই লং মার্চের প্রাসঙ্গিকতা স্মরণ করিয়ে দেয়। তাই বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে পরিবর্তিত রাষ্ট্রীয় মতাদর্শের চিন্তা ও ভূ-রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে নতুন বাস্তবতার নিরিখে নতুন করে সম্পর্ক অনুধাবন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে মনে হয়।
বাংলাদেশের মানুষ বহু যুগ আগে থেকে ভারতের পানি আগ্রাসনের শিকার। ভারত আন্তর্জাতিক গঙ্গা নদীতে বাঁধ নির্মাণ করে ভাটির দেশ বাংলাদেশকে বেশি হুমকির সম্মুখীন করে তুলেছিল, যা অদ্যাবধি একইরূপ পরিগ্রহ করে আছে। ফারাক্কায় বাঁধ নির্মাণের শুরু থেকে মওলানা ভাসানি এর প্রতিবাদে সোচ্চার ছিলেন। ১৯৫২ সালে ভারত ফারাক্কায় বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে তৎপরতা শুরু হলে তৎকালীন সরকার এর প্রতিবাদ করে।
তখন ভারত বলেছিল এটা অনুসন্ধান পর্যায়ে আছে। এ নিয়ে ১৯৬০ সালে এ বিষয়ে ভারত-পাকিস্তান বৈঠক হয়। তবে ১৯৬১-৬২ সালে ভারত গোপনে বাঁধ নির্মাণকাজ শুরু করে। এ কাজে সহায়তাকারী দেশ সোভিয়েত রাশিয়া এবং খরচ ধরা হয় এক বিলিয়ন ডলার। ফিডার খাল খননের কাজ ব্যতিরেকে ১৯৭০ সালে ফারাক্কা ব্যারাজের নির্মাণকাজ শেষ করে ভারত এবং পশ্চিমবঙ্গের মালদহ ও মুর্শিদাবাদ জেলাকে সংযুক্ত করা দুই হাজার ২৪০ মিটার দীর্ঘ ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মিত হয়ে চালু হওয়ার অপেক্ষায় থাকে।
বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর ভারত ফারাক্কার সংযোগ খালের কাজ দ্রুতগতিতে সম্পন্ন করে। ১৯৭৪ সালে পরীক্ষামূলকভাবে ফারাক্কা ব্যারাজ চালু করার ঘোষণা দেওয়া হয়। এরপর নানা কৌশলে ২১ এপ্রিল থেকে ৪১ দিনের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে ফারাক্কা ব্যারাজ চালু করা হয়। যেটি আর বন্ধ হয়নি, আজ প্রায় ৪৮ বছর পেরিয়ে গেলেও সেটা পরীক্ষামূলকভাবে চালুই রয়ে গেছে।
মওলানা ভাসানী ফারাক্কা ব্যারাজ চালু হওয়ার পর থেকে পদ্মায় একতরফা পানি প্রত্যাহারের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলেন। বাংলাদেশের কৃষি, জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ সবকিছুর ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া ঠেকানোর জন্য ছিল তাঁর এই আন্দোলন। ভারত প্রতিবছর ফারাক্কা ব্যারাজ দিয়ে বর্ষার অতিরিক্ত পানি আটকাতে না পেরে সব গেট খুলে দিলে বাংলাদেশের জীবনরেখা পদ্মা নদীতে বর্ষায় ভয়াল রূপ, বন্যা ও নদীভাঙন দেখা দেয়। খরায় গেট বন্ধ করে সামান্য জলধারা ছেড়ে দিলেও শীর্ণ-শুষ্ক নদীর কারণে জীবিকা হারানো দরিদ্র মানুষের দুঃখ-দুর্দশা মওলানা ভাসানির হৃদয়ে দোলা দিতে শুরু করে।
এ অবস্থায় ১৯৭৬ সালের ১৮ এপ্রিল মওলানা ভাসানী ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে একটি পত্র লিখেন। তিনি ফারাক্কার বিরূপ প্রতিক্রিয়া বর্ণনা করে ‘ফারাক্কা লং মার্চ’ কর্মসূচির বিষয়ে অবহিত করেন। সেই চিঠির উত্তরে ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন, এটা ভাবতে কষ্ট হচ্ছে, যিনি আমাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন এবং পরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও আত্মত্যাগের বেদনাকে একইভাবে সহমর্মিতা দিয়ে দেখেছেন, তিনি আমাদের এত বেশি ভুল বুঝেছেন এমনকি আমাদের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। (বিবিসি বাংলা নিউজ, মে ১৭ ২০১৫)।
এ বিষয়ে মওলানা ভাসানীর প্রত্যুত্তর ছিল, আপনার ৪ মের পত্র ফারাক্কার ওপর সরকারি ভাষ্যেরই পুনরাবৃত্তি। সুবিখ্যাত পূর্বপুরুষ মতিলাল নেহরুর দৌহিত্রী ও পণ্ডিত জওয়াহেরলাল নেহরুর কন্যার কাছ থেকে এরূপ প্রত্যাশা ছিল না। এভাবে সময় গড়িয়ে গেলেও প্রকৃত সমস্যা আড়ালে থেকে যায়। যার প্রতিক্রিয়ার প্রতিফলন ঘটে ১৯৭৬ সালের ১৬ মে ফারাক্কা অভিমুখে লং মার্চ কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে। মওলানা ভাসানীর দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এক ঘটনার জন্ম দেয় এই লং মার্চ। এই লং মার্চ কর্মসূচির রুট ছিল পদ্মাতীরের বিভাগীয় নগর রাজশাহীর মাদরাসা ময়দান থেকে ১৬ মে সকাল ১০টায় দীর্ঘ পদযাত্রা শুরু করে প্রেমতলী হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পেরিয়ে কানসাট সীমান্ত দিয়ে ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার ফারাক্কা ব্যারাজ এলাকার পয়েন্ট। রাজশাহীর মাদরাসা ময়দানে বিশাল জনসভায় বক্তব্য দিয়ে তিনি এই যাত্রা শুরু করেন। এ সময় ৯০ বছর বয়সী বর্ষীয়ান নেতা মওলানা ভাসানী বেশ অসুস্থ ছিলেন।