ছবি সংগৃহীত

বিদ্রোহী কবির নির্বাক বছরগুলো (১৯৪২-১৯৭৬)

জুলকারনাইন মেহেদী
লেখক
প্রকাশিত: ২৭ আগস্ট ২০১৩, ১২:৫১
আপডেট: ২৭ আগস্ট ২০১৩, ১২:৫১

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) আকস্মিকভাবে বাকরুদ্ধ হন ১৯৪২ সালের ১০ জুলাই। অসুস্থ নজরুলকে বিশ্রাম ও চিকিৎসার জন্য ১৯৪২ সালের ২০ জুলাই নাগাদ বিহার প্রদেশের মধুপুরে নিয়ে যাওয়া হয়, কিন্তু সেখানে উন্নতির কোনো লক্ষণ দেখা যায় নি। পরে ৬৪ দিন পরে নজরুল পরিবারসহ কলকাতায় নিজ গৃহে ফিরে আসেন। ‘সওগাত’ সম্পাদক নাসির উদ্দীন তার আত্মকথায় নজরুলের অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে বলেছেন,যে ভদ্রলোক নজরুলের অসুস্থতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ এই কথাগুলো বলেছেন তিনি হলেন এই উপমহাদেশের চিকিৎসাশাস্ত্রের এক অত্যন্ত পরিচিত ব্যক্তিত্ব, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নিউরো সার্জন ড. অশোক কুমার বাগচী। ইনি সর্বপ্রথম নজরুলের অসুস্থ জীবন সম্পর্কে চিকিৎসা বিজ্ঞানের আলোকে নজরুলের কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দাখিল করেছেন। যে কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে এবং বেশ একটা বড় সময় যিনি নজরুল পরিবারের সান্নিধ্যে ছিলেন।

কিন্তু নজরুলের অসুস্থ জীবনের গোড়ার কথা সম্পর্কে ড. আশোকবাগচী যে কথা বলেছেন তা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। ড. বাগচীর অসুস্থ নজরুল সম্পর্কের কথা এখানে তার ভাষায় হুবহু তুলে ধরা হলো। ‘‘নজরুলের অসুস্থতার লক্ষণ যখন প্রথম প্রকাশ পায় তখন বিষয়টিকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়া হয় নাই। বিশেষ করে তার স্ত্রী প্রমিলা নজরুল যখন অসুস্থ হয়ে পড়েন (১৯৩৭) তখন দেখা যায় নজরুল হঠাৎ ‘কালী সাধনা' শুরু করেছেন। অনেকেই এটাকে ধরে নেন তার মানসিক বৈকল্য হিসাবে। গেরুয়া পোশাক আর মাথায় গেরুয়া টুপি ছিল তার তখনকার পরিধেয় বস্ত্র।সেই সময় তিনি মাঝে মাঝে গ্রামোফোন কোম্পানিতে গান গাওয়ার সময় একটু আধটু বেসুরো হতে থাকেন। অবশ্য ধরিয়ে দিলে ভুল বোঝেন এবং সংশোধনের চেষ্টাও করেন। কিন্তু পুরোপুরি অসুস্থ হবার পর (১৯৪২) তিনি সব কিছুর বাইরে চলে যান। কোনো কিছুই আর ঠিকমত ধরে রাখতে পারেন না। এরূপ লক্ষণ তার সে সময় প্রকাশ পায়। “ড. অশোক বাগচী আরো বলেছেন, বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম অসুস্থ ও বাকশক্তি রুদ্ধ হবার পর হতে কোনো চশমাধারী লোককে কখনই সহ্য করতে পারতেন না।চমশাধারী লোক তার সম্মুখে উপস্থিত হলে তৎক্ষণাৎ উত্তেজিত ও অস্বস্তি বোধ করতেন। ড. অশোক বাগচীর ধারণা নিশ্চয়ই কোনো চশমাধারী লোকই সে সময় তার বড় ধরনের ক্ষতি করে দিয়েছিল। যা তার মস্তিষ্কের মধ্যে স্থায়ীভাবে দাগ কেটে দেয়। ড. বাগচী নজরুলের অসুস্থতার অন্য সমস্ত কারণকে অস্বীকার করে একথা বলেছেন যে, কবির ‘স্নায়ুবিক বৈকল্য' সম্পর্কে ডা. বিধান চন্দ্র রায়ের চিকিৎসার মতামতটাই যথার্থ ছিলো বলে তিনি মনে করেন। তখন তাকে ভারতের রাচী ও বিহারের মধুপুরে পাঠানো এবং অন্যান্য মানসিক চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রয়োগ তার অসুস্থতাকে বাড়তেই সাহায্য করেছে বলে তিনি মনে করেন।
ড. বাগচী জন্মগ্রহণ করেন আমাদের উত্তরবঙ্গের এই রংপুর জেলায় ১৯২৫ সালে। তিনি আমাদের এই উত্তরবঙ্গের কৃতী সন্তান। যিনি সে সময়ে নজরুলের চিকিৎসার পথ প্রদর্শক ছিলেন। ১৯৪৮ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে ডাক্তারী পাস করেন। সবকটি বিষয়ে প্রথম। ৫টি বিষয়ে অনার্স। ১৯টি মেডেল এবং ডাক্তারীতে স্কলারশীপ নিয়ে লেখাপড়া শেষ করে নিউরো সার্জারী পড়ার জন্য অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় যান। ভিয়েনায় অসাধারণ রেজাল্ট করে ১৯৫২ সালে মাস্টারশীপ পাস করেন। এ জন্য তাকে ভিয়েনায় দেখা হয় ‘ম্যাগনা কাম লাউডে সার্টিফিকেট"।অচিরেই তিনি জগৎবিখ্যাত নিউরোসার্জন হয়ে ওঠেন। এই সময়ে ১৯৫২ইং সালেই তিনি কলকাতায় অকস্মাৎ প্রত্যাবর্তন করেন এবং নিবিড়ভাবে কবি পরিবারের সাহচর্যে আসেন। এর এক বছর পরই ১৯৫৩ সালে তিনি বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামকে চিকিৎসার জন্য ভিয়েনায় নিয়ে যান। নজরুলের মস্তিষ্কের প্রথম আধুনিক পরীক্ষা করানোর ব্যাপারে তার উদ্যোগ ছিল সবচেয়ে বেশি। সেই ১৯৫৩ সালে ভিয়েনার যে বিশ্ববিখ্যাত চিকিৎসকবৃন্দ যৌথভাবে নজরুলের মস্তিষ্ক পরীক্ষা করেছিলেন তাদের মধ্যে ছিলেন ভিয়েনার বিখ্যাত নিউরোলজিস্ট স্যার রাশেল ব্রেইন, নিউরো সার্জন ড. ওয়েলি ম্যাকিসক এবং বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী ড. উইলিয়াম সার্জেন্ট। ড. অশোক বাগচীও ছিলেন যৌথভাবে তাদের সঙ্গে। ঐ পরীক্ষাতেই ধরা পড়ে নজরুলের ব্যাধি মানসিক বৈকল্য নয়। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে ১৯৪২ সালের ১০ জুলাই নজরুল প্রথম বাকশক্তি হারান। এরপর থেকে তার যত রকমের চিকিৎসা করা হয়েছে সব চিকিৎসাই ছিল ভুল ও ব্যর্থ। একমাত্র ডা. বিধান চন্দ্র রায়ই আশঙ্কা করেছিলেন নজরুল ‘স্নায়ু বৈকল্যে' আক্রান্ত হয়েছেন যার অনিবার্য পরিণতি হচ্ছে আল-ঝেইমার্স। কিন্তু নজরুলের জন্য সে সময় গঠিত মেডিকেল বোর্ড ডা. বিধান চন্দ্রের সুপারিশ কোনোক্রমেই গ্রহণ করেন নি। ড. অশোক বাগচীর মতে ১৯৩৯ সালে নজরুলের মধ্যে যখন প্রাথমিকভাবে এই রোগের লক্ষণ ধরা পড়ে তখন সেই সময়ে যদি তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসার সুব্যবস্থা গ্রহণ করা হতো তাহলে নজরুলের সম্ভবত এই করুণ পরিণতি হতো না। ভিয়েনার ডাক্তারগণ যৌথভাবে মত প্রকাশ করেন নজরুলের চিকিৎসার আর সময় নেই। অনেক বিলম্ব হয়ে গেছে।
১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কবি নজরুলের কবিতা কিংবা গান ছিল বিজয়ের অগ্নিমন্ত্র। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র সিদ্ধান্ত নেয় কইবির জন্মদিনে বিশেষ অনুষ্ঠান আয়োজন করার। অনুষ্ঠান শুরু হয় নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর বিখ্যাত উক্তি দিয়ে। ১৯২৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর কলকাতার এলবার্ট হলে কবিকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, “যখন আমরা যুদ্ধে যাবো, তখন আমরা নজরুলের গান গাইবো। আবার যখন আমরা কারাগারে থাকবো তখনো আমরা নজরুলের গান গাইবো।“ ২৫ মে, ১৯৭১, কবির জন্মদিন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র সেদিন কবিকে নিয়ে ১২০ মিনিটের অনুষ্ঠান আয়োজন করলো। বঙ্গবন্ধুর জ্বালাময়ী ভাষণা আর বরেণ্য সাংবাদিক এম আর আখতার খান মুকুলের ‘চরমপত্র’ এর সাথে সেদিন ‘জাগরণী’ নামে সঙ্গীত অনুষ্ঠানে কবির প্রথম রেকর্ড করা গান বাজানো হয়। গানটি ছিল কবির বিখ্যাত গান, “দুর্গম গিরি কান্তার মরু,...যে গান হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা আর দেশপ্রেমে উজ্জীবিত সাধারণ বাঙ্গালীদের অনুপ্রাণিত করে। কবি ছিলেন বাকরুদ্ধ। কিন্তু তাঁর গানের শক্তিতে ভীত হয়ে পাকিস্তান সরকার তাঁর জন্য বরাদ্দকৃত ভাতা বাতিল করে দেয়। কবি সেসময় ছিলেন চরমভাবে অসুস্থ। পাকিস্তান সরকারের এহেন অমানবিক কর্মকান্ডে সমালোচনার ঝড় ওঠে। অস্থায়ী মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ নিজে উদ্যোগী হয়ে কবির জন্য সমপরিমাণ ভাতার ব্যবস্থা করে দেন। পুরো যুদ্ধের সময়টা জুড়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে কবির লেখা গান বাজানো হত দেশবাসীকে উজ্জীবিত করার জন্য। দেশ স্বাধীন হবার পর বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে আসলেন। যুদ্ধ-বিধ্বস্থ দেশ গড়ে তোলার পাশাপাশি তাঁর মন্ত্রীসভা সিদ্ধান্ত নেয় দেশের জন্য একটি পতাকা, জাতীয় প্রতীকসমূহ, জাতীয় সংগীত ও জাতীয় কবি নির্ধারণ করার। বঙ্গবন্ধুর নিজের ইচ্ছা ও মন্ত্রীসভার সম্মিলিত মতামতের ভিত্তিতে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশের ‘ জাতীয় কবি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় হয়। এছাড়া তাঁর ‘চল চল চল, উর্ধ্ব গগণে বাজে মাদল...” গানটিকে বাংলাদেশের রণ সংগীত হিসেবে গ্রহণ করা হয়। কবি তখনো ছিলেন ভারতে। বঙ্গবন্ধু সিদ্ধান্ত নিলেন কবিকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনার যাতে তাঁর সুচিকিৎসার বন্দোবস্থ করা যায়। এছাড়া তিনি চেয়েছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে কবির উপস্থিতিতেই কবির ৭৩ তম জন্মদিন পালন করা হবে জাঁক-জমকের সাথে।
সকল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে ২৪মে,১৯৭২ সালে কবিকে বাংলাদেশ বিমানে করে ঢাকায় আনা হয়। কবির সাথে আসেন তাঁর দুই ছেলে সব্যসাচী ও অনিরুদ্ধ, কবির নাতনী খিলখিল কাজী ও উমা কাজী। কবিকে স্বাগত জানানোর জন্য তখনকার তেজগাঁও বিমান বন্দর লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। পুরো ঢাকা যেন সাজে উৎসবের রঙ্গে। বিমানবন্দর থেকে কবিকে সরাসরি নিয়ে যাওয়া হয় ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার ২৮ নম্বর রোডের ৩৩০ বাড়িতে। কবিকে বাড়ি ও অনুষঙ্গিক সব ধরণের সুবিধা দেয়া হয়। বঙ্গবন্ধু নিজে কবির বাড়িটির নাম দেন ‘কবি ভবন’। বঙ্গবন্ধু নিজে কবির সাথে দেখা করতে আসেন এবং তাঁর নির্দেশে কবির বাড়ির সামনে জাতীয় পতাকা সার্বক্ষণিকভাবে উত্তোলিত রাখার ব্যবস্থা করা হয়। কবির নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়। ২৫মে,১৯৭২। কবির ৭৩তম জন্মদিনে ঢাকায় বেশ জাঁক-জমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সে বছরই ৯ ডিসেম্বর সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টর অব লিটারেচার ডিগ্রি প্রদান করে। কিন্তু যার জন্য এই আয়োজন তিনি ছিলেন এসব কিছুর থেকে দূরে, বাকরুদ্ধ এক বিদ্রোহী।
দিন দিন কবির শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। ২২ জুলাই,১৯৭৫ কবিকে অসুস্থ অবস্থায় পিজি হাসপাতালের ১১৭ নম্বর কেবিনে নেয়া হয়। ভাগ্যের নির্ম পরিহাস, এর মাত্র কিছুদিন পরেই সপরিবারে নিহত হলেন বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশের বুকে নেমে এলো এক ঘোর কালো অধ্যায়। কবি এরপর আর ‘কবি ভবন’এ ফিরে যেতে পারেন নি। পিজি হাসপাতালে কবি দীর্ঘ এক বছর এক মাস আট দিন চিকিৎসাধীন ছিলেন। দিন দিন তাঁর অবস্থার অবনতি হয়। এক পর্যায়ে ব্রঙ্কো নিউমোনিয়াতে আক্রান্ত হন। ২৭ আগস্ট,১৯৭৬, কবির দেহের তাপমাত্রা ১০৫ ডিগ্রী অতিক্রম করে যায়। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকরা কবিকে বাঁচানোর আশা ছেড়ে দেন। সেদিন সকাল ১০ টা ১০ মিনিটে কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কবির দেহ কিছু সময়ের জন্য টি এস সি প্রাঙ্গণে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়। এরপর বিকেল ৪টায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জানায়ার নামাজে লাখ মানুষের ঢল নামে। কবিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে সমাহিত করা হয়।