রূপপুর গ্রিডে বিদ্যুৎ দেওয়ার আগের ধাপগুলো
খুব শিগগিরই হয়তো খবরে দেখব, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। দিনটি হবে ঐতিহাসিক। তবে এ অর্জনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ও জটিল পথ পাড়ি দেওয়ার ইতিহাস, নানা জল্পনা-কল্পনার অবসান এবং স্বস্তি ও আনন্দের মুহূর্ত। একটি দেশের সঙ্গে চুক্তি করলেই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ শেষ হয়ে যায় না। এর পেছনে রয়েছে বিশাল কর্মযজ্ঞ। শুরুতেই অর্থায়ন, প্রযুক্তি নির্বাচন ও ভূরাজনৈতিক সমীকরণের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে সরকারকে দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
এরপর মানবসম্পদ গড়ে তোলার জন্য পারমাণবিক প্রযুক্তিবিষয়ক শিক্ষা চালু, পারমাণবিক আইন প্রণয়ন, নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ও পরিচালনাকারী কোম্পানি প্রতিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক পারমাণবিক সুরক্ষা, নিরাপত্তা ও অস্ত্রবিস্তার রোধ-সংক্রান্ত কনভেনশনগুলোয় পক্ষভুক্ত হতে হয়।
রূপপুরে ১,২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি চুল্লি স্থাপনের জন্য ২০১১ সালে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন রোসাটমের সঙ্গে চুক্তি করা হয়। প্রকল্পটিতে রাশিয়া ৯০ শতাংশ অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ ও চালুকরণ প্রক্রিয়াকে চারটি ধাপে ভাগ করা হয়েছে-ধাপ-এ, ধাপ-বি, ধাপ-সি ও ধাপ-ডি।
ধাপ-এ হলো চুল্লি চালুর আগের প্রস্তুতিমূলক পর্যায়। এটি সবচেয়ে দীর্ঘ ধাপ, যার জন্য পরিকল্পনায় মোট ৫৫ মাস বরাদ্দ ছিল। ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর প্রথম ইউনিটের চুল্লির ভিত্তিপ্রস্তরের কংক্রিট ঢালাইয়ের মাধ্যমে নির্মাণকাজ শুরু হয়। এরপর ৩৯ মাস ধরে সাইট সমীক্ষা, পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ ও তা মোকাবিলার ব্যবস্থা গ্রহণ, চুল্লির নকশা প্রণয়ন, ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং অবকাঠামো নির্মাণের কাজ চলে।
পাশাপাশি পারমাণবিক আইন প্রণয়ন, নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ও পরিচালনাকারী কোম্পানি প্রতিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক পারমাণবিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত কনভেনশনে অংশগ্রহণসহ নানা প্রস্তুতিমূলক কাজও সম্পন্ন করা হয়।
এরপর শুরু হয় বিভিন্ন সিস্টেমের পরীক্ষা। বিদ্যুৎ সরবরাহ, শীতলীকরণ, বায়ু চলাচল ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাসহ বিভিন্ন সিস্টেম প্রথমে আলাদাভাবে, পরে সমন্বিতভাবে পরীক্ষা করা হয়। পাম্প ঠিকমতো চলছে কি না, ভালভ যথাযথভাবে খুলছে ও বন্ধ হচ্ছে কি না-এসব বিষয় যাচাই করতে আরও প্রায় নয় মাস সময় লাগে।
এরপর আসে চুল্লির নিজস্ব ব্যবস্থাগুলোর পরীক্ষা। চুল্লির চারপাশে থাকা শক্তিশালী কংক্রিটের আবরণ বা কনটেইনমেন্টের উদ্দেশ্য হলো দুর্ঘটনার মতো পরিস্থিতিতেও তেজস্ক্রিয় পদার্থকে নির্ধারিত সীমানার মধ্যে আটকে রাখা। এরপর চুল্লির মূল পাইপ-বর্তনী প্রথমে ঠান্ডা অবস্থায় এবং পরে গরম অবস্থায় চালিয়ে পরীক্ষা করা হয়। তাপমাত্রা বাড়িয়ে প্রায় ৩২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং চাপ ১৬.২ মেগাপ্যাসকেলে নেওয়া হয়। তখনো চুল্লিতে পারমাণবিক জ্বালানি প্রবেশ করানো হয়নি।
- ট্যাগ:
- মতামত
- পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র