করের বিকল্প যখন রেমিটেন্স: জবাবদিহিহীন রাষ্ট্রের ‘সহজ এক্সিট’ তত্ত্ব
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামোতে প্রবাসী আয় তথা রেমিটেন্সের ভূমিকা অতিমাত্রায় প্রভাবশালী; বর্তমানে তা মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৬.৬ শতাংশে পৌঁছেছে। বিস্ময়কর বিষয় হলো, দেশের সমগ্র কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরে মাত্র ৬.৮ শতাংশের সীমিত পরিসরে আবদ্ধ রয়েছে। অর্থাৎ, রাষ্ট্রীয় রাজস্ব প্রশাসন সম্পূর্ণ জাতীয় অর্থনীতি থেকে কর হিসেবে যতটুকু সম্পদ আহরণ করে, দেশের পরিবারগুলো প্রবাসে কর্মরত নাগরিকদের প্রেরিত অর্থ থেকে প্রায় সমপরিমাণ আয় প্রত্যক্ষ রাষ্ট্রীয় মধ্যস্থতা, প্রশাসনিক সাহায্য বা করের বোঝা ছাড়াই সরাসরি লাভ করছে। এই পরিস্থিতি নিছক কোনো আকস্মিক ঘটনা বা সাধারণ সামষ্টিক অর্থনৈতিক চিত্র নয়; বরং রাজনৈতিক অর্থনীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক অর্থশাস্ত্রের দৃষ্টিভঙ্গিতে এর একটি সুস্পষ্ট তত্ত্বীয় ভিত্তি, নির্দিষ্ট সংজ্ঞা এবং দীর্ঘদিনের বৈজ্ঞানিক বিতর্ক রয়েছে।
তত্ত্বীয় পরিভাষায় একে বলা হয় 'রেন্টিয়ার স্টেট থিওরি' বা 'স্বত্বভোগী রাষ্ট্র তত্ত্ব'। ১৯৮৭ সালে অর্থনীতিবিদ হাজেম বেবলাউই ও জিয়াকোমো লুসিয়ানি তেলসমৃদ্ধ আরব দেশগুলোর রাজনৈতিক অর্থনীতি বিশ্লেষণের মাধ্যমে তত্ত্বটি বিকাশ করেন। তাদের মূল তত্ত্বীয় যুক্তি হলো কর আহরণের প্রয়োজনে রাষ্ট্রকে নাগরিকদের রাজনৈতিক সম্মতি ও দরকষাকষির ওপর নির্ভর করতে হয়, আর এই সামাজিক বোঝাপড়া থেকেই প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার উদ্ভব ঘটে। পরবর্তীতে ২০০১ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মাইকেল রস এই প্রক্রিয়াকে 'কর-প্রভাব' বা ট্যাক্সেশন এফেক্ট হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তার মতে, যেসব রাষ্ট্র বাহ্যিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল, তাদের পরিচালনা ও অর্থায়নের জন্য নাগরিকদের সঙ্গে দরকষাকষিতে যেতে হয় না। ফলে সেসব সমাজে প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহ সুসংহত রূপ লাভ করতে ব্যর্থ হয়। আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসের প্রতিনিধিত্ব ছাড়া কর নয় বা ‘নো ট্যাক্সেশন উইথআউট রিপ্রেজেন্টেশন’ নীতিবাক্যটি বিপরীত দৃষ্টিকোণ থেকেও সমভাবে প্রযোজ্য। অর্থাৎ, প্রথাগত কর আহরণের বাধ্যবাধকতা ব্যতীত সমাজে প্রকৃত প্রতিনিধিত্বমূলক কাঠামো গড়ে ওঠে না।
তবে প্রাসঙ্গিক প্রশ্নটি হলো, আন্তর্জাতিক শ্রম অভিবাসন থেকে অর্জিত প্রবাসী আয় কি খনিজ তেলের রাজস্বের অনুরূপ আচরণ করে? এখানেই একটি মৌলিক প্রাতিষ্ঠানিক পার্থক্যের সূচনা হয়, যা প্রায়শই নীতি-বিশ্লেষকদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়। তেল বা খনিজ সম্পদের রাজস্ব সরাসরি রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কোষাগারে জমা হয়, অন্যদিকে প্রবাসী আয় সরাসরি সাধারণ পরিবারের হাতে পৌঁছায়। প্রথম প্রক্রিয়াটি রাষ্ট্রকে তার সাধারণ নাগরিকদের ওপর বহুগুণে কম নির্ভরশীল করে তোলে; পক্ষান্তরে দ্বিতীয় প্রক্রিয়াটি নাগরিককে দৈনন্দিন জীবনধারণ ও মৌলিক নাগরিক সেবার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ওপর প্রত্যক্ষভাবে কম নির্ভরশীল করে তোলে। এ দুটি মূলত সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রক্রিয়া, আর সে কারণেই বৈশ্বিক গবেষণায় এ সংক্রান্ত অভিমত ও ফলাফল অত্যন্ত বিভক্ত।
এক পক্ষে অবস্থান করছে প্রতিস্থাপন অনুকল্প বা সাবস্টিটিউশন হাইপোথিসিসি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) একটি উল্লেখযোগ্য গবেষণায় (আবদিহ, শামি, দাগের ও মন্টিয়েল, ২০০৮) বিশাল ক্রস-কান্ট্রি উপাত্ত অর্থনীতিমিতিক পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করে দেখানো হয়েছে যে, প্রবাসী আয়-জিডিপি অনুপাত উচ্চ হলে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, সরকারি কার্যকারিতা ও আইনের শাসনের মতো সুশাসন সূচকসমূহ তুলনামূলকভাবে নিম্নগামী হয়। এই মডেলের যুক্তি অনুসারে, পরিবারগুলো প্রবাস থেকে সরাসরি অর্থ প্রাপ্ত হলে রাষ্ট্রীয় জনসেবার ওপর তাদের নির্ভরতা হ্রাস পায়; ফলে সরকারের পক্ষে জনকল্যাণমূলক খাত থেকে সম্পদ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া সহজতর হয়। উল্লেখ্য, উক্ত গবেষণায় 'ভয়েস অ্যান্ড অ্যাকাউন্টাবিলিটি' (জনগণের মতপ্রকাশ ও জবাবদিহিতা) সূচকের ওপর কোনো পরিসংখ্যানগতভাবে অর্থবহ প্রভাব দেখা যায়নি, যা ফলাফলের সীমাবদ্ধতাকেও নির্দেশ করে।
অপর পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছে জবাবদিহিতা অনুকল্প বা অ্যাকাউন্টিবিলিটি হাইপোথিসিসি। মেক্সিকোর পৌরসভাভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে টোবিয়াস পফুটসে (২০০৯) দেখান যে, প্রবাসী আয়ের উচ্চ প্রবাহ যেসব অঞ্চলে বিদ্যমান, সেখানে স্থানীয় গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার গুণগত মান উন্নত হয়েছে। এর মূল যুক্তি হলো, প্রবাসী আয় কার্যত অ-করযোগ্য এবং রাষ্ট্র এই ব্যক্তিগত সম্পদ সরাসরি বাজেয়াপ্ত করতে পারে না; ফলে এটি ভোটারদের স্থানীয় রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে। যেসব পরিবারের নিজস্ব স্বাধীন আর্থিক সক্ষমতা রয়েছে, তারা নগণ্য সরকারি সুবিধার আশায় নিজেদের ভোটাধিকার বিক্রি করতে বাধ্য হয় না। পরবর্তীতে এসক্রিবা-ফোলচ, মেসেগার ও রাইট (২০১৫) এই যুক্তিপ্রবাহকে আরও বিস্তৃত করে দেখান যে, একদলীয় শাসনব্যবস্থায় প্রবাসী আয় গণতান্ত্রিক উত্তরণের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে। কারণ তা দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার নেটওয়ার্ককে দুর্বল করে দেয়। যদিও রাজতন্ত্র বা সামরিক শাসনে তারা এ ধরনের কোনো প্রভাব পাননি।
ফিলিপাইনকেন্দ্রিক দুটি পৃথক গবেষণা পরস্পরবিরোধী প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে। তুসালেম (২০১৮) প্রদেশভিত্তিক উপাত্তে ইতিবাচক সম্পর্কের প্রমাণ পেলেও, অন্য একটি গবেষণায় দেখা যায় যে প্রবাসী আয় নির্বাচনি জবাবদিহিতা হ্রাস করে। তবে এ বিষয়ে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ইঙ্গিত পাওয়া যায় 'আফ্রোব্যারোমিটার'-এর বিস্তৃত জরিপভিত্তিক গবেষণায়। সেখানে দেখা যায়, প্রবাসী আয় গ্রহণকারী নাগরিকদের ভোটদানের প্রবণতা কিছুটা কম হলেও, সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সম্ভাবনা ১৫ শতাংশ এবং প্রতিবাদী কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা ১৬ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ, প্রবাসী আয় রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে নিঃশেষ করে দেয় না, বরং এর গতিপথ বদলে দেয় প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যম থেকে ব্যক্তিগত যোগাযোগে, এবং ব্যালট বক্স থেকে সরাসরি তদবির ও রাজপথের সামাজিক আন্দোলনে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- জবাবদিহিতা
- রেমিট্যান্স
- প্রবাসী আয়