ট্রাম্পের প্রতি আমেরিকান ভোটারদের অনাস্থা
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের ভূমিধস বিজয়ের মধ্য দিয়ে আমেরিকান ভোটাররা কার্যত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করেছে। ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির পরাজয় অবশ্যম্ভাবী ছিল। কিন্তু এত বিপুল ব্যবধানে তাদের পরাজয় হবে, এমন ধারণা করেনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জরিপ সংস্থাগুলো।
মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত কংগ্রেস নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির জোয়ার ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অত্যন্ত অজনপ্রিয় ও বিতর্কিত একজন প্রেসিডেন্টের প্রতি তীব্র নিন্দা ও ধিক্কার, যিনি গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আমেরিকার রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আধিপত্য বিস্তার করে ছিলেন।
তিনি তার পূর্বসূরিদের তুলনায় সচেতনভাবেই মধ্যবর্তী নির্বাচনকে নিজের ওপর একটি গণভোটে রূপ দিয়েছিলেন; শেষ পর্যন্ত তাকেই এর মাশুল দিতে হলো। প্রত্যাশা কম থাকার মধ্যে এক ধরনের স্বাধীনতা থাকে। সব হিসাবনিকাশ ওলটপালট হয়ে গেছে।
৩ নভেম্বর মঙ্গলবারের নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের পক্ষে যে পূর্বাভাসগুলো ছিল, সেগুলো এখন রীতিমতো রসিকতার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। নির্বাচনে ভোটাররা স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, তারা ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে তার প্রতি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট। তারা তার ক্ষমতা খর্ব করার পক্ষে একচ্ছত্র রায় দিয়েছেন।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানো ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। কারণ, উচ্চ আদালতের বিচারপতি এবং কেন্দ্রীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রেসিডেন্টের মনোনয়ন অনুমোদনের ক্ষেত্রে সিনেটের মুখ্য ভূমিকা রয়েছে। এছাড়া প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত, শুনানি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুযোগও বাড়বে ডেমোক্র্যাটদের। ডেমোক্র্যাটরা তাদের নিজস্ব এজেন্ডাগুলোকে সামনে আনতে পারবেন, কংগ্রেসের সাংবিধানিক অধিকার বজায় রাখতে পারবেন।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেট ও নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের মাঝপথে তার দলের হতাশাজনক পরাজয় তার প্রশাসন ও দলের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক ধাক্কা। একটি শত্রুভাবাপন্ন কংগ্রেস, লক্ষণীয়ভাবে হ্রাস পাওয়া মানসিক ও শারীরিক সক্ষমতা, তলানিতে ঠেকে যাওয়া জনপ্রিয়তা নিয়ে ট্রাম্পকে নতুন বছরে পা ফেলতে হবে।
তার বিপদ শুধু কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ে নয়, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্তে তার নিজ দলের ভেতরের ঘনিষ্ঠ বলয়ে যে ফাটল ধরেছে, সেটিও তার জন্য বিপদের বড় কারণ হবে। প্রতিনিধি পরিষদে এখন ডেমোক্র্যাটদের আসন সংখ্যা ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রাপ্ত ২১৪ থেকে বিস্ময়করভাবে ২৫৮ আসনে উন্নীত হয়েছে। রিপাবলিকানদের আসন সংখ্যা ২১৮ থেকে হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১৭৭ আসনে।
হাউজে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ২১৮ আসন। ডেমোক্র্যাটরা সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়েছে সিনেটে। ১০০ আসনের সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা ২০২৪ সালের ৪৭ আসন থেকে ৫৪টি আসনে বিজয় নিশ্চিত করেছে। রিপাবলিকানদের সিনেট আসন ২০২৪ সালের ৫৩ আসন থেকে হ্রাস পেয়ে মধ্যবর্তী নির্বাচনে দাঁড়িয়েছে ৪৪টিতে।
নির্বাচনের ফলাফলকে ট্রাম্প-যুগের অবসান বললেও বাড়িয়ে বলা হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা অসীম। কংগ্রেসে যদি প্রেসিডেন্টের নিজ দলের নিয়ন্ত্রণ নাও থাকে, তা সত্ত্বেও তার নির্বাহী এখতিয়ার হ্রাস পায় না।
কংগ্রেসের সিদ্ধান্তের ওপর তিনি ভেটো প্রয়োগ করার অধিকারী এবং কংগ্রেসের উভয় কক্ষ যদি কোনো বিল পাসও করে, তা সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসে পাস করা বিল আইনে পরিণত করার পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারেন, বিলে স্বাক্ষর না করে। প্রেসিডেন্ট ভেটো দিলে তা কাটাতে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন হবে। ফলে বাজেট, সরকারি ব্যয় ও গুরুত্বপূর্ণ আইন নিয়ে হোয়াইট হাউজের সঙ্গে ডেমোক্র্যাটদের সমঝোতার প্রয়োজন পড়বে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- মধ্যবর্তী নির্বাচন