শিক্ষার ডিজিটাল রূপান্তরে বিএনপির সামনে যে সুযোগ
সরকারকে শূন্য থেকে শুরু করতে হচ্ছে না। দেশে ইতিমধ্যে শিক্ষাপ্রযুক্তির অবকাঠামো আছে। সেগুলো ব্যবহারের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি অপচয় ও সুশাসনের ব্যর্থতার তথ্যও রয়েছে। ২০২৫ সালে তৈরি আইসিটি শ্বেতপত্রে প্রকল্পের পরিকল্পনা, কেনাকাটা, বাস্তবায়ন ও তদারকির বিভিন্ন পর্যায়ের অনিয়ম নথিবদ্ধ করা হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সরকার নতুন বিনিয়োগকে আরও কার্যকর করতে পারে।
দায়িত্ব গ্রহণের শুরু থেকেই শিক্ষা সংস্কারে বিএনপি সরকার যে গুরুত্ব দিচ্ছে, তা প্রশংসনীয়। শিক্ষক-সংকটের ব্যাপ্তি নিরূপণ ও পাঠ্যক্রম পরিমার্জন নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি বহুল আলোচিত উদ্যোগগুলোর একটি হলো শিক্ষার ডিজিটাল রূপান্তর। এ-সংক্রান্ত সবচেয়ে আলোচিত উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে ‘এক শিক্ষক, এক ট্যাব’। আরও আছে বিপুলসংখ্যক ডিজিটাল শ্রেণিকক্ষ ও বিদ্যালয়ে এআই ল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনা।
সরকারের প্রস্তাবিত দুটি শিক্ষার ডিজিটাল রূপান্তর প্রকল্পে প্রায় ২১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। বড় প্রকল্পটির ব্যয় ১৮ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা। এতে এক লাখ শ্রেণিকক্ষে ডিজিটাল প্যানেলসহ প্রযুক্তিসুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
৩ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকার নেক্সটজেন প্রকল্পে প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষা প্রশাসককে প্রশিক্ষণ এবং ১ হাজার ৫০টি বিদ্যালয়ে ২ হাজার ১০০টি আইসিটি ও এআই ল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্প দুটির সম্ভাব্য বাস্তবায়নকাল ২০২৭-৩১। বড় প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চলছে; নেক্সটজেন প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে রয়েছে।
তাই প্রকল্পের নকশা পর্যালোচনা ও সংশোধনের সুযোগ এখনো আছে। এ পর্যায়েই প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন—উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য নয়, বরং বিপুল সরকারি বিনিয়োগের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য। প্রকল্প অনুমোদনের আগেই শিক্ষা খাতের ডিজিটাল রূপান্তরের উদ্যোগকে শিখনঘাটতি পূরণের একটি টেকসই ও বিশ্বাসযোগ্য রূপরেখায় রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে বিএনপির একটি বড় সুবিধা আছে। সরকারকে শূন্য থেকে শুরু করতে হচ্ছে না। দেশে ইতিমধ্যে শিক্ষাপ্রযুক্তির অবকাঠামো আছে। সেগুলো ব্যবহারের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি অপচয় ও সুশাসনের ব্যর্থতার তথ্যও রয়েছে। আমার নেতৃত্বাধীন টাস্কফোর্সের তৈরি ২০২৫ সালের আইসিটি শ্বেতপত্রে প্রকল্পের পরিকল্পনা, কেনাকাটা, বাস্তবায়ন ও তদারকির বিভিন্ন পর্যায়ের অনিয়ম নথিবদ্ধ করা হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সরকার নতুন বিনিয়োগকে আরও কার্যকর করতে পারে।
ল্যাব আছে কিন্তু শিক্ষার্থীরা কী শিখছে
২০২৫ সালের আইসিটি শ্বেতপত্রের জন্য শিক্ষা খাতে প্রামাণিক তদন্তের অংশ হিসেবে আমরা বিগত ১০ বছরে স্থাপিত ৯ হাজারের বেশি শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব ও ‘স্কুল অব ফিউচার’ উদ্যোগ পরীক্ষা করেছিলাম।
মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানের পাশাপাশি প্রকল্পের আওতাভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রকল্পের বাইরের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের তুলনামূলক বিচার করা হয়েছিল। এককথায় আমাদের তদন্তের উপসংহার ছিল ‘ল্যাব উইদাউট লার্নিং’। অর্থাৎ বিদ্যালয়ে ডিজিটাল ল্যাব আছে কিন্তু শিক্ষার ফলাফলে তার দৃশ্যমান প্রভাব নেই। কিছু ক্ষেত্রে প্রকল্পে অনুমোদিত যন্ত্রপাতি পৌঁছালেও প্রশিক্ষিত আইসিটি শিক্ষক নেই। কোথাও লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম সফটওয়্যার কার্যকর নয়, কোথাও রক্ষণাবেক্ষণ ও নিয়মিত ব্যবহার অনিশ্চিত।
আমাদের গবেষণা ও তদন্তে প্রশাসনিক শিক্ষাতথ্য বিশ্লেষণ করে প্রযুক্তির প্রাপ্যতা ও ব্যবহারে উন্নতি পাওয়া গেলেও ২০২১-২৩ সময়ে এসএসসির পাসের হার বা জিপিএ-৫ অর্জনে পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ উন্নতি শনাক্ত হয়নি। অবশ্য এসব সূচক প্রযুক্তির সব সুফল পরিমাপ করতে সক্ষম নয়। শ্বেতপত্রের গবেষণা ও তদন্ত থেকে এমন সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না যে ডিজিটাল প্রযুক্তি শিক্ষার্থীদের জন্য সুফল বয়ে আনতে পারে।