বহুমেরুর বিশ্ব ও ব্রিকস: একাধিপত্যের বিকল্প নাকি কর্তৃত্বের নতুন সমীকরণ?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার চাবিটা চলে গিয়েছিল পশ্চিমা দেশগুলোর হাতে। পরে আবার সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনে স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটে এবং পুরো বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য চেপে বসে। তবে একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসে এতদিন যে একমুখী বিশ্বব্যবস্থার ওপর আমরা দাঁড়িয়ে ছিলাম, তার ভিতটা নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, নিত্যনতুন প্রযুক্তি, সামরিক ক্ষমতা, জনসংখ্যা আর বাজার—সব দিক থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে নতুন নতুন শক্তি মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে। বদলাতে থাকা এই বৈশ্বিক ক্ষমতার সবচেয়ে বড় আর বাস্তব প্রমাণ মিলছে ব্রিকসের মতো জোটের দিন দিন শক্তিশালী হয়ে ওঠায়।
নয়াদিল্লিতে ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ ১১টি পূর্ণ সদস্য দেশ এবং ১০টি অংশীদার দেশ নিয়ে গঠিত ব্রিকস জোটের ১৮তম বার্ষিক সম্মেলন হয়ে গেল। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৯ দশমিক ৫ শতাংশ, বৈশ্বিক জিডিপির ৪০ শতাংশ ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের ২৬ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করছে ব্রিকস। তাই এটি সাধারণ কোনো আন্তর্জাতিক সম্মেলন নয়; পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তাও বহন করছে এই সম্মেলন। দিল্লিতে ১১ সদস্যের এই জোট সম্মেলনের প্রথম দিনেই সর্বসম্মতভাবে একটি যৌথ ঘোষণাপত্রে সই করে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা—২০২৬’। বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার সংস্কার, সন্ত্রাসবাদের নিন্দা এবং একতরফাভাবে যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার বিরোধিতার মতো বিষয় ঘোষণাপত্রে স্থান পেয়েছে। ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় ও নিজস্ব মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
এখানেই ব্রিকসের রাজনৈতিক তাৎপর্য। ব্রিকসকে শুধু কয়েকটি উদীয়মান অর্থনীতির জোট হিসেবে দেখলে এর মূল গুরুত্ব ধরা যাবে না। এর গভীরে রয়েছে বিশ্বব্যবস্থার সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোকে প্রশ্ন করার প্রবণতা। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংকসহ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বহু আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতার কাঠামো সেই সময়কার বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি হয়েছিল। কিন্তু আজকের পৃথিবীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে গেছে। এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বহু দেশ বিশ্ব অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের প্রতিনিধিত্ব ও প্রভাব এখনো সেই অনুপাতে বাড়েনি। ব্রিকসের উত্থান সেই অসামঞ্জস্যের বিরুদ্ধে একটি নতুন চাপ সৃষ্টি করছে।
বহুমেরুকরণ বলতে তাই একটি শক্তির জায়গায় আরেকটি শক্তিকে বসানো বোঝায় না। যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে চীন বিশ্বের নতুন একক নিয়ন্ত্রক হবে—বহুমেরুকরণের অর্থ এমন নয়। রাশিয়া, চীন, ভারত, ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা এবং এশিয়ার বিভিন্ন শক্তিকেন্দ্র নিজেদের স্বার্থ ও সক্ষমতা নিয়ে বিশ্বব্যবস্থায় ভূমিকা রাখবে—এটাই বহুমেরুকরণের মৌলিক ধারণা। এই বহুমেরুকেন্দ্রিক নতুন বিশ্বব্যবস্থা যে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফাবাদের বিরুদ্ধে, সে বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। তবে একতরফাবাদের বিরুদ্ধে ব্রিকসের এই লড়াই ‘বহুমেরুকেন্দ্রিক কর্তৃত্ববাদ’ প্রতিষ্ঠার পথ উন্মোচন করছে কিনা, সেই প্রশ্নও সামনে আসতে শুরু করেছে।
এই জায়গায় ব্রিকসের সবচেয়ে বড় শক্তি তার বৈচিত্র্য। ব্রিকস কোনো সামরিক জোট নয়, কোনো একক রাজনৈতিক মতাদর্শের সংগঠনও নয়। এর সদস্যদের মধ্যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক কাঠামো, জাতীয় স্বার্থ এবং পররাষ্ট্রনীতিতে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। এই পার্থক্য যেমন ঐক্যের পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে, তেমনি ভিন্ন মত ও স্বার্থের দেশগুলো যদি অভিন্ন স্বার্থের জায়গায় সহযোগিতা করতে পারে, তাহলে সেটিই হতে পারে বহুমেরুকরণের সবচেয়ে বাস্তব ভিত্তি। কারণ বহুমেরুকরণ মানে অভিন্ন মতের পৃথিবী নয়; বরং ভিন্ন মতের রাষ্ট্রগুলোর সহাবস্থান ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সহযোগিতার পৃথিবী।
ব্রিকসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অর্থনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন ডলার প্রধান ভূমিকা পালন করে আসছে। ডলারের এই আধিপত্য শুধু বাণিজ্যিক সুবিধার বিষয় নয়; এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, নিষেধাজ্ঞা, ঋণব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রগুলোর নীতিনির্ধারণের ওপরও ক্ষমতার সম্পর্ক জড়িত। ব্রিকসের দেশগুলো নিজেদের মধ্যে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়াতে চাইছে। এর অর্থ আগামীকাল থেকেই ডলারের অবসান ঘটবে—এমন নয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক লেনদেনে একক মুদ্রার ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হতে পারে। তবে সেই ব্যবস্থা কার্যকর করতে হলে পারস্পরিক আস্থা, স্থিতিশীল মুদ্রা, শক্তিশালী আর্থিক কাঠামো এবং নির্ভরযোগ্য লেনদেনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
ব্রিকসের সাফল্য তাই ঘোষণাপত্রে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। বহুমেরুকরণ বাস্তব অর্থে শক্তিশালী হবে তখনই, যখন ঘোষণার সঙ্গে বাস্তব অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে। সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য বাড়াতে হবে, স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেনের সুযোগ সম্প্রসারিত করতে হবে, উন্নয়ন অর্থায়নের বিকল্প পথ তৈরি করতে হবে, প্রযুক্তি বিনিময় বাড়াতে হবে এবং খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তায় পারস্পরিক সহযোগিতা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের দাবিকে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগে পরিণত করতে হবে।
তবে এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে। বহুমেরুকরণ যদি শুধু বৃহৎ শক্তিগুলোর পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন মঞ্চে পরিণত হয়, তাহলে ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলোর জন্য তার সুফল সীমিত থাকবে। একটি আধিপত্যের জায়গায় একাধিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলে তাকে প্রকৃত বহুমেরুকরণ বলা যাবে না। বহুমেরুকরণের সার্থকতা তখনই, যখন ছোট রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং উন্নয়নের অধিকারও সমানভাবে স্বীকৃত হবে। কোনো রাষ্ট্রকে বৃহৎ শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পক্ষ বেছে নিতে বাধ্য করা নয়; নিজের জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি করাই হওয়া উচিত বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার মৌলিক বৈশিষ্ট্য।
বাংলাদেশের জন্য এই পরিবর্তনের তাৎপর্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হওয়া উচিত কোনো একটি শক্তির ওপর নির্ভরতা নয়; জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। ভারত আমাদের প্রতিবেশী ও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার, চীন বড় অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে রয়েছে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক। তাই বাংলাদেশকে কারও শিবিরে দাঁড় করিয়ে নয়, সবার সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের স্বার্থ আদায়ের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বহুমেরুকরণ বাংলাদেশের জন্য সেই কূটনৈতিক পরিসরকে আরও বিস্তৃত করতে পারে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- ব্রিকস সম্মেলন