ডেঙ্গুতে বাংলাদেশের নারীরা কেন বেশি মরছেন?
দুর্যোগ নিয়ে গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও নীতি বিশ্লেষণের কাজ করে ফাউন্ডেশন ফর ডিজাস্টার ফোরাম। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের খসড়া তৈরির কাজ শেষ করেছে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রকাশ করা হবে এটি। প্রকাশিতব্য প্রতিবেদনে ডেঙ্গু পরিস্থিতির বিশ্লেষণে বেশ পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে ডেঙ্গু জ্বরে আনুপাতিক হারে পুরুষেরা বেশি আক্রান্ত হলেও মারা যাচ্ছেন নারীরা বেশি।
ডেঙ্গুতে ২০২৪ সালে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জনের মধ্যে ৬৩ দশমিক ১০ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৬ দশমিক ৯০ শতাংশ নারী। একই সময়ে ৫৭৫ জন মারা গেছেন, যাঁদের মধ্যে ৫১ দশমিক ১০ শতাংশ নারী এবং ৪৮ দশমিক ৯০ শতাংশ পুরুষ।
সে বছর বিষয়টি নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে অধ্যাপক বে-নজীর আহমেদ বলেছিলেন, ‘ডেঙ্গুতে নারীদের অধিক মৃত্যুর কোনো বিশেষ কারণ পাওয়া যায়নি। ফলে কারণ হিসেবে আপাতত অবহেলার বিষয়টিই ধরে নিতে হচ্ছে। নারীরা অনেক সময় নিজেদের অসুস্থতাকে গুরুত্ব দেন না এবং সংসার ও সন্তানদের প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগ দেন। একই সঙ্গে অনেক স্বামীও স্ত্রীর অসুস্থতাকে গুরুত্ব না দিয়ে উপেক্ষা করেন। ফলে পরিস্থিতি জটিল অবস্থায় চলে যায়।’
নারীদের মৃত্যুর একই ধারা এখন পর্যন্ত বহাল আছে। গত বছর (২০২৫ সাল) নারীদের মোট মৃত্যু পুরুষদের চেয়ে কম দেখা গেলেও আক্রান্তের আনুপাতিক হার বিবেচনা করলে নারীদের মৃত্যুহার পুরুষদের চেয়ে বেশি হবে। চলতি বছর (২০২৬) জুলাই মাস পর্যন্ত পাওয়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লিঙ্গভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, নারীদের মৃত্যুর সংখ্যা পুরুষদের চেয়ে বেশি, পুরুষ ৩৯ দশমিক ৫ শতাংশের বিপরীতে নারীর মৃত্যু ৬০ দশমিক ৫ শতাংশ।
কারণ খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছিল কি?
বিষয়টি নিয়ে যতজন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলেছি, তাঁদের কেউই এ ধরনের কোনো কারণ অনুসন্ধানী গবেষণার হদিস দিতে পারেননি। অনেকের কাছেই এটি ‘আজাইরা’ প্রশ্ন বলে মনে হয়েছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীরা বেশি মরবেন—এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু বিষয়টি এতটা সোজাসাপটা নাও হতে পারে।
কয়েক যুগ আগে উত্তরবঙ্গের নানা জেলায় শৈত্যপ্রবাহে মানবিক সহায়তার কাজ করার সময় লক্ষ করেছিলাম, শয়ে শয়ে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশু জরাজীর্ণ হাসপাতালগুলোয় আসছে। তাদের প্রায় ৮০ শতাংশই ছেলেশিশু। তখনো দেখেছিলাম, মেয়েশিশু অনেক কম এলেও লাশ হয়ে ফিরছে তারাই বেশি। কেন এমন হচ্ছে?
শৈত্যপ্রবাহে কম্বল, খাবার, গরম কাপড় ও ওষুধ বিতরণের মানবিক কাজে ব্যস্ত থাকার সময় এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা ব্যাকরণসম্মত নয়। তবু জানতে মনটা আঁকুপাঁকু করছিল। অনেকেই বলেছিলেন, ‘পিতৃতান্ত্রিক সমাজ’, তাই এমন হচ্ছে। মেয়েশিশুর প্রতি নজর কম, তাই এমন ঘটাটাই স্বাভাবিক। এ ধরনের ঢালাও বিবেচনা আমরা মেনে নিই। শুরু হয় বহুল ব্যবহৃত এবং পপুলার (জনপ্রিয় নয়) কর্মসূচি—‘সচেতনতা’ বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ।
এটা কি শুধু দেশের উত্তরের পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর মধ্যেই ঘটছে? ঢাকায় ফিরে শিশু হাসপাতালে গিয়ে দেখি, সেখানেও ছেলেশিশু ভর্তি বেশি। বাংলাদেশের শিশু চিকিৎসার পথিকৃৎ ও জাতীয় অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ রফি খান (এম আর খান) তখনো বেঁচে। তিনি ছবি এঁকে বুঝিয়ে দিলেন, ছেলেশিশুদের ফুসফুস ও শ্বাসতন্ত্রের বিকাশ একই গর্ভকালীন বয়সে মেয়েদের তুলনায় কিছু ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত ধীরে হয়। ফলে ছেলেশিশুদের শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা বেশি দেখা যায়।
শিশুর শ্বাসনালি এমনিতেই ছোট। এম আর খান বললেন, গবেষণায় দেখা গেছে, জীবনের প্রথম দিকে ছেলেশিশুদের প্রান্তীয় শ্বাসনালীগুলো তুলনামূলক সরু হয়। ফলে সামান্য ফোলা+কফ+প্রদাহ–শ্বাসনালি দ্রুত সংকুচিত–শ্বাসকষ্ট ও নিম্ন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।
এম আর খান আরও জানালেন, জৈবিক লিঙ্গের ভিত্তিতে রোগপ্রতিরোধী প্রতিক্রিয়ায় পার্থক্য থাকতে পারে। সাধারণভাবে মেয়েদের রোগপ্রতিরোধী প্রতিক্রিয়া (ইমিউন রেসপন্স) অনেক ক্ষেত্রে তুলনামূলক শক্তিশালী হতে পারে, যদিও এটি সব ধরনের সংক্রমণের ক্ষেত্রে একইভাবে কাজ করে না।