ইসলামি ব্যাংকিংয়ের সংকট শরিয়াহ নীতিতে নয়, তাহলে কিসে?
সংসদে পুরোনো একটি প্রশ্নই আবার সামনে এসেছে। সেটি হলো, ইসলামি ব্যাংকগুলো কি সত্যিই ইসলামি, নাকি কেবল ‘সুদ’-এর পরিবর্তে ‘মুনাফা’ শব্দটি ব্যবহার করছে?
সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিলের ওপর বিতর্কে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ইসলামি ব্যাংকিং প্রসঙ্গে বলেন, এসব ব্যাংক সুদের পরিবর্তে মুনাফা গ্রহণ করে।
মো. আসাদুজ্জামান বিদেশের আদালতের এমন কিছু রায়েরও উল্লেখ করেন, যেখানে প্রশ্ন তোলা হয়েছে—বাস্তবে এসব ব্যাংক বিনিয়োগের লাভের পাশাপাশি লোকসানের ঝুঁকিও বহন করে কি না।
যেহেতু এ বক্তব্যের পূর্ণ সংসদীয় প্রতিলিপির পরিবর্তে আপাতত একটি সারসংক্ষেপই পাওয়া যাচ্ছে, তাই শব্দচয়ন নিয়ে বিতর্কে না গিয়ে বক্তব্যটির অন্তর্নিহিত যুক্তির দিকে দৃষ্টি দেওয়াই অধিক সংগত।
কারণ, ইসলামি ব্যাংকিংয়ের শরিয়াহসম্মততা নির্ধারণ কেবল ‘সুদ’ ও ‘মুনাফা’ শব্দের পার্থক্যের ওপর নির্ভর করে না; বরং লেনদেনের প্রকৃতি, সম্পদ ও মালিকানা, ঝুঁকি গ্রহণ, চুক্তির কাঠামো এবং লাভ-লোকসান বণ্টনের বাস্তবতার ওপর তা নির্ভর করে।
অতএব, উত্থাপিত প্রশ্নটির একটি সুসংগত ও শরিয়াহভিত্তিক জবাব প্রাপ্য।
একটি বিষয়ে আইনমন্ত্রী সঠিক এবং তা গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এর প্রতিষ্ঠাতাদের প্রত্যাশার তুলনায় লাভ-লোকসান বণ্টনভিত্তিক অর্থায়ন অনেক কম। কিন্তু সেখান থেকে কাঙ্ক্ষিত উপসংহারে পৌঁছানো যায় না।
ইসলামি অর্থায়নকে প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের ছদ্মবেশ হিসেবে দেখলে এর একটি আদর্শকে সমগ্র বাণিজ্যিক আইনের সমার্থক করে ফেলা হয়।
এতে পণ্যের ক্ষেত্রে বিক্রেতার নির্ধারিত মূল্য এবং অর্থের ক্ষেত্রে ঋণদাতার নির্ধারিত মূল্যের মৌলিক পার্থক্যটিও আড়াল হয়ে যায়।
এই পার্থক্যটিই মূল বিষয়। ইসলামি আইনে ব্যবসা, ইজারা ও বিনিয়োগ—সব ক্ষেত্রেই মুনাফা অর্জনের সুযোগ রয়েছে।
মুরাবাহায় ঘোষিত ক্রয়মূল্যের সঙ্গে মুনাফা যোগ করে পণ্য বিক্রি করা হয়; ইজারায় সম্পদ ভাড়া দেওয়া হয়; সালাম ও ইসতিসনায় ভবিষ্যতে সরবরাহ বা নির্মাণযোগ্য পণ্যের জন্য অগ্রিম অর্থ প্রদান করা হয়; আর মুশারাকা ও মুদারাবায় যৌথ উদ্যোগের ভিত্তিতে অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।
প্রতিটি ক্ষেত্রেই মূল শর্ত হলো বিক্রয় বা ইজারার আগে ব্যাংকের সম্পদের মালিকানা বা সংশ্লিষ্ট ঝুঁকির সঙ্গে বাস্তব সংযোগ থাকা।
অর্থাৎ মুনাফা নিছক অর্থ ব্যবহারের বিনিময়ে নয়; বরং পণ্য, সম্পদ বা উদ্যোগভিত্তিক প্রকৃত লেনদেন থেকেই উদ্ভূত হয়।
ঢাকায় কেউ এসব শ্রেণিবিভাগ নিজের মতো করে উদ্ভাবন করেনি। এগুলো ইসলামিক ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস বোর্ডের (আইএফএসবি-১,২০০৫) নির্দেশনায় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘গাইডলাইনস ফর কনডাক্টিং ইসলামিক ব্যাংকিং’ (২০০৯)-এও স্বীকৃত ও অন্তর্ভুক্ত।
কোনো আদালত অবশ্যই প্রশ্ন তুলতে পারে—নির্দিষ্ট কোনো চুক্তি তার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সম্পাদিত হয়েছে কি না। কিন্তু একটি চুক্তির ব্যর্থতা বা অনিয়মের কারণে পুরো বাণিজ্যিক আইনশাস্ত্রকেই বাতিল করা যায় না।
- ট্যাগ:
- মতামত
- শরিয়াহ-ভিত্তিক ব্যাংক