সুষম সার ব্যবস্থাপনার রূপরেখা
বাংলাদেশের কৃষিতে সার শুধু একটি কৃষি উপকরণ নয়; এটি ১৭ কোটির বেশি মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা, প্রায় ২ কোটি কৃষকের আয় ও জীবিকা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। বৈশ্বিক সংকট ও কৃষি উপকরণের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে গত কয়েক বছরে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সেই চাপের প্রভাব এখনো মাঠপর্যায়ে বিদ্যমান। ফলে সার সরবরাহ, মূল্য ও ব্যবহার, এ তিনটি বিষয়কে শুধু কৃষি উৎপাদনের দৃষ্টিতে নয়, কৃষক ও সামগ্রিক অর্থনীতির দৃষ্টিতেও দেখতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের কৃষির কাঠামোও দ্রুত বদলে গেছে। সীমিত আবাদি জমিতে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণ করতে একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল, সাথি ফসল এবং তুলনামূলক বেশি সারনির্ভর আলু, ভুট্টা ও সবজির আবাদ বেড়েছে। ফলে সারের জাতীয় চাহিদা নিরূপণে শুধু অতীতের ব্যবহার বা ধানভিত্তিক প্রচলিত হিসাব যথেষ্ট নয়। মাঠের পরিবর্তিত ফসল বিন্যাস ও উৎপাদন ব্যবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েই এখন সার চাহিদার নতুন হিসাব করতে হবে।
ফসলের নিবিড়তা বাড়ছে, কমছে মাটির পুষ্টিগুণ : বাংলাদেশে সারের চাহিদা বাড়ার অন্যতম কারণ ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি ও মাটির জৈব উপাদান কমে যাওয়া। সীমিত জমিতে উৎপাদন বাড়াতে একই জমিতে ধান, আলু, ভুট্টা, সবজি, ডাল ও তেলবীজের ধারাবাহিক ও সাথি ফসল চাষ বাড়ছে। এতে কৃষকের আয় ও খাদ্যনিরাপত্তা বাড়লেও জমি থেকে পুষ্টি অপসারিত হচ্ছে। পর্যাপ্ত জৈবসার ব্যবহার না হওয়ায় মাটির উর্বরতা কমছে এবং রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। ফলে পরিবর্তিত ফসল বিন্যাস ও মাটির পুষ্টি ক্ষয়ের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই সারের চাহিদা নিরূপণ করা জরুরি। বিশেষ করে ভুট্টার আবাদ বৃদ্ধির ফলে সারের চাহিদা আরও বেড়েছে। ভুট্টা এখন পোলট্রি ও প্রাণিসম্পদ খাতের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল হওয়ায় এর উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে কৃষি উপকরণের সামগ্রিক চাহিদাও বাড়ছে। একইভাবে নিবিড় মাছ চাষ ও প্রাণী খাদ্যে রাসায়নিক সার ব্যবহার হচ্ছে। তাই কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদকে সমন্বিত কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থার অংশ হিসাবে বিবেচনা করে সারের জাতীয় চাহিদা নির্ধারণ করা এবং সেই অনুযায়ী সার পরিকল্পনা পুনর্বিন্যাস করা সময়ের দাবি।
‘কৃষক বেশি সার ব্যবহার করেন’-এ ধারণা কতটুকু সত্য : আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো কৃষকের সার ব্যবহারের ধরন। আমাদের নীতিগত আলোচনায় প্রায়ই ঢালাওভাবে বলা হয়, কৃষক জমিতে মাত্রারিক্ত সার প্রয়োগ করেন; কিন্তু মাঠপর্যায়ের গবেষণা ও তথ্য এ সাধারণীকরণকে ভুল প্রমাণ করে। অতীতে ইউরিয়াকেন্দ্রিক সার ব্যবহারের প্রবণতা বেশি থাকলেও বর্তমানে কৃষক ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি, এমওপি এবং বিভিন্ন মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টসহ বহুমাত্রিক সার ব্যবহার করছেন। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের ২০২৪ সালের সার সুপারিশমালাতেও ফসল ও ফসল বিন্যাসভিত্তিক মাটির পরীক্ষার ওপর নির্ভর করে সার প্রয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। মাটির স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত আর্থ-সামাজিক গবেষণায় দেখা যায়, কিছু কৃষক অতিরিক্ত সার ব্যবহার করেন এবং তা স্বীকারও করেছেন, তারা নির্দিষ্ট কিছু ফসলে সুপারিশের তুলনায় বেশি ইউরিয়া ব্যবহার করেন। তাদের যুক্তি হলো, সার আগের মতো কাজ করে না, কিন্তু এটি মাটির জৈব উপাদান ও পিএইচ তারতম্যের কারণে ঘটছে, তা তাদের অজানা। অন্যদিকে প্রান্তিক ও নারী কৃষকের একটি অংশ তুলনামূলক কম সার ব্যবহার করেন (রহমান, ২০২৫)। অর্থাৎ ‘কৃষক বেশি সার ব্যবহার করেন’-এমন একটি সাধারণীকরণ বাস্তবতার পুরোটা তুলে ধরে না।
বর্তমান ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে সারের জাতীয় চাহিদা প্রায় ৫৮ লাখ টন। এর মধ্যে ইউরিয়া ২৬ লাখ, টিএসপি ৭.৫ লাখ, ডিএপি ১৪.৮৫ লাখ এবং এমওপি ৯.৫ লাখ টন। পাশাপাশি জিপসাম, জিংক সালফেট, বোরন ও অ্যামোনিয়াম সালফেটসহ বিভিন্ন মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টেরও উল্লেখযোগ্য চাহিদা রয়েছে (কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, ২০২৬)। এ বিপুল চাহিদার একটি বড় অংশ আমদানিনির্ভর। ২০২৬ সালের আগস্টে সরকার ৩ লাখ ৬৫ হাজার টন সার আমদানির অনুমোদন দেয়। অন্যদিকে গ্যাস সংকট, পুরোনো প্রযুক্তি ও উচ্চ উৎপাদন ব্যয়ের কারণে বিসিআইসি ও কাফকোর দেশীয় উৎপাদনও নিরবচ্ছিন্ন নয়। সাম্প্রতিক গ্যাস সংকটে কয়েকটি ইউরিয়া কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় অতিরিক্ত ৭ লাখ টন ইউরিয়া আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাই আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য ও সরবরাহের অনিশ্চয়তা বিবেচনায় আসন্ন বোরো মৌসুমের আগেই পর্যাপ্ত সার আমদানি, মজুত ও সুষ্ঠু বিতরণ নিশ্চিত করা জরুরি।
টেকসই সার ব্যবস্থাপনার জন্য করণীয় : কৃষককে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে খাদ্যনিরাপত্তা সুসংহত করতে সার ব্যবস্থাপনাকে আরও বিজ্ঞানভিত্তিক, উপাত্তনির্ভর ও কৃষককেন্দ্রিক করার জন্য নিুোক্ত উদ্যোগগুলো বিবেচনা করা যেতে পারে।
১. ডিজিটাল ব্লকভিত্তিক সার চাহিদা মানচিত্র : উপজেলা বা ব্লক পর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের নেতৃতে কোন জমিতে পরবর্তী মৌসুমে কী ফসল, সাথি ফসল বা মাছের চাষ হবে-তার সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এ তথ্য বিশ্লেষণ করে জাতীয় চাহিদা নিরূপণ করলে অপচয় ও কৃত্রিম সংকট দূর হবে।
২. ডিলারকেন্দ্রিক নয়, কৃষকবান্ধব চাহিদাভিত্তিক বিতরণ : শুধু ডিলারের কাছে সার পৌঁছে দেওয়া যথেষ্ট নয়। মৌসুমি প্রয়োজন ও স্থানীয় বাজারের তথ্য সমন্বয় করে ‘চাহিদা আগে, সরবরাহ পরে’ নীতি চালু করতে হবে। একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কৃষকের তথ্য ও সরকারি মজুত সংযুক্ত থাকলে সংকট তৈরি হওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।
৩. অঞ্চল ও ফসলভিত্তিক জাতীয় পুষ্টি বাজেট : ঢালাওভাবে ইউরিয়া দেওয়ার প্রবণতা কমাতে অঞ্চল ও মাটির ধরন অনুযায়ী ডিএপি, টিএসপি ও এমওপির সঠিক সমন্বয়ে ‘পুষ্টি বাজেট’ প্রণয়ন করতে হবে। মাটি পরীক্ষার রিপোর্ট অনুযায়ী সরাসরি কৃষকের মোবাইল ফোনে সার ব্যবহারের মাত্রা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- সার সরবরাহ