ডেঙ্গুর দাপট, কোথায় প্রতিরোধের প্রস্তুতি?
খবরে দেখছি, কোলে ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশু নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে মানুষ ছুটছেন পাগলের মতো। হাসপাতালে জায়গা নেই, জায়গা পেলেও সাংঘাতিক রকম চাপ। রক্ত জোগাড় করা আরও কঠিন। চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ হিমশিম খাচ্ছেন এবং সেই সঙ্গে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর হারও প্রতিদিনই বাড়ছে।
শুধু পরিচিত ২/৩টি পরিবার থেকেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেল শিশু, নারী ও পুরুষ। দুদিন আগে চলে গেল পাঁচ বছর বয়সী আরিশা। আরিশার প্রিয় বন্ধু ফারিসা প্রথমে বুঝতেই পারেনি, ওর বন্ধু কোথায়, কীভাবে, কেন চলে গেল। ও জানত, প্রিয় বন্ধু হাসপাতালে। ছোট্ট ফারিসা সবার কাছে বলেছিল, ওর বন্ধুর জন্য প্রার্থনা করতে। ফারিসা ভেবেছিল, অসুস্থ হয়ে অনেকেই তো হাসপাতালে থাকে, কিন্তু সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরেও তো আসে। তাই ও ‘গেট ওয়েল সুন’ লিখে একটা কার্ডও বানিয়েছিল, বন্ধুকে দেবে বলে।
আরিশাকে হারিয়ে মা-বাবা পাগলপ্রায়। শুধু আরিশা নয়, সব রোগের ক্ষেত্রেই শিশুরা নাজুক ভিকটিম, তাই তারাই আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। আক্রান্ত হওয়া মাত্রই অনেকের খিঁচুনি হচ্ছে, দ্রুত অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছে, প্লাটিলেট কমছে। হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও কীটতত্ত্ববিদেরা বলছেন, চলতি বছরের অক্টোবর মাসে দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও আশঙ্কাজনক ও জটিল রূপ ধারণ করতে পারে। অর্থাৎ ডেঙ্গু সংক্রমণ আরও বৃদ্ধি পাওয়ার স্পষ্ট আশঙ্কা রয়েছে।
ইতোমধ্যেই ডেঙ্গুতে মে থেকে সেপ্টেম্বর এবং অক্টোবরের প্রথম ৪ দিনে মোট ২৫৮ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি ছিল সেপ্টেম্বর মাসে। এই মাসেই ১৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে ১৫ বছর বয়সী মোট ৩৩ জন শিশু ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। এর মধ্যে ১ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশু ১২ জন। (সূত্র: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর)
বাংলাদেশে ডেঙ্গু এখন আর কোনো ঋতুভিত্তিক বা সাময়িক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি স্থায়ী ও ভয়াবহ জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে। প্রতিবছরই এই রোগটি আসছে এবং পূর্বের রেকর্ড ভেঙে আরও বেশি প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে।
চলতি বছরেও একই রূপ দেখছি। ডেঙ্গুর প্রকোপ রাজধানী ঢাকা ছাড়িয়ে বিভিন্ন জেলাতেও মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এর বিপরীতে সরকারের মশা নিধন ও সামগ্রিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।
পাশাপাশি ডেঙ্গু রোগীদের জন্য বরাদ্দকৃত শয্যার সংখ্যা কমে যাচ্ছে। অসংখ্য রোগীর চাপ সামলাতে চিকিৎসক আর নার্সরা হিমশিম খাচ্ছেন। এই কারণে ভালো চিকিৎসার পরিবেশ বজায় রাখাই কষ্টকর হচ্ছে হাসপাতালগুলোতে।
গত কয়েক মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, তা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মৃত্যুর পরিসংখ্যান দেখলেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মে মাস থেকে শুরু করে পরবর্তী মাসগুলোতে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যু জ্যামিতিক হারে বেড়েছে।