সার আছে, সরবরাহ নেই: কৃষকের ক্ষোভের দায় কার?

বিডি নিউজ ২৪ এম এম মুসা প্রকাশিত: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৪৬

গত এক সপ্তাহে কুড়িগ্রামের রৌমারী ও ভূরুঙ্গামারীতে ক্ষুব্ধ কৃষকেরা অন্তত তিনবার ডিলারের গুদামের বেড়া ও দরজা ভেঙে শত শত বস্তা ইউরিয়া নিয়ে গেছেন। লালমনিরহাটে সড়ক অবরোধ হয়েছে, রাজশাহীতে মহাসড়কে বিক্ষোভ হয়েছে। প্রতিটি ঘটনার পর স্থানীয় প্রশাসনের একটি অভিন্ন জবাব শোনা গেছে, “এলাকায় সারের কোনো সংকট নেই, এটি নিছক গুজব।”


প্রশ্ন হলো, যদি সংকটই না থাকে, তাহলে একই মাসে একাধিক জেলায় কৃষকেরা কেন গুদাম ভেঙে সার নিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন? বাস্তবতা হলো, জাতীয় পর্যায়ে সারের সামগ্রিক মজুত ও চাহিদার হিসাব হয়তো আপাতত ভারসাম্যে আছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ে বণ্টনব্যবস্থা এমন ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে যে সামান্য বিলম্ব বা গুজবই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে দিতে পারছে। এটি নিছক তথ্যের সংকট নয়; এটি প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার সংকট।


কৃষি মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর এই তিন মাসে দেশে সারের চাহিদা প্রায় ১৩ লাখ ২১ হাজার টন, বিপরীতে মজুত রয়েছে প্রায় ১৩ লাখ ৬৫ হাজার টন। সংখ্যা দুটির ব্যবধান সামান্য; মাত্র ৪৪ হাজার টনের নিরাপত্তা মার্জিন। বার্ষিক চাহিদা নির্ধারিত হয়েছে প্রায় সাড়ে ৬৮ লাখ টন। এই স্বল্প মার্জিনের অর্থ হলো, সরবরাহ শৃঙ্খলের যে কোনো একটি বিন্দুতে সাময়িক ব্যাঘাত ঘটলেই—তা পরিবহন বিলম্ব হোক, ডিলারের কারসাজি হোক বা একটি কারখানার উৎপাদন বন্ধ হওয়া হোক, তার প্রভাব সরাসরি কৃষকের হাতে পৌঁছাতে থাকা সারের প্রবাহে গিয়ে পড়ে।


কুড়িগ্রামের ঘটনাগুলোর প্রায় প্রতিটির অভিন্ন প্যাটার্ন লক্ষণীয়। কৃষকেরা দীর্ঘ সময় ডিলার পয়েন্টে অপেক্ষা করেছেন, ডিলার সময়মতো দোকান খোলেননি বা বিতরণে গড়িমসি করেছেন এবং একপর্যায়ে উত্তেজিত জনতা নিজেরাই গুদামে প্রবেশ করেছে। অর্থাৎ, সমস্যাটি জাতীয় মজুতের ঘাটতিতে নয়; সমস্যাটি ত্রুটিপূর্ণ ও দুর্বল বিতরণ ব্যবস্থা।


এই দুর্বলতার পেছনে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন পরিস্থিতির একটি বড় ভূমিকা আছে। ২০২৬ সালের মার্চ-এপ্রিলে দেশজুড়ে তীব্র প্রাকৃতিক গ্যাস সংকটের কারণে চট্টগ্রামের সিইউএফএল ও কাফকো, সিলেটের এসএফসিএল এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ সার কারখানাসহ একাধিক রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানার উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছিল। জামালপুরের যমুনা সার কারখানা তো বছরের বড় একটি সময় ধরেই গ্যাসের অভাবে বন্ধ থাকে, যাতে প্রতিদিন সাড়ে তিন কোটি টাকার মতো লোকসান হচ্ছে এবং দামি যন্ত্রাংশ মরিচা ধরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।


নরসিংদীর ঘোড়াশাল-পলাশ কারখানার ২৭ দিনের বন্ধ থাকার পর উৎপাদনে ফেরার ঘটনাও প্রমাণ করে যে গ্যাস সরবরাহ পাওয়ার পরও পুরো উৎপাদন সক্ষমতায় ফিরতে পাঁচ-ছয় দিন সময় লাগে। ফলে দেশের নিজস্ব উৎপাদন ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা নির্ভরযোগ্য নয় এবং প্রতিবারই ঘাটতি পূরণে সরকারকে বিদেশ থেকে জরুরি আমদানির দ্বারস্থ হতে হচ্ছে—মরক্কোর ওসিপি নিউট্রিক্রপস থেকে ডিএপি আমদানি হোক বা শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৮০ হাজার টন সার ক্রয়ের সিদ্ধান্ত হোক। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকার প্রায় সাড়ে তিন লাখ ৬৫ হাজার টন সার আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে, যার ব্যয় প্রায় ২,৬৯৫ কোটি টাকা।


এই আমদানিনির্ভরতাই বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার সরাসরি শিকারে পরিণত করেছে। বিশ্ব ব্যাংকের এপ্রিল ২০২৬ সালের কমোডিটি মার্কেটস আউটলুক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্নের কারণে ইউরিয়ার দাম মার্চ মাসে টনপ্রতি ৭২৫ দশমিক ৬ ডলারে পৌঁছেছিল; মাত্র এক মাসে ৫৩ দশমিক ৭ শতাংশ বৃদ্ধি, যা গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। বিশ্ব ব্যাংক সতর্ক করেছিল, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক সারের দাম ৩০ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে। কারণ, বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত সারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই এই একটি প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করে। ডিএপি ও পটাশের দামও একই সময়ে ঊর্ধ্বমুখী ছিল।


জুলাই নাগাদ পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও (মিসরে ইউরিয়ার দাম নেমে আসে টনপ্রতি ৪৪৮ ডলারে), বাজার এখনো ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি ও চীনের রপ্তানি-নিয়ন্ত্রণ নীতির প্রতি অতিসংবেদনশীল। অর্থাৎ, বাংলাদেশের নিজস্ব উৎপাদন যখন গ্যাস সংকটে বিপর্যস্ত, ঠিক তখনই আমদানির বিকল্প পথটিও দামি ও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে; দুটি ঝুঁকি একসঙ্গে মিলে একটি বিপজ্জনক সন্ধিক্ষণ তৈরি করেছে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও