টাকার দিন কি শেষ?
একদিন মানুষ কাজ করত বেঁচে থাকার জন্য। তারপর সভ্যতা এগোল, কাজ হয়ে উঠল জীবিকা, মর্যাদা, পরিচয় এবং সামাজিক অবস্থানেরও অংশ। সকালে ঘুম থেকে উঠে অফিসে যাওয়া, কারখানায় হাজিরা দেওয়া, দোকান খোলা, মাঠে লাঙল ধরা—মানুষের জীবনের সঙ্গে কাজ এমনভাবে মিশে গেছে যে কাজহীন জীবন কল্পনা করাই কঠিন। আর কাজের বিনিময়ে পাওয়া অর্থই হয়ে উঠেছে সেই জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুদ্রা।
কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এবং রোবট যদি এমন এক পৃথিবী তৈরি করে, যেখানে মানুষের শ্রম আর উৎপাদনের প্রধান চালিকাশক্তি না থাকে? যদি একটি যন্ত্র একসঙ্গে শত মানুষের কাজ করতে পারে? যদি এআই শুধু লিখতে, হিসাব করতে বা ছবি বানাতেই না পারে, কারখানা চালাতে, পণ্য পরিবহন করতে, কৃষিকাজ করতে, রোগ নির্ণয় করতে এবং জটিল সিদ্ধান্ত গ্রহণেও মানুষের সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যায়? তখন কি টাকারও প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে?
প্রশ্নটি কোনো কল্পবিজ্ঞানের উপন্যাস থেকে উঠে আসেনি। বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের একজন ইলন মাস্কই এখন এমন ভবিষ্যতের কথা বলছেন। তাঁর বক্তব্য, এআই ও রোবোটিকসের উন্নতি অব্যাহত থাকলে আগামী ১০ থেকে ২০ বছরের মধ্যে কাজ মানুষের জন্য ঐচ্ছিক হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ কাজ তখন প্রয়োজনের জন্য নয়, অনেকটা শখের মতো করা হবে। আরও বিস্ময়কর তাঁর আরেকটি অনুমান—প্রযুক্তির অগ্রগতি এমন পর্যায়ে পৌঁছালে টাকা আর প্রাসঙ্গিক থাকবে না।
সম্প্রতি ‘দ্য ইকোনমিস্ট’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মাস্ক আরও নির্দিষ্ট সময়সীমা দিয়ে বলেছেন, ২০৩৬ সালের মধ্যে এআই ও রোবট এত বিপুল পরিমাণ পণ্য ও সেবা উৎপাদন করতে পারে যে অর্থের প্রয়োজনীয়তাই অনেকাংশে হারিয়ে যাবে। তাঁর যুক্তির কেন্দ্রবিন্দু খুব সহজ: মানুষ যা কিছু প্রয়োজন বলে মনে করে, যদি যন্ত্র তার চাহিদার চেয়েও বেশি উৎপাদন করতে পারে, তাহলে সেই পণ্য পাওয়ার জন্য অর্থের বিনিময়ের প্রয়োজন কোথায়?
শুনতে ইউটোপিয়ার মতো। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এটি কি সত্যিই অসম্ভব?
অর্থনীতির ইতিহাস একটু পেছনে তাকালে দেখা যায়, টাকা নিজে কোনো চূড়ান্ত প্রয়োজন নয়। এটি মানুষের প্রয়োজন ও সম্পদের মধ্যে একটি সেতু। যখন সম্পদ সীমিত, আর চাহিদা অসীম বা অন্তত সীমাহীনভাবে বাড়তে পারে, তখন কে কতটুকু পাবে, কে কতটুকু দেবে—সেটি নির্ধারণের জন্য বিনিময়ের একটি মাধ্যম দরকার হয়। টাকা সেই কাজটিই করে। অর্থাৎ টাকার অস্তিত্বের পেছনে সবচেয়ে বড় শব্দটি হলো—দুর্লভতা।
যে জিনিস অঢেল, তার দাম থাকে না। বাতাসের জন্য আমরা টাকা দিই না, কারণ স্বাভাবিক অবস্থায় বাতাসের অভাব নেই। কিন্তু বাড়ি, জমি, জ্বালানি, খাবার, চিকিৎসা, সময়—এসবের সীমাবদ্ধতা আছে বলেই এগুলোর মূল্য আছে। অর্থনীতির ভাষায়, scarcity বা দুর্লভতাই মূল্যের অন্যতম ভিত্তি। এখন এআই ও রোবট যদি উৎপাদনের এই সীমাবদ্ধতাকে নাটকীয়ভাবে বদলে দেয়, তাহলে অর্থনীতির প্রচলিত কাঠামোর ওপরও তার অভিঘাত পড়বে।