সড়কপথে শৃঙ্খলা ও শ্রমিকের অধিকার
সড়ক পরিবহণ শুধু যানবাহন আর রাস্তার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের অর্থনীতি, নাগরিক জীবন, লাখো শ্রমিকের জীবিকা, কোটি মানুষের দৈনন্দিন চলাচল ও দেশের স্বাভাবিক গতি। একটি বাস, ট্রাক, কার, পণ্যবাহী গাড়ি কিংবা গণপরিবহণের চাকা থেমে গেলে তার প্রভাব পড়ে ঘরের মানুষ থেকে শুরু করে হাটবাজার, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে। এই বাস্তবতাকে খুব কাছ থেকে দেখছি দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে সড়ক পরিবহণ শ্রমিকদের সঙ্গে যুক্ত থেকে। সাংগঠনিক পরিচয়ের মধ্য থেকে বুঝতে চেষ্টা করেছি, প্রক্রিয়াটি কীভাবে কাজ করে এবং সেই অনুযায়ী নিজের জায়গা থেকে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছি। আমার দৃষ্টিতে একজন পরিবহণ শ্রমিক কেবল স্টিয়ারিংয়ের পেছনে বসা একজন কর্মী নন। তিনি একটি পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, একই সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখার অন্যতম অংশীদার। তাই শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা মানে শুধু একটি শ্রেণির দাবি পূরণ করা নয়, বরং একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জীবনকে নিরাপদ করা।
তবে শ্রমিকের অধিকারের কথা বলতে গিয়ে সাধারণ যাত্রীর নিরাপত্তা উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। একজন চালকের কর্মঘণ্টা, বিশ্রাম, প্রশিক্ষণ ও কর্মপরিবেশ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই রাস্তায় তার দায়িত্বশীল আচরণও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একজন পরিবহণ শ্রমিকের হাতে যেমন একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে, তেমনই তার দায়িত্বশীলতার ওপর নির্ভর করে অসংখ্য যাত্রীর জীবন।
দুই.
সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রথমে প্রয়োজন ন্যায়সংগত পরিবেশ। শ্রমিক যদি নিরাপদ কর্মপরিবেশ না পান, যাত্রী যদি নিরাপদ যাতায়াতের নিশ্চয়তা না পান, আর পরিবহণ মালিক যদি সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার বাইরে থাকেন; তাহলে শুধু আইন প্রয়োগ করে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনা কঠিন। আজকের বাংলাদেশে পরিবহণ খাতকে আরও আধুনিক ও জনবান্ধব করার প্রয়োজনীয়তা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। প্রযুক্তির ব্যবহার, দক্ষ চালক তৈরি, কর্মঘণ্টার বাস্তবসম্মত ব্যবস্থাপনা, সড়ক নিরাপত্তা, যাত্রীসেবা এবং আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়।
তিন.
পাঁচ দশকের অভিজ্ঞতা থেকে আমার উপলব্ধি একটাই-শ্রমিককে সম্মান দিয়ে, মানুষের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এবং দায়িত্বশীলতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করেই একটি শক্তিশালী পরিবহণব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এটাই হতে পারে শ্রমজীবী মানুষের মর্যাদা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার বাস্তব রাজনৈতিক পথ।
আমি বিশ্বাস করি, সড়কপথের শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে পারলে দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন, জননিরাপত্তা বৃদ্ধি ও বিনিয়োগকারীদের কাছে দেশের ভাবমূর্তি আরও বাড়বে। পরিবহণ খাতের শ্রমিক-কর্মচারীদের শ্রম-ঘামে দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ঘটছে এবং তারা জীবন-মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে পরিবহণ খাত সচল রাখলেও নানা নেতিবাচক সমালোচনা প্রতিনিয়ত তাদের শুনতে হয়। প্রচারমাধ্যমে ‘সড়ক পরিবহণ শ্রমিকদের’ ইতিবাচক কোনো কিছু তুলে ধরা হয় না।
- ট্যাগ:
- মতামত
- সড়কে শৃঙ্খলা