ঢাকায় কবি নজরুলকে সমাহিত করা হয়েছিল পরিবার ও ভারত সরকারকে না জানিয়েই?
পঞ্চাশ বছর আগে ঢাকাতে কাজী নজরুল ইসলামের প্রয়াণের ঠিক পরদিন কলকাতার রবীন্দ্র সদনে কবির স্মরণে যে শোকসভা আয়োজন করা হয়েছিল, দমদম বিমানবন্দর থেকে উদভ্রান্ত ও বিপর্যন্ত অবস্থায় সেখানে এসে পৌঁছান নজরুলের জ্যেষ্ঠ পুত্র কাজী সব্যসাচী। সঙ্গে ছিলেন কবির ছোট পুত্রবধূ কল্যাণী কাজীও, তারা দুজনেই সরাসরি ঢাকা থেকে ফিরছিলেন।
কাজী সব্যসাচী এসেই বিষণ্ণমুখে বারবার বলছিলেন, "মা রইলেন চুরুলিয়ায় আর বাবা রইলেন ঢাকায়। এ আক্ষেপ সারাজীবন থাকবে।"
কবিপুত্র আরও বলছিলেন, "ওরা আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেই শেষ দেখা দেখতে পেতাম। আর ওদের এতো তাড়াহুড়ো করারই বা দরকার কী ছিল। ওদের জানানো হয়েছিল যে কবিপুত্র ঢাকা যাচ্ছেন দুপুরের প্লেনে। তবু কীসের এত তাড়াহুড়ো?"
বিবিসি বাংলার কাছে সে দিনের এই ঘটনার বিবরণ দিচ্ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের বর্ষীয়ান নজরুল গবেষক ও প্রাবন্ধিক বাঁধন সেনগুপ্ত, যিনি নিজে সেদিনের সেই স্মরণসভায় উপস্থিত ছিলেন।
তিনি জানাচ্ছেন, কবির প্রয়াণের পর তার মরদেহ যে দাফন করার জন্য জন্মস্থান চুরুলিয়ায় নিয়ে আসা যায়নি এবং ভারত ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে রাষ্ট্রীয় স্তরেও বিষয়টি নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি – সেটাই ছিল এই ক্ষোভ আর হতাশার মূল কারণ।
কবির পরিবারের বেশিরভাগ সদস্য তখন কলকাতায় বা আসানসোলের কাছাকাছি থাকতেন, তাদের ইচ্ছা ছিল চুরুলিয়ার জন্মভিটেয় স্ত্রী প্রমীলা দেবীর কবরের পাশেই কবিকে সমাহিত করা হোক।
কবির পরিবারের সদস্য ও সঙ্গীতশিল্পী সোনালি কাজী যেমন বিবিসিকে বলছিলেন, "আমরা জানি ১৯৬২তে প্রমীলা দেবীর মৃত্যুর আগে তিনি বারবার বলে গেছেন আমাকে চুরুলিয়াতে গোর দিও, কারণ তোমার বাবাও তো শেষে ওখানেই যাবেন।"
ততদিনে অবশ্য নজরুল সৃষ্টিহীন হয়ে পড়েছেন, তার স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো ক্ষমতাই নেই। তার জীবনের শেষ সোয়া চার বছর যে স্বাধীন বাংলাদেশে কাটবে, সেটাও কারো জানা নেই।