কোন পথে ‘ইসলামিক নেটো’?
মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা-ইসরায়েল হামলা, গাজায় চলমান গণহত্যা, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতি ইত্যাদির প্রেক্ষাপটে এক নতুন মেরুকরণের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যার প্রতিফলন ঘটল ৭ অগাস্ট ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ (মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট) স্বাক্ষরে। মাত্র তিনটি দেশ—সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান—এতে স্বাক্ষর করলেও এটি খুবই আলোচ্য একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অনেকেই একে ‘ইসলামিক নেটো’ (নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অরগ্যানাইজেশন) বা ‘মুসলিম নেটো’ হিসেবে দেখছেন; কারণ নেটোর পঞ্চম অনুচ্ছেদের মতো এতেও বলা হয়েছে: যেকোনো এক দেশের বিরুদ্ধে আক্রমণকে সবার ওপরে আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
তবে চুক্তিটির বীজ রোপিত হয়েছিল গত বছর সেপ্টেম্বরে কাতারে ইসরায়েলি হামলার পর। ওই হামলার এক সপ্তাহ পর সৌদি আরব ও পাকিস্তান একটি নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষর করে। লেবানন, ইয়েমেন, সিরিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের ওপর ইসরায়েলি হামলার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সৌদি আস্থা কমতে থাকে এবং নিজেদের জন্য এমন একটা সামরিক জোট গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। ৯ সেপ্টেম্বর ইসরায়েলি হামলার পর সৌদি আরব একটি মুসলিম পারমাণবিক শক্তির নিরাপত্তা প্রত্যাশা করে এবং ১৭ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের সঙ্গে ‘স্ট্র্যাটেজিক মিউচুয়াল ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট’ (এসএমডিএ) শীর্ষক চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। মক্কা চুক্তিটি আসলে এরই সম্প্রসারণ।
এই সামরিক জোটটি অল্পসংখ্যক দেশ নিয়ে গঠিত হলেও অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে; এর কারণ একদিকে ভিন্ন ভিন্ন শক্তিসম্পন্ন তিনটি দেশের অংশগ্রহণ এবং অন্যদিকে এর সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ বিকাশ। জোটটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি মনোযোগী ইসরায়েল ও ভারত। যদিও এর বর্তমান অবস্থায় উদ্বেগের কিছু নেই, তবে আগামী দিনে এর সম্প্রসারণ নিয়ে তাদের মাথাব্যথার কারণ আছে। সম্প্রসারণ হলে বাংলাদেশের অবস্থান কী হতে পারে, তাও ভাবনার বিষয় হয়েছে।
বাংলাদেশ অবশ্য এর এক সপ্তাহ আগেই সৌদির নেতৃত্বে ‘মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স কোয়ালিশন’ শীর্ষক একটি প্রতিরক্ষা কোয়ালিশনে যোগ দিয়েছে। ১৪টি দেশের এই কোয়ালিশনের উদ্দেশ্য বাব-এল-মান্দেব প্রণালি, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগর দিয়ে জাহাজ চলাচল নির্বিঘ্ন করা। চলমান মার্কিন-ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে লোহিত সাগর দিয়ে সৌদি আরবের জাহাজ চলাচল বন্ধ করার জন্য ইরান-সমর্থিত হুথিদের আক্রমণের ফলে এই কোয়ালিশন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে যোগ দেওয়া বা না দেওয়া—দুই রকম সিদ্ধান্তই বাংলাদেশের জন্য সংকট তৈরি করে; যোগ দিলে ইরানের এবং যোগ না দিলে সৌদির বিরাগভাজন হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে বাংলাদেশ যোগ দিয়েছে, কারণ কোয়ালিশনটি আক্রমণাত্মক কোনো জোট নয়, প্রতিরক্ষামূলক আর সাময়িক। আবার এখানে বাংলাদেশের ভূমিকাও কেন্দ্রীয় নয়; বিভিন্ন দেশের অংশগ্রহণ কোয়ালিশনকে যে নৈতিক শক্তি জোগায়, সেটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু ‘ইসলামিক নেটো’ সামরিক জোট হিসেবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং বিভিন্ন জল্পনা-কল্পনা সৃষ্টি করেছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে—জোটের অন্তর্ভুক্ত তিনটি দেশই নানাদিক থেকে শক্তিশালী। এর উৎপত্তির কারণ নিহিত মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নতুন ভূরাজনৈতিক মানচিত্র নির্মাণের লক্ষ্যে আমেরিকা-ইসরায়েলের যৌথ আগ্রাসনে। ইসলামিক নেটো সেই আগ্রাসী পরিকল্পনায় বাদ সাধতে পারে, আবার তা নেটোর মতোই আরেকটি যুদ্ধবাজ জোটে পরিণত হয়ে যেতে পারে। তাদের সম্মিলিত শক্তি হবে ১৪ লাখ সামরিক সদস্য, ৪০০-এর বেশি যুদ্ধবিমান ও ৬,০০০-এর বেশি ট্যাংক। তাদের শক্তির বৈচিত্র্য হচ্ছে—রিয়াদের আছে অর্থ, আঙ্কারার আছে নেটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক বাহিনী এবং ইসলামাবাদ পারমাণবিক শক্তিসম্পন্ন এক মুসলিম দেশের রাজধানী। এভাবে সৌদির অর্থ, তুরস্কের সামরিক শক্তি ও পাকিস্তানের যুদ্ধ-অভিজ্ঞতা—এই তিনের সমন্বয় ঘটেছে এই নতুন সামরিক সংঘে।
এই জোট গঠনের মধ্য দিয়ে উক্ত তিনটি দেশেরই আশু লাভ হয়েছে। এ ব্যাপারে ফার্স্টপোস্টে ১৪ অগাস্ট রোশনীশ কামানেক লিখেছেন, আন্তর্জাতিক এনার্জি ব্যবসায়ী জ্যাক প্রান্ডেলে এক্স-এ উল্লেখ করেছেন, এই চুক্তি করে ‘রিয়াদ তার প্রতিরক্ষা বাড়িয়েছে ও নিরাপত্তা নিশ্চায়ক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়েছে, তুরস্ক তার আঞ্চলিক প্রভাব বৃদ্ধি করেছে এবং পাকিস্তান উপসাগরীয় ও মুসলিম বিশ্বে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করেছে।’
- ট্যাগ:
- মতামত
- মধ্যপ্রাচ্য সংকট