জনবান্ধব পুলিশ : বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী ঐতিহ্যের ধারায় সংস্কার

কালের কণ্ঠ ড. মো. রুহুল আমিন সরকার প্রকাশিত: ২২ আগস্ট ২০২৬, ১১:২৮

বাংলাদেশে পুলিশ সংস্কারের আলোচনা নতুন কোনো বিষয় নয়। স্বাধীনতার পর একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা পুনর্গঠন, দ্রুত পরিবর্তনশীল অপরাধ মোকাবেলা এবং নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজন থেকেই বাংলাদেশ পুলিশের সাংগঠনিক বিকাশের বিভিন্ন ধাপ শুরু হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে অপরাধের ধরন, জনসংখ্যা, নগরায়ণ, প্রযুক্তি এবং নাগরিকের প্রত্যাশা পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে পুলিশের কাঠামো ও কর্মপদ্ধতিকেও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।


এই দীর্ঘ পথচলায় বাংলাদেশের পুলিশ প্রশাসনের বিকাশে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সময়ের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ঐতিহাসিকভাবে উল্লেখযোগ্য। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সরকারও সেই ধারাকে সম্প্রসারিত করেছে। তাই আজকের পুলিশ সংস্কারকে অতীতের কোনো একটি সরকারের একক উদ্যোগ হিসেবে না দেখে বরং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রদর্শন তথা পুলিশ সংস্কার ভাবনার ধারাবাহিক প্রাতিষ্ঠানিক বিবর্তন হিসেবে দেখা অধিক ফলপ্রসূ। ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলার নতুন বাস্তবতায় তৎকালীন সরকার আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন এবং ঢাকার জন্য মেট্রোপলিটন পুলিশ ব্যবস্থার বিকাশে উদ্যোগ নেয়।


পরবর্তীকালে ঢাকার দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে মহানগর পুলিশের কাঠামোও বড় হয়েছে। ২০০৫ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে ঢাকায় একসঙ্গে ছয়টি নতুন থানা উদ্বোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল জনসংখ্যা ও অপরাধ বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে থানাগুলোর ওপর চাপ কমানো এবং আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে আরো কার্যকর করা।


অন্যদিকে ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে বাংলাদেশ পুলিশের ভেতর থেকেই কমিউনিটি পুলিশিংয়ের একটি উদ্যোগ শুরু হয়। ১৯৯২ সালে ময়মনসিংহে টাউন ডিফেন্স পার্টিকে কেন্দ্র করে এবং পরবর্তী সময়ে ঢাকার কিছু এলাকায় ‘প্রতিবেশী নিরাপত্তা’ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। ২০০৫ সালে পুলিশ রিফর্ম প্রোগ্রামের মাধ্যমে পুলিশকে ঐতিহ্যগত ‘ফোর্স’ ধারণা থেকে অধিকতর পেশাগত, দায়বদ্ধ বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার একটি বিস্তৃত প্রক্রিয়া শুরু হয়। সাম্প্রতিক একাডেমিক গবেষণায়ও ২০০৫ সালের এই পুলিশ রিফর্ম প্রোগ্রামকে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এই ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—পুলিশ সংস্কার কোনো এককালীন ঘটনা নয়, এটি একটি চলমান যাত্রা।


সেই ধারাবাহিকতার পরবর্তী পর্যায় হিসেবে বর্তমান সময়ে ঘোষিত বিএনপির ৩১ দফায় পুলিশ ও জনপ্রশাসন সম্পর্কে যে প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়েছে, সেটিকে আরো বাস্তবমুখী করার সুযোগ রয়েছে। ৩১ দফার সংশ্লিষ্ট অংশে দক্ষ, যোগ্য ও পেশাদার জনপ্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন গড়ে তোলা এবং নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে মেধা, সততা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আমার বিবেচনায়, এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় সাংগঠনিক সংস্কারের পাশাপাশি পুলিশের প্রতিদিনের ছোট ছোট সমস্যার দিকে নজর দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। কারণ একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত পরিবর্তন অনেক সময় বড় ঘোষণার চেয়ে ছোট ছোট বাস্তব উন্নতির মাধ্যমে মানুষের কাছে দৃশ্যমান হয়।


বাংলাদেশ পুলিশের ইতিহাসে জিয়াউর রহমানের সময়কার মেট্রোপলিটন পুলিশ ও আর্মড পুলিশের বিকাশ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক মাইলফলক। স্বাধীনতার পর ক্রমবর্ধমান নগরায়ণ ও আইন-শৃঙ্খলার পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুলিশের বিশেষায়িত সক্ষমতা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তখনই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। পরবর্তীকালে খালেদা জিয়ার সরকারগুলোর সময়ে মহানগর পুলিশ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, নতুন থানা স্থাপন এবং নাগরিক নিরাপত্তার পরিধি বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগ সেই সক্ষমতাকে আরো বিস্তৃত করেছে। ২০০৫ সালে ঢাকায় ছয়টি নতুন থানা চালুর উদ্যোগটি ছিল দ্রুত বর্ধনশীল নগরীর পুলিশি চাহিদার সঙ্গে সাংগঠনিক কাঠামোকে সামঞ্জস্য করার একটি বাস্তব উদাহরণ। অন্যদিকে ১৯৯২ সালের কমিউনিটি পুলিশিংয়ের উদ্যোগটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পুলিশের শক্তি শুধু অস্ত্র, জনবল ও আইনি ক্ষমতায় নয়, জনগণের সহযোগিতাও পুলিশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। এই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার ওপর দাঁড়িয়েই আজকের পুলিশ সংস্কারের পরবর্তী অধ্যায় লেখা যেতে পারে। আজকের পুলিশের বাস্তবতায় বড় সংস্কারের পাশাপাশি যে ছোট বিষয়গুলো দেখা দরকার—


সাধারণ মানুষের কাছে বাংলাদেশ পুলিশের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতিষ্ঠান হলো থানা। একজন নাগরিক বিপদে পড়লে, জিডি করতে হলে, মামলা করতে হলে কিংবা কোনো সমস্যার সমাধানের জন্য প্রথমেই থানায় যান। তাই প্রতিটি থানাকে আরো বেশি নাগরিক সেবা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। থানার প্রবেশপথে পরিষ্কার নির্দেশনা, অভিযোগ গ্রহণের পদ্ধতি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নাম এবং সেবার সম্ভাব্য সময়সীমা সহজ ভাষায় প্রদর্শন করা যেতে পারে। একজন সাধারণ নাগরিক যেন থানায় গিয়ে বিভ্রান্ত না হন—এটিই হতে পারে একটি ছোট অথচ কার্যকর সংস্কার।


পুলিশি সেবার ক্ষেত্রে একটি সাধারণ প্রশ্ন হলো, কাজটি কত সময়ে হবে? জিডি, অভিযোগ, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, হারানো জিনিসের রিপোর্ট কিংবা অন্যান্য নাগরিক সেবার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সেবা প্রদানের সময় নির্ধারণ করা যেতে পারে। এর ফলে নাগরিক যেমন তাঁর প্রত্যাশা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাবেন, পুলিশও নিজের কাজের সময়সীমা সম্পর্কে আরো সংগঠিত হতে পারবে।


একজন তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই সঙ্গে যদি তাঁর ওপর বিপুলসংখ্যক মামলা, প্রশাসনিক দায়িত্ব, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব এবং অন্যান্য কাজ থাকে, তাহলে তদন্তের গভীরতা বজায় রাখা কঠিন হতে পারে। তাই থানার সাধারণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব এবং তদন্ত কার্যক্রমের মধ্যে আরো কার্যকর ভারসাম্য সৃষ্টি করা প্রয়োজন। সম্ভব হলে তদন্ত কর্মকর্তার caseload-এর একটি বাস্তবসম্মত সীমা নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।


অপরাধ এখন আর শুধু রাস্তা, বাজার বা ঘরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মোবাইল ফোন, সোশ্যাল মিডিয়া, অনলাইন সম্প্রচার, সিসিটিভি, জিপিএস, ডিজিটাল নথি এখন অপরাধ তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই জেলা ও মহানগর পর্যায়ে ডিজিটাল অনুসন্ধানী ডেস্ক গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে স্থানীয় তদন্ত কর্মকর্তারা প্রযুক্তিগত সহায়তা পাবেন এবং সিআইডি, সাইবার পুলিশ সেন্টার ও অন্যান্য বিশেষায়িত ইউনিটের সঙ্গে সমন্বয় আরো সহজ হবে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও