এলডিসি-পরবর্তী বাংলাদেশের অর্থনীতি
জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে উন্নীত হওয়ার কথা রয়েছে। আমাদের অর্থনীতি এখন এমন এক পরিস্থিতির মধ্যে আছে, যেখানে আশা ও উদ্বেগ পাশাপাশি অবস্থান করছে। দেশ এমনিতেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপ, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা অর্থনীতিকে নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সরকার ২০২৬-২৭ থেকে ২০২৮-২৯ অর্থবছরের জন্য মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতি প্রকাশ করেছে। নীতিপত্রে আগামী তিন বছরে প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আদায় বাড়ানো এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার একটি রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ঘোষিত লক্ষ্য ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান কতটা? আরও বড় প্রশ্ন হলো, এলডিসি-পরবর্তী বাংলাদেশের অর্থনীতি এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য আদৌ প্রস্তুত কি না?
বাংলাদেশে প্রতিবছর জাতীয় বাজেট নিয়ে নানা আলোচনা ও বিতর্ক হয়। কিন্তু মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতি নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ তুলনামূলকভাবে কম। অথচ এই নথিই বলে দেয় আগামী কয়েক বছরে সরকারের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার কী হবে, রাষ্ট্র কত টাকা ব্যয় করবে, কত টাকা ঋণ নেবে, রাজস্ব কত বাড়ানোর চেষ্টা করবে এবং অর্থনীতিকে কোন পথে পরিচালিত করতে চায়? অর্থনীতির ভাষায় এটি শুধু একটি পরিকল্পনাপত্র নয়; এটি রাষ্ট্রের সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতার একটি প্রতিফলন।
সরকার আগামী তিন বছরে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কাগজে-কলমে এই লক্ষ্য আকর্ষণীয় শোনালেও বাস্তবে এটি একটি কঠিন সমীকরণ। কারণ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি প্রয়োগ করে সুদের হার বাড়ানো, বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, অতিরিক্ত সরকারি ব্যয় কমানো এবং ডলারের বাজার স্থিতিশীল রাখতে হয়। অন্যদিকে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে প্রয়োজন বিনিয়োগ, উৎপাদন ও ভোগব্যয়ের সম্প্রসারণ। অর্থাৎ একই সময়ে প্রবৃদ্ধি বাড়ানো এবং মূল্যস্ফীতি কমানো সব সময় সহজ নয়।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক বাস্তবতা হলো মূল্যস্ফীতি। কয়েক বছর ধরে খাদ্যপণ্য, বাসা ভাড়া, পরিবহন, চিকিৎসা ও শিক্ষাসহ প্রায় প্রতিটি খাতে ব্যয় বেড়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষ তো বটেই, নিম্ন মধ্যবিত্তের একটি বড় অংশও জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে সঞ্চয় ভাঙছে, অনেকে আবার স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয় কমিয়ে দিচ্ছে।
মূল্যস্ফীতি শুধু অর্থনীতির একটি সূচক নয়; এটি মানুষের জীবনমান, সামাজিক নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থার প্রশ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিকে কেবল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। বাজার ব্যবস্থাপনা, সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, মজুতদারির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।