জলবায়ু ব্যবস্থাপনায় সন্দেহের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এর প্রভাব এরই মধ্যে অনুভূত হচ্ছে। মানুষ, অন্যান্য প্রজাতি এবং পৃথিবীর ক্ষতি বেড়েই চলেছে এবং এর অনেকটাই এরই মধ্যে অপরিবর্তনীয় হয়ে পড়েছে।
ইউরোপে সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহের মাত্রা থেকে দেখা যায়, যুক্তরাজ্যে এ বছরের মে মাসে সর্বকালের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে, যেখানে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল প্রায় ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তাপকে ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়, কারণ এটি বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন কেড়ে নেয়, যাদের নাম সরকারি পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত হয় না। গত গ্রীষ্মে বিজ্ঞানীরা ইউরোপীয় শহরগুলোতে তাপজনিত প্রতি তিনটি মৃত্যুর মধ্যে দুটির জন্য জলবায়ুর পরিবর্তনকে দায়ী করেছেন।
২০২২ সালে যখন বৈশ্বিক তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছিল, তখন ব্রিটেনে প্রায় তিন হাজার মানুষ তাপজনিত কারণে মারা গিয়েছিল।
গবেষণায় দেখা গেছে, এয়ার কন্ডিশনিং তাপজনিত মৃত্যু ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে। এয়ার কন্ডিশনিং ইউনিট প্রচুর বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। গার্ডিয়ানে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে সতর্কতা জারি করা হয়েছে, কারণ উচ্চ তাপমাত্রার কারণে মানুষ একই সময়ে এয়ার কন্ডিশনিং ইউনিট করছে, যা বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। ‘ফ্রেন্ডস অব দ্য আর্থ’ উল্লেখ করেছে যে, “যদিও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবহার বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, এটি শক্তি নিবিড় এবং ব্যয়বহুল, তাই যাদের এটি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তাদের জন্য এটিকে ব্যবহারের জন্য অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি অবশ্যই জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে ‘সবুজ শক্তি’ দ্বারা চালিত হতে হবে।” নিউ সায়েন্টিস্ট-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হচ্ছে। ২০১০-এর দশকের শুরু থেকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হারে যে দীর্ঘস্থায়ী ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে, তার অন্যতম কারণ হতে পারে গভীর সমুদ্রের উষ্ণায়ন। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ঢাকা, মায়ামি, মুম্বাই, সিডনি, রিও ডি জেনিরো, নিউইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেস, হংকং, সাংহাই এবং আরো অনেক জনবহুল শহরকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে। গঙ্গা ও নীল নদের বদ্বীপ, ফ্লোরিডার বেশির ভাগ অংশ, মালদ্বীপ এবং বেশ কিছু প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপসহ সমগ্র অঞ্চল সমুদ্রের নিচে বিলীন হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
দার্শনিক এ সি গ্রেলিং যুক্তি দিয়েছেন, “আমরা কখনো কখনো শুধু মানবজাতির ওপর জলবায়ু হুমকির কথাই ভাবি এবং অনেক প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতির বিলুপ্তিকে একটি ‘পার্শ্ব ঘটনা’ হিসেবে বিবেচনা করি।” কিন্তু তিনি মনে করেন, এটি একটি মারাত্মক ভুল। এই গ্রহটি ‘একটি একক জীব, একটি আন্ত সংযুক্ত ব্যবস্থা, যা একটি একক বাস্তুতন্ত্র গঠন করে। মানুষের কার্যকলাপ একে বিকৃত করে এবং সম্পূর্ণরূপে ভেঙে ফেলার প্রক্রিয়ায় রয়েছে।’ ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ড (ডব্লিউডব্লিউএফ) জানিয়েছে, ১০ লাখ প্রাণীর প্রজাতি, যা মোট সংখ্যার ২০ শতাংশ এবং বিশ্বের উদ্ভিদ প্রজাতির ৪০ শতাংশ এখন বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। গ্রেলিং আরো বলেছেন, ‘জীববৈচিত্র্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি আন্ত নির্ভরশীলতার সেই ব্যবস্থা বজায় রাখে, যা ব্যাকটেরিয়া থেকে শুরু করে উদ্ভিদ ও প্রাণীর জীবন এবং পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের গঠন পর্যন্ত প্রাণের শৃঙ্খলকে সংযুক্ত করে।’
জলবায়ুর পরিবর্তনকে অস্বীকার করা মানুষের সংখ্যা কম নয়। যাঁরা জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক ঐকমত্যকে প্রত্যাখ্যান করেন, তাঁরাই জলবায়ুর পরিবর্তন অস্বীকারকারী হিসেবে চিহ্নিত। এই অস্বীকারকারীরা মনে করেন, জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলেই পৃথিবীতে দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে না। এই অস্বীকারকারীর মধ্যে তিনটি ধরন রয়েছে। প্রথমত, সরাসরি অস্বীকার, অর্থাৎ বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে প্রত্যাখ্যান করা অথবা গ্রিনহাউস গ্যাস তাপ আটকে রাখে না বলে দাবি করা। দ্বিতীয়ত, কারণ অস্বীকার, অর্থাৎ পৃথিবী উষ্ণ হচ্ছে তা মেনে নেওয়া, কিন্তু এর কারণ মানবসৃষ্ট না হয়ে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক বলে দাবি করা। তৃতীয়ত, প্রভাব অস্বীকার, অর্থাৎ উষ্ণায়নের বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যাকে অস্বীকার করা, কিন্তু যুক্তি দেওয়া যে এর প্রভাব ক্ষতিকর নয়।
মাইকেল ম্যান তাঁর ‘দ্য নিউ ক্লাইমেট ওয়ার’ গ্রন্থে তামাকশিল্পের একটি অভ্যন্তরীণ স্মারকের কথা উল্লেখ করেছেন, যেখানে বলা হয়েছে ফুসফুসের ক্যান্সারের সঙ্গে সিগারেটের সংযোগ থেকে তাদের মুনাফার ওপর আসা হুমকি কিভাবে মোকাবেলা করা হবে। স্মারকে বলা হয়েছিল, ‘সন্দেহ দিয়ে যোগ্যতা যাচাই করুন, সন্দেহই আমাদের পণ্য। সন্দেহের বীজ বপন করুন এবং এটি নিকোটিনে আসক্তদের জন্য বিজ্ঞানের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করার একটি অজুহাত হয়ে উঠবে।’ একই ভাবে জীবাশ্ম জ্বালানিশিল্পের লক্ষ্য হলো সন্দেহের বীজ বপন করা, যাতে সতর্কবার্তাগুলো ভুল প্রমাণিত হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো হস্তক্ষেপ করতে দ্বিধা বোধ করে। জীবাশ্ম জ্বালানিশিল্পের আরেকটি লক্ষ্য হলো, তাদের বিরোধীদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা। এই বিভেদগুলোর মধ্যে একটি হলো তাদের মধ্যে বিভাজন, যারা ব্যক্তিগত পদক্ষেপের আহবান জানায় এবং যারা শুধু বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের ওপর জোর দেয়, যার জন্য সম্মিলিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
- ট্যাগ:
- মতামত
- জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকি